আর যদি সে এতদিন নবাবগঞ্জের চৌধুরী বাড়ির আদরের বউ হয়ে থাকতো, তাহলেই বা তার কী এমন অক্ষয় স্বর্গলাভ হতো। সেই তো শ্বশুর-শাশুড়ীর তাঁবে থেকে ঘোমটা দিয়ে সংসারের যাঁতাকলে পিষে রক্তাক্ত হয়ে রাত্রে স্বামীর পাশে গিয়ে শুয়ে ঘুমোত আর বছরে বছরে সন্তানের জন্ম দিয়ে শ্বশুর বংশ বৃদ্ধি করতো। এই তো শতকরা নিরানব্বই ভাগ মেয়েরই বিধিলিপি। তার চেয়ে তো এ ভালো। এই সকালবেলা ট্রেনে করে অফিসে গিয়ে গল্প করা আর দু’চারটে কাজ সেরে আবার সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফেরা। এর চেয়ে আর বেশি ভালো কী হতে পারে! এর চেয়ে আর কোন্ মেয়ে বেশি পায়!
সমস্ত দিনটা যে কোথা দিয়ে কেটে গেল তা বুঝতেই পারলে না নয়নতারা। আবার সেই মালা বোস, সেই কেতকী হাজরা, আর সকলের ওপর সেই অরুণা পাল আর ডেসপ্যাঁচ সেকশনের বড়বাবু রসিকদাস চ্যাটার্জির প্রেমের গল্প। সমস্ত দিন অফিসখানা সেই তাদের প্রেমের গল্পের আলোচনাতেই গুলজার হয়ে রইল।
মালা বোস এল। কেতকী হাজরাও এল। মালা বললে–তুমি ছিলে না নয়নদি, আমাদের দিন আর কাটছিল না সত্যি–
আর শুধু কি অরুণাদির গল্প! আরো কত কেলেঙ্কারির গল্প যে এতদিন জমা হয়েছিল তার ঠিক নেই। নয়নতারাকে সব একে-একে শুনতে হলো। কে একটা নতুন সিফন শাড়ি কিনেছে, কে নতুন হার গড়িয়েছে, কার শাশুড়ীর বুড়ো বয়সে আবার একটা ছেলে হয়েছে, সব শুনতে হলো নয়নতারাকে। নয়নতারারও সে-সব খবর শুনতে বেশ ভালোও লাগলো। তারপর যখন গল্প বেশ জমে উঠেছে, হঠাৎ তখন হুঁশ হলো আর সবাই যে-যার কাজকর্ম ছেড়ে কখন উঠে পড়েছে। সকলকে ট্রামবাস ধরতে হবে। বাড়ি যাবার তাড়া তখন সকলেরই। তখন কোনও রকমে নিজের কোটরে গিয়ে আশ্রয় পেলেই যেন একটা রাত্রের জন্যে সবাই বাঁচে। তারপর কাল দিনেরবেলা আবার সবাই এসে এক জায়গায় জুটবে।
নিখিলেশ নিচের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। সিঁড়ি দিয়ে দলে দলে সবাই হুড়-হুড় করে নামছে। তাদের মধ্যে মাঝে মাঝে এক-একজন মেয়ে। নিখিলেশ সকলের মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে একটা চেনা মুখই কেবল খুঁজতে লাগলো সকলের মুখের মধ্যে। প্রথম দিন কেমন যেন ভয় করতে লাগলো তার। নয়নতারাকে তার অফিসে ঢুকিয়ে দিয়ে সে নিজের অফিসে চলে গিয়েছিল। সমস্ত দিন কাজে মন লাগে নি। কেবল ভেবেছে কতক্ষণে ছুটি হবে, কতক্ষণে বিকেল পাঁচটা বাজবে।
শীতেশ একটা কাজে এসেছিল। বললে–কী হে, আজ কখন বাড়ি যাবে?
নিখিলেশ বললে–আজ ভাই একটু তাড়া আছে!
শীতেশ বললে–আজকাল তোমার এত তাড়া থাকে কেন বলো তো? আগে তো এরকম তাড়া থাকতো না–
নিখিলেশ আর কী বলবে! বললে–না ভাই, বাড়িতে সত্যিই একটু কাজ আছে–
–কেন? গিন্নীর অসুখ এখনও ভালো হয় নি?
–আজকে ভাই গিন্নী প্রথম অফিসে এসেছে—
এতক্ষণে বুঝলো শীতেশ। সে ব্যাচিলার মানুষ, একলা, তার কোনও দায়-দায়িত্ব নেই কারো ওপর। বেপরোয়া, নির্বিবাদী জীবন। সারা জীবন টাকা কামাতে চেয়েছে আর ফুর্তি করতে চেয়েছে। পৃথিবীতে কার কী সুখ-দুঃখ তা বোঝবার দায়-দায়িত্ব নেই তার। চাকরিটা যতদিন আছে ততদিন আরাম করে বেঁচে নাও। আর তারপর? তারপরের কথা তার পরে ভাববো মশাই। আগে তো বর্তমান, ভবিষ্যতের কথা ভবিষ্যৎই ভাববে।
কিন্তু নিখিলেশের তো অমন বেপরোয়া হলে চলে না। তাকে দশজনের মাথায় উঠতে হবে, আর দশজনের মাথার ওপরে উঠতে গেলে যা করতে হয় তাই করতে হবে। তা করতে গেলে লজ্জা পেলে চলবে না। সঙ্কোচ করলে চলবে না। লোকের পকেট কাটা ছাড়া আর যা-কিছু করতে হয় তা করতে সে পেছপাও হবে না।
–এই যে, এত দেরি হলো যে তোমার?
নয়নতারা তরতর করে আর সকলের সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। সামনে এসে বললে–কখন পাঁচটা বেজে গেছে খেয়াল ছিল না কারো
নিখিলেশ বললে–কেন, এত গল্প কীসের?
–আমাদের সেই অরুণাদির কথা মনে আছে? তার সঙ্গে বাজেট-সেকশানের বড়বাবু আর-ডি চ্যাটার্জির বিয়ে!
–তাই নাকি? শেষ পর্যন্ত তোমাদের অরুণাদি তাহলে বিয়ে করলেন?
–সেই কথাই তো হচ্ছিল এতক্ষণ। অফিসময় তাই নিয়ে খুব হইচই হচ্ছিল, সারাদিন কাজই হয় নি কারো।
বলে সমস্ত গল্পগুলো একে-একে বলতে লাগলো নয়নতারা। নিখিলেশের মনে হলো নয়নতারা যেন একদিনেই বেশ স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এই স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনবার জন্যেই এতদিন চেষ্টা করে আসছিল নিখিলেশ। নয়নতারা তার পাশে পাশে চলেছে। ফুটপাথে রাস্তায় অনেক মানুষের ভিড়। কলকাতায় অফিসের ছুটি-পাওয়া মানুষ কেমন করে বাড়ি যাবে তারই উদ্বেগ নিয়ে সবাই রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে–
নিখিলেশ বললে–চলো একটা ট্যাক্সি ধরবার চেষ্টা করি–
নয়নতারা আপত্তি করলে। বললে–কেন আবার মিছিমিছি ট্যাক্সি করবে? তার চেয়ে হেঁটে যাওয়াই ভালো, সবাই তো হেঁটে যাচ্ছে–
এ সেই আগেকার নয়নতারা। যে নয়নতারা বাজে খরচ কমিয়ে তাদের দু’জনের সঞ্চয় বাড়িয়েছে, আর ভবিষ্যতের সমৃদ্ধি আর সুখকে উজ্জ্বল করবার জন্যে বর্তমানকে বঞ্চনা করেছে।
রাস্তায় ফুটপাথে চলতে চলতে নিখিলেশ বললে–-দেখ আমি ভাবছি একটা ব্যবসা করবো–
–ব্যবসা? ব্যবসা করতে গেলে তো টাকা লাগবে। আমাদের টাকা কোথায়?
নিখিলেশ বললে–চাকরি করলে কোনও দিন কিছু হবে না, সারাজীবন কেবল ওই চাকরিই করে যেতে হবে–তার চেয়ে ভাবছিলাম অফিসের পরে তো হাতে অনেক সময় থাকে, তখন সময় নষ্ট না করে বরং কিছু করলে হয়। আমাদের অফিসে অনেকে করছে
