সে-সব দিনের কথাও মনে আছে নয়নতারার। সংসারের ওপর নিখিলেশের যত টান ছিল তার চেয়ে দশ গুন বেশি টান ছিল নয়নতারার। বলতে গেলে নয়নতারাই তখন নিখিলেশকে তাড়া দিত। একটা পয়সা বাজে খরচ করলে নিখিলেশকে কথা শোনাতো নয়নতারা। তখন নিখিলেশ কেউ না, নয়নতারাই ছিল সংসারের আসল মালিক। আর এখন যেন উল্টো হয়ে গেছে। এখন নিখিলেশকেই সব ব্যাপারে তাড়া দিতে হয় নয়নতারাকে। নিখিলেশ অফিসের পর সোজাসুজি হাতের কাছে যে ট্রেন পায় তাইতেই বাড়ি চলে আসে। এসে একেবারে সোজা নয়নতারার কাছে চলে যায়। বলে কী হলো, আজ খেয়েছ?
নয়নতারা বলে—হ্যাঁ—
নিখিলেশ আবার জিজ্ঞেস করে–তাহলে কবে থেকে অফিসে যাবে?
এ কথার কোনও জবাব দিতে পারে না নয়নতারা। নিখিলেশও জবাবের জন্যে তেমন পীড়াপীড়ি করে না। তাদের সংসারের ওপর যে ধাক্কাটা গেছে তার পর থেকে একটু সাবধানে কথা বলে নিখিলেশ। নইলে শেষ পর্যন্ত ঝোঁকের মাথাতে নয়নতারা আবার কী করে বসে কে বলতে পারে!
একদিন নিখিলেশ এসে বললে–একটা খবর আছে, জানো—
নয়নতারা মুখ তুলে চাইলে।
নিখিলেশ বললে–আজকে সদানন্দবাবুকে দেখলুম—
এতক্ষণে নয়নতারা আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারলে না! বললে–কোথায়?
–কলকাতায়। দেখলুম চেহারার মধ্যে খুব জৌলুস বেরিয়েছে আবার। খুব সাজগোজ। স্বাস্থ্য খুব ভালো হয়ে গেছে এখন–
নয়নতারা জিজ্ঞেস করলে–তোমায় কিছু জিজ্ঞেস করলেন নাকি?
নিখিলেশ বললে–না, জিজ্ঞেস করবার তো সময়ই হলো না, আমাকে তো তিনি দেখতে পান নি, আমিই তাকে দেখলুম একটা গাড়ির মধ্যে।
–গাড়ি?
নিখিলেশ বললে–হ্যাঁ, মটরগাড়ি। মনে হলো একটা নতুন গাড়ি কিনেছেন, গাড়িটা সোঁ করে পাশ দিয়ে চলে গেল পাশে দেখলুম একজন মহিলা বসে আছে–
–মহিলা?
–হ্যাঁ, দেখতে খুব সুন্দরী মনে হলো, সিঁথিতে আবার সিঁদুর রয়েছে—
কথাটা শুনে নয়নতারা যেন খানিকক্ষণ হতবাক হয়ে চেয়ে রইল নিখিলেশের দিকে। কিছু বলবার ক্ষমতাও যেন তখন আর নেই তার।
নিখিলেশ তার সেই মুখের ভাব দেখে আরো কাছে সরে এল। বললে–দেখ, আসল জিনিস হচ্ছে টাকা। টাকা পেয়েই সব ভুলে গেলেন আর কি! মুখে তো আমরা কত বড় বড় আদর্শের কথা সবাই-ই বলি। এই আমারই কথা ধরো না। সদানন্দবাবুর মত কত আদর্শ এককালে তো আমারও ছিল। তুমি তো সবই জানো নয়ন তোমাকে তো সবই বলেছি। মদের দোকানে পিকেটিং-এর জন্যে পুলিসের কত লাঠির ঘা খেয়েছি। কিন্তু সেই আমিই তো এখন আবার চাকরি করছি। আর সে চাকরিও এমন কিছু কেষ্ট-বিষ্টুর চাকরি নয়। এখন কি আর আমি সেই আদর্শকে ধরে রাখতে পেরেছি? এখন কি আর সেই তখনকার মত খদ্দর পরি? এখন শুধু সস্তার প্রশ্ন, টেকসই এর প্রশ্ন। অথচ এককালে তো এসব কল্পনাও করতে পারতুম না–
কথাগুলো নিখিলেশ খুব সহজ সুরেই বলে গেল অবশ্য। কিন্তু সে জানতেও পারলে না সেই কথাগুলো নয়নতারার মনে কী গভীর কী স্থায়ী দাগ কেটে দিয়ে গেল।
নিখিলেশ সুযোগ বুঝে আবার বলতে লাগলো দেখ আমারও সদানন্দবাবুর জন্যে যে দুঃখ হতো না তা নয়। সত্যিই তো ভদ্রলোকের অত টাকা, অমন স্বাস্থ্য, বংশের একমাত্র সন্তান। আমি যদি ও রকম হতুম আর তোমার মত স্ত্রী পেতুম তো আমিই কি আর ওঁর মতন সংসার ছেড়ে বিবাগী হতুম? বিবাগী হতে বয়ে গেছে আমার! কবে পূর্বপুরুষ কী পাপ করে গেছে তা নিয়ে পৃথিবীতে কেউ মাথা ঘামায়? আসলে তো সবাই আমরা নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। আমরা জন্মাবার আগে ও পৃথিবী ছিল কি ছিল না তা নিয়েও কেউ মাথা ঘামাই না। তেমনি আমি মারা যাবার পর এ পৃথিবী গোল্লায় যাবে না জাহান্নামে যাবে, তা নিয়েও কারো মাথাব্যাথা নেই। আসল হচ্ছে, কেবল আমি আমি আর আমি। আমি মনে করি যেদিন থেকে পৃথিবীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক, সেই-দিনই এই পৃথিবীর জন্ম হয়েছে। আর যা-কিছু এই চারপাশের পৃথিবীতে রয়েছে সবই আমার সুখ-সুবিধার জন্যে। যেদিন আমার সুখ-সুবিধার সঙ্গে চারপাশের এই পৃথিবীর ক্লাশ বাধবে, সেইদিনই আমি তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো। এই-ই তো নিয়ম। সদানন্দবাবুও বোধ হয় এতদিন পরে তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছেন, তাই এখন সোজা পথ ধরেছেন
এমন করে রোজই একতরফা বক্তৃতা দিত নিখলেশ। সেদিন সকাল বেলাই বললে– চলো চলো নয়নতারা, অফিসে চলো, আর কার জন্যে তুমি এমন মনমরা হয়ে থাকবে বলো। পৃথিবীতে কে কার? আমিও তোমার নই, তুমিও আমার কেউ নও। আজ যদি আমিই ধরো হঠাৎ মারা যাই, মারা যেতেও তো পারি, তখন তোমার কী অবস্থা হবে বলো তো? তখন তো এই চাকরিই তোমাকে বাঁচাবে? আর চাকরি মানেই নগদ টাকা! এই যে এতদিন তুমি কামাই করলে, কই, তোমার চাকরি কি গেল? রিটায়ার করবার দিনটা পর্যন্ত এই চাকরিটাই তোমার একমাত্র নিজের জিনিস, আর সব কিছু পর। তোমাকে যদি কেউ বাঁচাতে পারে তো সে সদানন্দবাবু নয়, কেউই নয়, সে কেবল এই চাকরি! চাকরির ওপর কখনও রাগ করতে আছে? চলো আজকে তোমাকে আমি অফিসে পৌঁছে দিয়ে আসি– চলো, আমার কথা শোন–
আশ্চর্য, যে মানুষ এতদিন তার উপরোধ-অনুরোধ শোনেনি, সেই মানুষই আবার হঠাৎ সেদিন উঠলো। উঠে সকালে স্নান সেরে নিলে। ভাত খেলে। কাচা শাড়ি-ব্লাউজ পরলে, চুল আঁচড়ালে, সিঁথিতে সিঁদুর দিলে। আর তারপর চটি পায়ে আবার সেই আগেকার মত নিখিলেশের সঙ্গে রাস্তায় বেরোল সত্যিই তো, চাকরিটাই তো তার সব। এই শাড়ি ব্লাউজ চটি পরে যে সে অফিসে যাচ্ছে, এই যে একটা অফিসের চেয়ারে তার আশ্রয় পাকা হয়ে আছে, এটা তো সম্ভব হয়েছে শুধু তার চাকরির জন্যেই! চাকরিটা না থাকলে তার কী হতো! চাকরি না থাকলে তাকে সারাদিন সেই চারটে দেওয়ালের মধ্যেই বন্দী হয়ে কাটাতে হতো। নিখিলেশের মাইনের টাকার ওপর নির্ভর করলে তো তারই দাসত্ব করতে হতো তাকে। সে যে স্বাধীন, সে যে একটা মানুষ তা উপলব্ধি করবার মত শক্তিও তো তার হতো না।
