পরমেশ মৌলিক নিতাই হালদারকে থামিয়ে দিলেন। বললেন–নিতাই তুই থাম—
নিতাই মুখফোঁড় ছেলে বরাবর। বললে–কেন থামবো খুড়োমশাই? আমি কি কিছু অন্যায় কথা বলেছি? এখানে তো আরো দশজন গায়ের লোক আছে। সদানন্দকে কে না দেখেছে? সবাই জানে কত নাকাল হয়েছে আত্মীয়স্বজনের কাছে। নিজের বাপ যখন তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, এক মুঠো ভাত দিয়ে ছেলেকে বাঁচায় নি, তখন এই মামা তো এসে তাকে নিজের বাড়িতে ঠাঁই দেন নি। যতদিন দিদি ছিল, যতদিন টাকা যুগিয়েছে, ততদিন খুব খাতির, ততদিন শালাবাবু ঘরের লোক, আর যেই দিদি মারা গেল আর উধাও–
প্রকাশ রায়ের কথাগুলো ভালো লাগলো না। সুটকেসটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। বললে–আমি তাহলে উঠি–
নিতাই হালদার বললে–আমাদের কথাগুলো শুনতে ভাল লাগছে না কিনা তাই উঠে যাচ্ছেন। কড়া কথা কারই বা শুনতে ভালো লাগে, বলুন?
প্রকাশ রায় আমতা আমতা করে বলতে লাগলো–না, মানে সদানন্দকে খুঁজতেই তো আমি এখানে এসেছিলাম, তা সে যখন এখানে নেই তখন অন্য কোথাও চেষ্টা করে দেখি গে–
নিতাই বললে–হ্যাঁ, অন্য কোথাও গিয়ে খুঁজে বার করবার চেষ্টা করুন, খুঁজে বার করে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তুলুন, তুলে জামাই-আদরে রেখে তার মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে দিয়ে একটা যা-তা কাগজে সই করিয়ে নিন, তারপর তাকে লাথি-ঝাঁটা মেরে দূর করে দিন গে, কেউ কিছু জানতে পারবে না, মাঝখান থেকে জামাইবাবুর লাখ লাখ টাকার সম্পত্তি আপনাদের হাতে এসে যাবে–
সেদিন গ্রামের লোক যে কথাগুলো বললে–তার একটাও কিন্তু মিথ্যে নয়। সবাই জানতো হরনারায়ণ চৌধুরী শ্বশুরেরও অনেক টাকা পেয়েছিলেন। নবাবগঞ্জের অত সম্পত্তি সব কিছু বিক্রি করে যা পেয়েছিলেন সব নিয়ে গিয়ে তিনি ভাগলপুরে উঠেছিলেন। সদানন্দর ঠাকুর্দা মা, সবাই তখন মারা গেছে। নয়নতারাও শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে তখন কেষ্টনগরে তার বাপের বাড়িতে গিয়ে উঠেছে। সমস্ত বাড়িটা যেন তখন রাতারাতি শ্মশান হয়ে গেছে। চৌধুরী মশাই এই নবাবগঞ্জে তখন সারা বাড়িতে একলাই কাটাতেন। আর সদানন্দ তখন কোথায় থাকতো কে জানে! কেউ তার কোনও খোঁজও রাখতো না।
ওই পরমেশ মৌলিক যেখানে বসে আছেন, এই বারোয়ারিতলার মাচার ওপর সদানন্দ অনেক দিন অনেক রাত কাটিয়েছে।
নিতাই হালদার জিজ্ঞেস করতো–ছোটবাবু, আপনি বাড়ি যাবেন না? রাত যে অনেক হলো?
তখন হরনারায়ণ চৌধুরী মশাই মস্ত বাড়িটাতে একলা থাকতেন। নবাবগঞ্জের বারোয়ারিতলা থেকে দেখা যেত চৌধুরীদের বাড়িটা। সারা বাড়িতে অসংখ্য ঘর। চারমহলা বাড়ি। দক্ষিণ দিকে সেই পুকুরটা। একেবারে বাড়ির লাগোয়া। পুকুর থেকে উঠতেই পাড়ের ওপর সার সার ধান চাল ডালের মরাই। পুকুর আর মরাই-র মাঝখানে অনেকখানি লম্বা জায়গা জুড়ে শাক-সজির বাগান। লাউ-কুমড়ো-উচ্ছের মাচা। কয়েকটা পেঁপে গাছ, বেগুনের ক্ষেত। যখন চৌধুরী বাড়ি জমজমাট ছিল তখন ওইখানে বাড়ির মেয়েদের শাড়ি শুকোতো সার সার। শুকোবার পর গৌরী পিসী এসে আবার বিকেলের দিকে সেগুলো তুলে নিয়ে গিয়ে ভেতর বাড়িতে যার যার ঘরে সাজিয়ে রেখে দিত। যখন রাত হতো তখন ও জায়গাটায় আর যেতে পারা যেত না। ভয় করতো। কিন্তু তার পাশেই ছিল গোয়ালঘর। সেই রাতির বেলা অনেকদিন সদানন্দ ওই পুকুরের শানবাঁধানো ঘাটের ওপর চুপ করে বসে থাকতো। তার মনে হতো পুকুরের জলের মধ্যে থেকে যেন কারা দল বেঁধে উঠে আসছে তার দিকে। মানুষের মত চেহারা তাদের, কিন্তু ঠিক যেন আবার মানুষও নয়।
কাছে আসতেই সদানন্দ ভয় পেয়ে যেত। চেঁচিয়ে বলে উঠতোকে তোমরা? তোমরা কারা?
লোকগুলো হাসতো। বলতো–আমাদের তোমরা চিনতে পারবে না গো, আমাদের চিনবে না তুমি–
সদানন্দ বলতো কিন্তু তোমরা এখানে কী করতে এসেছো? বাড়ির ভেতরে যাবে নাকি?
লোকগুলো আরো হেসে উঠতো। বলতো–আমরা সব জায়গায় যেতে পারি–
–কিন্তু তোমরা এখানে কী করতে এসেছ?
–দেখতে।
–কী দেখতে?
–দেখতে এসেছি তোমরা কেমন আছো! দেখতে এসেছি নবাবগঞ্জের সব মানুষ কেমন আছে।
–তোমাদের বাড়ি কোথায়?
–এই নবাবগঞ্জেই আমাদের বাড়ি ছিল একদিন। কিন্তু এখানে আর আমাদের কোনও বাড়ি নেই। এখন সব জায়গাতেই আমাদের বাড়ি, এখন আমরা সব জায়গাতেই যেতে পারি।
–তবে কি তোমরা ভূত?
লোকগুলো সদানন্দর প্রশ্ন শুনে হেসে উঠতো। বলতে–ভয় পাচ্ছো বুঝি? ভয় পেয়ো না। আমরা রোজ রোজ এখানে আসি, আমরা রোজ রোজ এখানে আসবো। আমাদের কেউ আটকাতে পারবে না। এখানে আগে তো আসতে পারতুম না। আমরা চৌধুরী মশাই-এর কাছারিবাড়িতে এসে এককালে তার সামনে হাতজোড় করে বসে থাকতুম। খাজনা মকুব করতে বলতুম। আগে আমরা ছিলুম কালীগঞ্জের জমিদারবাবুর প্রজা, পরে আমরা হলুম চৌধুরী মশাই-এর প্রজা। আমরা খরার সময় খাজনা দিতে পারি নি। যেবার ঝড়ে আমাদের বাড়ি পড়ে গিয়েছিল, আমরা চৌধুরী মশাই-এর ঝাড় থেকে বাঁশ কেটেছিলুম, তার জন্যে আমাদের নামে সদরের কাছারিতে ফৌজদুরি মামলা হয়েছিল।
–তারপর?
–তারপর আমাদের জমি খাস হয়ে গিয়েছে, আমাদের ভিটে-মাটি উচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছে। এই দেখ, এর দিকে চেয়ে দেখ, এর গলায় কীসের দাগ দেখছো?
–কীসের দাগ?
সদানন্দ সেই অন্ধকারের মধ্যেই লোকটার গলার কাছে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে দেখলে। অস্পষ্ট ছায়া সব। তবু মনে হলো সেখানকার ছায়াটা যেন আরো ঘন, আরো গম্ভীর হয়ে উঠেছে।
