বলতে বলতে হঠাৎ প্রকাশ মামা শিউরে উঠেছে–ও কী, তোর গা এত গরম কেন? জ্বর হলো নাকি, দেখি–
হ্যাঁ, সত্যিই জ্বর। জ্বরই তো। প্রকাশ মামা তাকে ধরে ধরে ধর্মশালার দিকে টেনে নিয়ে চললো।
.
অনেক দিন পরে আবার নয়নতারা অফিসে এসেছিল। নিখিলেশ আর একা ছাড়তে ভরসা পায় নি তাকে। নৈহাটি থেকে একসঙ্গে দুজনে এসেছে। অদ্ভুত মেয়েমানুষের মন, আর অদ্ভুত সেই মনের গতি। যেন ঝড়ের মতন কেটে গিয়েছিল এই ক’টা মাস! কোথা থেকে কে একজন তাদের জীবন-ধারার মধ্যে এসে একটা ঘূর্ণি সৃষ্টি করে দিয়ে আবার একদিন নিঃশব্দে চলে গিয়েছিল। প্রথম প্রথম নয়নতারা নিখিলেশের সঙ্গে কথাই বলতো না। সারা দিন মুখ ভার করে থাকতো। তারপর বাইরের ঘরে যেখানে সদানন্দ শুতে সেই ঘরে বিছানার ওপর গিয়ে শুয়ে পড়তো।
নিখিলেশ বলতো–তুমি এখানে শুচ্ছো কেন? ও-ঘরে শোবে না?
প্রথমে কোনও উত্তর দিত না নয়নতারা। তবু বার বার পীড়াপীড়ি করতে নিখিলেশ। বলতো–লক্ষ্মীটি ওরকম করতে নেই, যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে, সে কথা ভেবে তুমি মন-খারাপ করে রয়েছ কেন? মানুষ কি অন্যায় করে না? আমি তো বলছি আমি অন্যায় করেছি। তুমি ওঠো, ও-ঘরে গিয়ে শোবে চলো। চলো–
বলে নয়নতারার হাত ধরে আস্তে আস্তে টানতো। কিন্তু নয়নতারা তার নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অন্য পাশ ফিরে শুতো। নিখিলেশের কোনও কথায় আর জবাব দিত না সে। তখন আর কোনও উপায় না পেয়ে নিখিলেশ আবার তার নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়তো।
এমনি রোজ! রোজ-রোজই এমনি করে নিখিলেশ ডাকতে আসতো। সারা দিন সময় পেলেই বোঝাতে বসতো নয়নতারাকে। বলতো–এ রকম করে থাকলে যে শেষকালে একদিন অসুখ হবে তোমার, অসুখ হলে তখন কী করবে বলো তো? তখন তো আমাকেও অফিস কামাই করতে হবে–তখন সংসার কী করে চলবে বলো দিকিন? গিরিবালা বলছিল তুমি নাকি খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছ? যদি সদানন্দবাবু চলে গিয়ে থাকেন তো আমি কী করবো বলো তো! আর যদি তুমি চাও তো আমি না-হয় নবাবগঞ্জে গিয়ে একবার দেখে আসতে পারি–
নয়নতারা নিখিলেশকে ঠেলে দিত, বলতো–তুমি যাও, তুমি আমার সামনে থেকে চলে যাও, আমি তোমার মুখ দেখতে চাই না–
সেদিন নিখিলেশ বললে–আচ্ছা আমি কালকে অফিসে না গিয়ে নবাবগঞ্জেই যাবো, কথা দিচ্ছি সেখানে গিয়ে দেখে আসবো তিনি কেমন আছেন, এখন হলো তো?
নয়নতারা এ-কথার উত্তর দিলে না।
কিন্তু সত্যি-সত্যিই নিখিলেশ পরদিন ভোরের ট্রেনেই চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল–আমি নবাবগঞ্জে যাচ্ছি বুঝলে, ফিরতে আমার একটু রাত হবে–
নিখিলেশ চলে গেল। সমস্ত দিনটা ঘরের ভেতরে নয়নতারা কেমন ছটফট করতে লাগলো। কিন্তু রাত দশটার ট্রেনে নিখিলেশ ফিরে এল হাসতে হাসতে।
নয়নতারা সমস্ত দিন খবরটা শোনবার জন্যে উন্মুখ হয়ে বসে ছিল। আসলে নিখিলেশ নবাবগঞ্জেও যায় নি, কোথাওই যায় নি। সারাদিন কলকাতায় ঘুরে বাড়িতে এসেই নয়নতারার কাছে গিয়ে বললে–শুনেছ, দেখা হলে–
নয়নতারা এতদিন পরে সহজদৃষ্টিতে চাইলে নিখিলেশের দিকে।
নিখিলেশ বললে–দেখে এলুম খুব আরামে আছেন সদানন্দবাবু, এই কদিনেই দেখলুম তাঁর চেহারা একেবারে খুব ভালো হয়ে গেছে।
নয়নতারার মুখ দিয়ে তখনও কোনও কথা বেরোচ্ছে না।
নিখিলেশ বলতে লাগলো–আমি তো সে বাড়িতে গিয়ে প্রথমে চিনতেই পারি নি। বাড়ির চেহারাই বদলে গিয়েছে একেবারে। মনে হলো বাড়ির ভেতরে কিছু কাণ্ড-টাণ্ড চলেছে, খুব ধুমধাম, ভেতর থেকে লুচি-ভাজার গন্ধ নাকে আসছে। আমাকে তো প্রথমে চিনতেই পারলেন না–
নয়নতারার মুখে এতক্ষণে কথা বেরোল। বললে–তোমায় চিনতে পারলেন না?
নিখিলেশ বললে–না, শেষকালে যখন আমি বললুম আমি নয়নতারার স্বামী তখন খুব খাতির-যত্ন করলেন, আমাকে খেয়ে যেতে বললেন, তোমার কথাও জিজ্ঞেস করলেন। বললেন–নয়নতারা কেমন আছে?
শুনতে শুনতে নবাবগঞ্জ সম্বন্ধে নয়নতারার যেন আরো কথা শুনতে ইচ্ছে করতো।
মনে হতো যেন নিখিলেশ নবাবগঞ্জ সম্বন্ধে যদি আরো কিছু খবর দেয়। আরো কিছু বলে। কিন্তু নিজের মুখে সেকথা জিজ্ঞেস করতে তার সঙ্কোচ হতো। আসলে সদানন্দ সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞেস করাই তো অন্যায়। শুধু অন্যায় নয়, পাপ। যখন নিখিলেশ অফিসে চলে যেত তখন যেন আর তার সময়ই কাটতে চাইতো না। বাড়িতে সংসারের কত রকম কাজ পড়ে থাকত। গিরিবালা এক-এক সময় এসে জিজ্ঞেস করতো–দিদিমণি, খেয়ে নেবে না? অনেক বেলা হয়ে গেল যে।
অথচ যে না-খেলেই ভালো হয়। শুধু খাওয়া নয়, কোনও কিছু কাজ না করলেই যেন সে বেঁচে যায়। আগে সংসারের উপর কত মায়া ছিল নয়নতারার। এই খাট-আলমারি বাসন সমস্ত কিছু সে কত পছন্দ করে কিনেছে। নিখিলেশ আর সে মিলে দিনের পর দিন কলকাতায় গিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরেছে। কিছুতেই যেন আর তার পছন্দ হয় না। দোকানদাররাও তার খুঁতখুঁতে পছন্দের বহর দেখে বিরক্ত হয়ে গেছে। নিখিলেশও বলেছে–অত বাছাবাছি করলে চলে? যা হোক একটা কিনে নাও না–
নয়নতারা ঝাঁঝিয়ে উঠতো। বলতো–তুমি থামো তো, তুমি কেন বাড়ির ব্যাপারে মাথা ঘামাচ্ছো? পছন্দ না হলে আমি জিনিস কিনবো কেন? আমার টাকা বুঝি সস্তা? দোকানদার তো তার জিনিস বিক্রি করতে পারলেই খুশী, কিন্তু আমি কেন তার কথায় কান দেব?
