নিখিলেশ বললে–তুমি রাগ করছো কেন?
নয়নতারা বললে–তাহলে এবার থেকে সংসার খরচের হিসেব আমি আর রাখবো না, তুমিই রাখো–
পরামর্শ করতে করতে এমনি করে পরামর্শের নৌকো ঝগড়ার চোরাবালিতে গিয়ে আটকে যায়, তখন পরামর্শ আর বেশিদূর এগোয় না। অথচ এক ছাদের তলায় এক বাড়িতে দুজনে বসবাস করে, একই সঙ্গে দুজনে অফিসে যাতায়াত করে। কিন্তু ছটফট করে দু’জনেই। দুজনেরই মনে হয় আরো বেশি টাকা হলে ভালো হয়, আরো বেশি টাকা হলে জীবনটা বেশ স্বচ্ছন্দ হয়, সুখের হয়, আরামের হয়।
কিন্তু কোথাও কোনো ভাবে আরো বেশি টাকা আয়ের সুরাহা হয় না।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে পৃথিবী যেন সেই টাকার খেলাতেই হঠাৎ উন্মাদ হয়ে উঠলো। আগে টাকা চাইতো কীর্তিপদ মুখোপাধ্যায়, টাকা চাইতো নরনারায়ণ চৌধুরীরা, টাকা চাইতে পুলিসের বড়বাবু সুশীল সামরো, আর তার সঙ্গে মুষ্টিমেয় কিছু লোক টাকা চাইতো। যেমন চাইতো মানদা মাসীরা আর প্রকাশ রায়েরা।
টাকার জন্যে নরনারায়ন চৌধুরীরা একদিন কালীগঞ্জের জমিদার হর্ষনাথ চক্রবর্তীর বিধবা স্ত্রীর সম্পত্তি যে গ্রাস করেছিলেন সেটা স্বাভাবিক। কারণ জমিদারে জমিদারে রেষারেষি আর প্রতিযোগিতার যুগ সেটা। তখন রাজা-মহারাজা-জমিদারের টাকার নেশা ছিল সমাজের ওপর-মহলের নেশা। তাতে প্রজাদের ক্ষতিবৃদ্ধির কথা উঠতো না। ওপরওয়ালারাই ছিল মুখ্য, প্রজারা গৌণ। প্রজাদের কাজ ছিল সহ্য করা। ওপর-ওয়ালাদের পীড়ন মাথা পেতে নেওয়া, আর সব অত্যাচার আর পীড়ন সহ্য করার পেছনে ছিল ধর্মের অনুশাসন। ধর্ম বলতো–ইহকালে ধর্মপথে থাকো তাহলে পরলোকে তোমার অক্ষয় স্বর্গবাস হবে–
কপিল পায়রাপোড়া, মানিক ঘোষ আর ফটিক প্রামাণিকরাও টাকা চেয়েছে। কিন্তু সে টাকা-চাওয়া তাদের নেহাৎ পেট চালাবার জন্যে। পেট চালাবার বাইরে যে টাকার ব্যবহার তা তারা জানতো না। তার স্বপ্নও তারা কখনও দেখতো না। তারা জানতো না যে সে টাকা ব্যাঙ্কে রাখলে তা সুদে বাড়ে। জানতো না সুদের তা দিয়ে দিয়ে একশো টাকাকেই আবার এক হাজার টাকা করা যায়। জানতো না সেই এক-হাজার টাকাকেই আবার একদিন আরো ভালো করে তা দিলে সেটা দশ হাজার টাকায় দাঁড়ায়। তারা জানতো শুধু জমি, কিম্বা জানতো শুধু বাঁধা একটা চাকরি। সেটা পেলেই তোমাদের সব পাওয়া হয়ে গেল। তখন সন্ধ্যেবেলা নবাবগঞ্জের বারোয়ারিতলায় বসে বসে রাত জেগে কবির লড়াই শোন, যাত্রার পালায় রাম সেজে অভিনয় করো কিম্বা বন্ধুবান্ধব নিয়ে তাস খেলে সন্ধ্যেটা কাটিয়ে দিয়ে রাতে নাক ডাকিয়ে ঘুমোও।
কিন্তু জানতে পারলো যুদ্ধের পর। ১৯৩৯ সালের যুদ্ধ যখন শেষ হলো তখন জানতে পারলো, ওই যাত্রা, কবির লড়াই, তাস খেলা ও-সব কিছু নয়। জানতে পারলো ওই রামায়ণ পাঠ, পরলোক-টোক কিছু নয়। আমরা যখন ওই সব নেশায় বুঁদ হয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম তখন অন্য লোকেরা বেশ কাজ গুছিয়ে নিয়েছে। কেউ যুদ্ধের ঠিকেদারি করেছে, কেউ চালের সঙ্গে কাঁকর মিশিয়েছে, কেউ বা ওষুধের ভেজাল দিয়েছে। সবাই চোখ মেলে দেখল তামাম দুনিয়াটার চেহারা রাতারাতি বদলে গিয়েছে। সবাই যে কখন কাজ গুছিয়ে নিয়েছে তা কেউ টের পায় নি। আগে একজন কপিল পায়রাপোড়া ছিল, তখন লক্ষ লক্ষ কপিল পায়রাপোড়া জন্মেছে। লক্ষ লক্ষ মানিক ঘোষ আর ফটিক প্রামাণিকরা কর্তাবাবুদের অত্যাচারে মাথা নোয়াবে না ঠিক করে ফেলেছে। তারা বলতে আরম্ভ করেছে–আমাদেরও বাঁচবার অধিকার আছে, আমরাও বাঁচতে চাই, জমির ফসলের ভাগ চাই আমরা, জীবনধারণের জন্যে আমরা আরো টাকা চাই–
আর একদিকে কলকাতার অফিসের ক্লার্ক নিখিলেশ আর নয়নতারা, তারাও বলছে আমরা আর গরীব হয়ে থাকবো না, আমাদের আরো টাকা চাই–
সমস্ত পৃথিবীর সাধারণ মানুষও তাদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তখন বলতে শুরু করেছে–আমরা আরও একটা চাই–
এদিকে সদানন্দর তখন কোনও দিকে চেয়ে দেখবারও সময় নেই। সমস্ত কিছু দেখা যেন তার শেষ হয়ে গেছে। সেই কবে একদিন নবাবগঞ্জ থেকে সে তার জীবন-পরিক্রমা শুরু করেছিল, সেই তখনই সে দেখেছিল বাড়িতে কে একজন বিধবা বুড়ি আসে আর কর্তাবাবুর কাছে গিয়ে বলে–আমার টাকা দাও, আমার টাকা চাই–
তারপর প্রকাশ মামার সঙ্গে যখন রাণাঘাটের রাধার বাড়িতে যেত, সেখানে গিয়েও দেখতো রাধা প্রকাশ মামাকে বলতো–আমার টাকা চাই–
আর তারপর সেই পুলিসের থানা। সেই সেখানেও তো টাকা। প্রকাশ মামা টাকা দিলে বলেই তো সেদিন সে ছাড়া পেলে।
সমস্ত সুলতানপুরময় হঠাৎ রটে গেল যে চৌধুরী মশাই-এর ছেলে এসেছে।
অশ্বিনী ভট্টাচার্যি দৌড়তে দৌড়তে কাছারি বাড়িতে এসে হাজির। খবরটা ভীম বিশ্বাসও পেয়ে গিয়েছিল। আশু চক্কোত্তি তখন মাঠে গিয়েছিল। সেখান থেকেই সে একেবারে সোজা চলে এসেছে।
প্রকাশ রায় সদরবাড়িতেই সবাইকে ঠেকালো।
বললে–না বাপু এখন দেখা হবে না। এখন সদার শরীর খারাপ–
ভীম বিশ্বাস বললে–আমি তো তাকে বিরক্ত করবো না রায় মশাই, আমি শুধু একবার তাঁকে চোখের দেখা দেখবো–
প্রকাশ রায় ধমকে উঠলো–চোখের দেখা দেখে কী হবে শুনি? সে কী বাঘ না, ভাল্লুক যে চোখে দেখবে? আমাদেরই মতন দুটো হাত দুটো পা, দেখবার কী আছে?
অশ্বিনী ভট্টাচার্যি বললে–তা আমাদের কথা বলেছেন তো তাকে আজ্ঞে? আমার মেয়ের বিয়ের কথা?
