নিখিলেশ বললে–তুমি একদিন বোর্ডিং হাউসটা গিয়ে দেখে এসো না–
তা একটা রবিবার দেখে নয়নতারা সত্যিই একদিন গেল। ভবানীপুরের একটা ভদ্রপাড়ায় বাড়িটা। দোতলা বাড়ি। আটখানা ঘর। মালার স্বামী ভদ্রলোকটি বেশ অমায়িক। নয়নতারার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতেই ভদ্রলোক হাসিমুখে অভ্যর্থনা করলেন। ঘুরে ঘুরে সব দেখলেন।
বললেন–দেখুন, আমরা তো দুজনেই চাকরি করি। চাকরি করতে করতে একদিন ভাবলুম চাকরি করে কেবল জীবন নষ্ট করছি। তখন থেকেই ভাবতে লাগলুম একটা কিছু করতে হবে–তা অনেক রকম কাজে হাত দিলুম, কিছুই হলো না, অনেকগুলো টাকা মাঝখান থেকে নষ্ট হয়ে গেল। শেষকালে এই মেয়েদের বোর্ডিং-হাউসের আইডিয়াটা এল–
মালা বললে–আমরা তো অফিসে গল্প ছাড়া আর কিছু করি না। ভাবছি এখেনে কাজ করলে তবু একটু কাজের কাজ করা হবে
মালার স্বামী বললে–এখন অফিস থেকে এসে এরও কাজে নেশা লেগে গেছে–
মালা বললে–প্রথমে আমি চাকরিটা ছাড়বো না নয়নদি, মাসকয়েকের ছুটি নেব প্রথম, তারপর একদিন রিজাইন দেব–
নয়নতারার বেশ লাগলো। নিখিলেশ কতদিন ধরে ব্যবসা করবার কথা ভাবছে। এই রকম ব্যবসা করলে মন্দ হয় না।
জিজ্ঞেস করলে–প্রথমে কত ক্যাপিটেল লেগেছিল?
মালার স্বামী বললে–বুঝতেই তো পারছেন আমাদের দুজনের চাকরিতে আর কত টাকাই বা জমতে পারে! হাজার পাঁচেক টাকার মত ব্যাঙ্কে জমা ছিল, তাই দিয়েই একদিন কাজ আরম্ভ করে দিলুম, তারপরেই এই…।
বাড়িতে ফিরে এসে নিখিলেশকে বললে–দেখে এলুম–
নিখিলেশ সেই কথা শোনবার জন্যেই আগ্রহ করে বসে ছিল। বললে–কী রকম দেখলে?
নয়নতারা বললে–খুব ভালো। হাঙ্গামা কিছু নেই। আমিও পারি—
–কত টাকা ক্যাপিটেল লেগেছিল প্রথমে?
–পাঁচ হাজার টাকা!
পাঁচ হাজার টাকা শুনে নিখিলেশের মুখটা কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। পাঁচ হাজার টাকা কোথায় পাবে সে! ব্যাঙ্কের পাসবইটা বের করে দেখলে স্বামী-স্ত্রী দুজনের নামে বহুদিন আগে একটা জয়েন্ট-অ্যাকাউন্ট খুলেছিল। তাতে যে কত টাকা ছিল তা মনে ছিল না। পাস বইটা খুলতেই জমার অঙ্কটা দেখে নিখিলেশ অবাক হয়ে গেল। মাত্র পাঁচটা টাকা পড়ে আছে। অথচ নিখিলেশের মনে আছে শেষের দিকে পাঁচশো টাকার মত জমা ছিল। সে টাকা কে তুলে নিলে? আসলে টাকা কড়ি ব্যাঙ্কের পাসবই সবই তো নয়নতারার কাছে থাকতো।
নিখিলেশ নয়নতারার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলে–টাকা এত কমে গেল কী করে?
নয়নতারা বললে–আমি তুলে নিয়েছি–
নিখিলেশের মুখটা আরো গম্ভীর হয়ে গেল। বললে–একেবারে পাঁচশো টাকাই তুলে নিয়েছ? আমার তো মনে আছে এতে পাঁচশো টাকাই ছিল–
নয়নতারা বললে–তখন দরকার হয়েছিল তাই তুলেছি–
–দেখ দিকিনি, তুমি এই রকম করে কত টাকা নষ্ট করেছ মিছিমিছি। কোথাকার কে, তার জন্যে সব টাকাটা তুমি এমনি করে জলে ফেলে দিলে? অথচ যার জন্যে তুমি এত করলে সে ওদিকে বেশ আরাম করে বউ নিয়ে ঘর-সংসার করছে। সে-টাকা থাকলে আজকে কত সুবিধে হতো বলে দিকিনি। বললে–তা তুমি এখন আমার ওপর রাগ করবে
নয়নতারা বললে–টাকা তো তুমি নিজেও কত নষ্ট করেছ—
নিখিলেশ প্রতিবাদ করে উঠলো–আমি? আমি আবার কবে টাকা নষ্ট করলুম?
নয়নতারা বললে–এখন যদি আমি সেই সব কথা তুলি তো তুমিও রাগ করবে। তুমি মদ খাও নি? মদ খেয়ে তুমি কত দিন কত টাকা নষ্ট করেছ বলো দিকিনি?
নিখিলেশ বললে–বাঃ, তুমি তো বেশ উল্টো চাপ দিতে পারো! আমি কি শখ করে মদ খেতে গেছি?
–তা শখ করে না তো কি! মদ তো শখেরই জিনিস। তুমি তো শখ করেই মদ খেয়ে টাকা উড়িয়েছে।
–তা তো তুমি বলবেই। দোষ করলে তুমি নিজে আর মাঝখান থেকে অপরাধী হলুম আমি, বেশ।
নয়নতারা বললে–তা তুমি কি ছেলেমানুষ যে শীতেশবাবু তোমার গলায় জোর কবে মদ ঢেলে দিলে, আর তুমিও খেয়ে ফেললে? মদের দাম কি কম নাকি? কত টাকা এমনি করে নষ্ট করেছ বল তো?
নিখিলেশ বললে–কিন্তু তুমি যদি একজন বাইরের মানুষকে বাড়িতে এনে না তুলতে তো আমি কি মদ খেতুম?
নয়নতারা বললে–তা আমি না-হয় একটা লোককে অসুখ থেকে বাঁচাবার জন্যে টাকা নষ্ট করেছি, আর তুমি? তুমি ওই বিষগুলো কী বলে খেলে? দুটো জিনিস কি এক হলো?
নিখিলেশের হঠাৎ বোধহয় জ্ঞানোদয় হলো। সে এবার নিজেকে সামলে নিলে। বললে– যাক, যা হবার হয়ে গেছে, তা নিয়ে আর তর্ক করতে চাই না। কপালে ছিল টাকা গচ্চা যাওয়া, গচ্চা গেছে। এখন যে বুঝতে পেরেছ এইটুকুই যথেষ্ট–এখন কী করা যায় তাই ভাবা যাক–
সেই কথা ভাবতে ভাবতেই দুজনের অনেক দিন চলে গেল। অফিসে যাওয়ার পথে শুধু পরামর্শ আর পরামর্শ। টাকার চুলচেরা হিসেব চলতে লাগলো। একটু খরচ কমাতে হবে। খরচ কমালেই টাকা জমে যাবে।
নয়নতারা বললে–আমি যত কম খরচে চালাই আর কোনও মেয়ে তেমন করে চালাতে পারবে না। আমাদের অফিসের বন্ধুরা সবাই আমার চেয়ে দামী-দামী শাড়ী পরে তা জানো?
নিখিলেশ বললে–তাহলে আমিই কী মনে করো দামী-দামী সুট্ পরি?
নয়নতারা বললে–তাহলে খরচ কমানোর কথা বলছো কেন আমাকে? আমি কি কোনও দিন একটা পয়সা বাজে-খরচ করেছি?
নিখিলেশ বললে–আঃ, তুমি রাগ করছো কেন? আমি কি সেকথা বলেছি তোমাকে?
নয়নতারা বললে–কেন, তুমি নিজেও তো দেখেছ রাস্তায় মেয়েরা আজকাল কত দামী দামী শাড়ি ব্লাউজ-গয়না পরে যাচ্ছে। আর কারো বউ এমন কম খরচে সংসার চালাতে পারবে? আমি বাজি রাখতে পারি–
