–কী ব্যবসা করবে?
নিখিলেশ বললে–তা ভাবি নি কিছু, শুধু ভবিষ্যতের কথা ভেবেই বলছি। দুদিন বাদে তো সংসার বড় হবে, তখন খরচ আরো বাড়বে, এখন থেকে যদি কিছু প্ল্যান না করা যায় তো তখন মুশকিল হবে। তুমি কী বলো?
নয়নতারা বললে–আমি আর কী বলবো।
নিখিলেশ বললে–তুমি যদি এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য না করো তো আমি একলা কত করতে পারবো বলো! তুমি আমি দু’জন মিলে হাত লাগালে কাজটা বেশি এগোবে তা সে যে কাজই হোক–
নয়নতারা বললে–আগে ঠিক করো তুমি কী ব্যবসা করবে তবে তো সাহায্য করব। এমন এমন ব্যবসা করো যাতে অল্প পরিশ্রমে বেশি লাভ হয়।
-হ্যাঁ, তা তো বটেই। শেষকালে যদি দেখি ব্যবসাতে বেশি লাভ হচ্ছে তখন না হয় দু’জনে চাকরি ছেড়ে দেব। ভেবে দেখছি চাকরি চালিয়ে গেলে কোনও দিনই অভাব ঘুচবে না। আর এতদিন তো চাকরি করে দেখলুম, আমাদের সুপারিন্টেন্ট ভাদুড়ী সাহেব, তিন হাজার টাকা মাইনে পেয়েও তাঁর অভাব ঘোচে নি, প্রায়ই তো কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক থেকে তাঁকে লোন নিতে হয়।
ফুটপাথ দিয়ে অসংখ্য মানুষের চলমান স্রোতে আরো দু’জন মানুষ নিজেদের অদূর ভবিষ্যৎ নিয়ে এমনি করে রোজ মাথা ঘামায়। একদিন নয়, দুদিন নয়, বহুদিন থেকেই এমনি মাথা ঘামিয়ে এসেছে। আজও আবার মাথা ঘামাচ্ছে। মাঝখানে শুধু কয়েক মাস নয়নতারা একটু অন্য রকম হয়ে গিয়েছিল। তারপর আবার সুস্থ হয়েছে, আবার স্বাভাবিক হয়েছে। আবার যেন বুঝতে শিখেছে যে সংসারে ভাবপ্রবণতার কোন দাম নেই। ওসব সংস্কার। যতক্ষণ মনের সংস্কারকে প্রাধান্য দেবে ততক্ষণ জীবনে কোনও উন্নতি নেই। প্রচুর টাকার মালিক হবার পর ওসব মানায়। আমরা সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ, আমাদের প্রধান কাজ হবে পয়সা উপায় করা আর পয়সা জমানো। সংসারে তো পয়সাটাই আসল, এই বোধটা যদি একবার মনের মধ্যে পাকা করে গেঁথে দিতে পারো, তখন আর ও-সব বাজে চিন্তা তোমাকে গ্রাস করতে পারবে না। দয়া-মায়া-মমতা-সহানুভুতি ও-সব ছাপানো বইতে পড়তে ভালো। তোমার শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে তুমি দেখেছ তো তাদের কত টাকা! অত টাকা ছিল বলেই কর্তারা আরাম করে খেয়েছে পরেছে আর দুনিয়াকে ভোগ করেছে। কিন্তু তাদের ছেলেটার সেই বৈষয়িক বুদ্ধি ছিল না বলে অমন করে সব নষ্ট হয়ে গেল। নষ্ট করতে এক মিনিট লাগে, গড়াটাই শক্ত। আমরা যদি একটু বুদ্ধি-বিবেচনা করে চলি তো আমাদেরও একদিন ওইরকম আরাম হবে, জীবনকে ওইরকম ভোগ করতে পারবো। আগে তুমি ঠিক করে নাও তুমি ভোগ চাও না ত্যাগ চাও। যদি ভোগ চাও তো তার জন্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হবে। দুহাতে টাকা জমাতে হবে। টাকার ওপরে মায়া থাকা চাই। পৃথিবীতে তো ভিখিরির শেষ নেই, তুমি যদি তাদের ওপর দয়া করে তোমার কষ্ট করে উপায় করা পয়সা দান করতে যাও তো দেখবে তোমার সব টাকা এক ফুঁ-এ ফুরিয়ে গেছে। টাকাকে ভালোবাসতে হবে, টাকাকে বিশ্বাস করতে হবে, টাকাকে আদর করতে হবে, তবে তো টাকাও তোমাকে ভালোবাসবে বিশ্বাস করবে আদর করবে। তোমার শ্বশুর কি কখনও বাজে খরচ করতো? করতো না। পৃথিবীতে যারা যারা বড়লোক হয়েছে তারা কেউই কখনও বাজে খরচ করে নি। বাজে-খরচ কমাও দেখবে আমাদেরও অনেক টাকা জমবে। সেইজন্যেই তো ইংরিজিতে একটা কথা আছে : Don’t trust money but put your money in trust-টাকা হাতে রাখলেই খরচ করতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু ব্যাঙ্কে রাখো দেখবে টাকা থাকবে।
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস নয়নতারার কানের কাছে নিখিলেশ কথাগুলো বলতো। আর নয়নতারা মন দিয়ে সব শুনতো। বুঝতো, বুঝতে চেষ্টা করতো। অফিস থেকে বাড়িতে গিয়ে অফিসের কাপড়টা পাট করে আলমারির ভেতরে তুলে রাখতো! আবার পরের দিন আলমারি খুলে সেটা পরতো। এ তার বহুদিনের অভ্যেস। এই অভ্যেসটা আবার শুরু করে দিলে সে।
তার পরদিন ঠিক আবার সেই রকম। একদিন সদানন্দকে নিয়ে তাদের সংসারে যে উৎপাত শুরু হয়েছিল তা আবার মন থেকে মুছে গেল। আবার নয়নতারা ঠিক সময়মত অফিসে যেতে লাগলো। আবার ছুটির পর নিখিলেশ গিয়ে তাকে নিয়ে একসঙ্গে বাড়ি ফিরে আসতে লাগলো। একদিন যে তৃতীয় একটা মানুষকে নিয়ে তাদের মধ্যে এত সংঘাত বেধে গিয়েছিল তা আর কারো মনে রইল না।
নয়নতারা হঠাৎ এক-একদিন মনে করিয়ে দিত কই, তুমি যে সেই ব্যবসা করবার কথা বলেছিলে, সে-সব তো কিছু করলে না?
নিখিলেশ বলতো–তোমার তো ঠিক মনে আছে দেখছি–
নয়নতারা বলতো–বাঃ রে, মনে থাকবে না? মালা বোসের স্বামী তো চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা করছে, মালা বোসকে জানো তো?
–খুব জানি। রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়। তা কীসের ব্যবসা?
–হোটেলের ব্যবসা। একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে মেয়েদের বোর্ডিং-হাউস করেছে। যে সব মেয়েরা চাকরি করে, যে-সব মেয়েদের কলকাতায় থাকার জায়গা নেই, তাদের জন্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আছে–
–কটা ঘর?
–চারটে ঘর নিয়ে নাকি প্রথমে আরম্ভ করেছিল। তাতে জায়গা কুলোচ্ছিল না, এখন নাকি আর একটা মস্ত দোতলা বাড়ি ভাড়া নিয়েছে, তাতে শুনলুম অনেক টাকা আয় হচ্ছে এখন। এত টাকা হচ্ছে যে আর চাকরি করে দুদিক দেখা সম্ভব হচ্ছে না
–কত লাভ থাকে?
নয়নতারা বললে–মালা তো বললে–মাসে নাকি এখন এক হাজার দুহাজার টাকা আসছে। এর পরে যদি নিজেরা দেখতে পারে তাহলে লাভ বাড়বে। মালাও ভাবছে চাকরি ছাড়বে কি না–
