পাঁড়েজী পেছন থেকে ডাকলে–বাবুজী, আবার কোথায় যাচ্ছেন?
–আমি আসছি পাঁড়েজী, আমি এখুনি আসছি–বলে সদানন্দ বাইরে বেরিয়ে গেল।
পাঁড়েজী জিজ্ঞেস করলেন–আপনি বাবুজীর কে হন?
প্রকাশ বললে–ও আমার ভাগ্নে হয়, আমি ওর মামা। কিন্তু ও এ ধর্মশালায় এসে জুটলো কী করে?
পাঁড়েজী বললে–বাবুজী পাগল আছে বাবু। আমিই বাবুজীকে এখানে ডেকে এনেছি। বাবুজীর তো থাকবার কোনও জায়গা ছিল না। বাড়িওয়ালা বাবুজীকে তাড়িয়ে দিয়েছিল—
কিন্তু এত দিন পরে বাপুজী এসে টাকা নিয়ে আবার কোথায় চলে গেল বুঝতে পারলে না সে।
প্রকাশ মামা জিজ্ঞেস করলে–তা পাঁড়েজী, তুমি জানো বাবুজী কে? কোন বংশের ছেলে? তুমি যে বাবুজীকে তোমার এখানে থাকতে দিলে, তা বাবুজীর কোনও খোঁজ-খবর কখনও নিয়েছ?
পাঁড়েজী বললে—না–
প্রকাশ বললে–যদি না জানো তো শুনে নাও। তোমার বাবুজী এখন আট লাখ টাকার মালিক, বুঝলে?
–আট লাখ রুপেয়া!
–হ্যাঁ, আট লাখ টাকা! ইচ্ছে হলে তোমার মালিকের এই ধর্মশালাটাও কিনে নিতে পারে! তোমাকে মাসকাবারি মাইনে দিয়ে চাকর রাখতে পারে! অথচ এই এখখুনি দেখলে তো, পকেটে একটা পয়সাও নেই বাবুর আমার কাছে টাকা ধার চেয়ে নিয়ে গেল–
পাঁড়েজী জিজ্ঞেস করলে–তা বাবুজী টাকা নিয়ে কোথায় গেল আবার?
–কোথায় আবার, ওই রাস্তায়। রাস্তায় কতকগুলো ভিখিরি ওকে ছেঁকে ধরেছিল তাদের ভিক্ষে দিতে গেল–আমি তো তাই তোমার বাবুজীকে দেশে নিয়ে যেতে এসেছি। যার অত টাকার সম্পত্তি, অত জমিদারী, সে কেন এখানে তোমার এই ধর্মশালায় পড়ে থাকবে! তা এখেনে ওর কী করে চলে? কে খেতে দেয়?
পাঁড়েজী বললে–ওই একটা চাকরি যোগাড় করে দিয়েছিলুম, ছেলে পড়ানোর চাকরি, তাইতে চলে–
–সেই টাকায় চলে?
পাঁড়েজী বললে–চলবে কি করে? রাস্তায় আসবার সময় যে হাত পাতে তাকেই দিয়ে দেয়– শীতকালে একটা গায়ের চাদর কিনে দিয়েছিলুম তা সেটাও একদিন কোথাকার কোন্ কালীগঞ্জের বউকে দিয়ে দিলে–
–কালীগঞ্জের বউ?
–হ্যাঁ বাবু, একটা বুড়ি আছে, সে এখানকার খাটাল থেকে গোবর কুড়িয়ে কুড়িয়ে দেয়ালে-দেয়ালে ঘুঁটে দিয়ে বেড়ায়, তাকে বাবুজী কালীগঞ্জের বউ বলে ডাকে—
আশ্চর্য! প্রকাশ মামা কথাটা শুনে আরো অবাক হয়ে গেল। বললে–এইজন্যেই তোমার বাবুজী এত রোগা হয়ে গিয়েছে
পাঁড়েজী বললে–-রোগা তো হবেই, বাবুজী তো কিছু খায় না। এই তো ক’মাস আগে চলে গিয়েছিল, এতদিন পরে এল, এখন দেখছি আরো রোগা হয়ে গিয়েছে।
প্রকাশ জিজ্ঞেস করলে–তা এতদিন কোথায় গিয়েছিল তা জানো?
–কে জানে কোথায় গিয়েছিল বাবুজী! দুদিনের জন্যে দেশে যাবে বলে গিয়েছিল, আর আজ তো আপনার সঙ্গে ফিরছে–
.
কিন্তু ওদিকে বড়বাজারের রাস্তার সেই ঠাকুরের সামনে তখনও ধুপ-ধুনোর ধোঁয়ার মধ্যে জোরকদমে পূজো চলেছে। দর্শনার্থীর আর ভক্তের ভিড়ে তখন জায়গাটা আরো সরগরম। সরু গলি রাস্তা। পয়সার আমদানি-রফতানির যত ভিড়, তার চেয়ে ভিড় পয়সা চাওয়ার লোকের। পৃথিবীর সমস্ত লোক যেন পয়সা চাইবার তাগিদে এখানে এসে জুটেছে। তাই এসে জুটেছে কারবারীরা, তাই জুটেছে বেকাররা, তাই জুটেছে পূজারীরা আর তাই এসে জুটেছে ভিখিরিরা। পৃথিবীর সমস্ত টাকা যেন এখানে এই বড়বাজারে এসে মুখ থুবড়ে পড়ে খাবি খাচ্ছে।
ঠাকুরের সামনের লাল কাপড়টার ওপর অনেক খুচরো পয়সার পাহাড়।
সদানন্দ সেখানে গিয়ে একজনকে বললে–আমার এই দশ টাকার নোটটা ভাঙিয়ে দাও তো ভাই–
লোকটা চেনে সদানন্দকে। সবাই রাজাবাবু বলে ডাকে তা জানে।
বললে–আবার ওদের পয়সা দেবেন রাজাবাবু? কেন দেন?
সদানন্দ বললে–আমরা না দিলে ওদের কে দেবে বলো, ওদেরও তো খাওয়া-পরার দরকার হয়–
–না, রাজাবাবু, ওই পয়সা নিয়ে ওরা আবার বাটায় খাটায়। সুদখোর সব ওরা। চুরি বাটপাড়ি করে, মদ খায়, গাঁজা ভাঙ খায়–
সদানন্দ বললে–তা খাক, তখন পয়সা চাইছিল আমার কাছে, আমি দিতে পারি নি, এখন দাও, দিয়ে যাই–
নোটের ভাঙানি নিয়ে বাইরে যেতেই সবাই ছেঁকে ধরেছে–একটা পয়সা দাও রাজাবাবু, দাও একটা পয়সা–
সেই লোকগুলো এতক্ষণ কোথায় ছিল কে জানে। টের পেয়েই একেবারে সদানন্দর ঘাড়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লো। চারদিক থেকে সঙ্গে সঙ্গে পয়সা পয়সা রব উঠলো। সবার মুখে ওই একটাই কথা। পয়সা আর পয়সা। সদানন্দর মনে হলো সেই কপিল পায়রাপোড়া, মানিক ঘোষ, ফটিক প্রামাণিক আর কালীগঞ্জের বউ যেন হাজার-হাজার মূর্তি ধরে তার সামনে হাত পেতে আছে–দাও দাও, আমাদের সব টাকা ফেরত দাও, যুগ যুগ ধরে তোমার পূর্বপুরুষেরা যে আমাদের ঠকিয়ে এসেছে তুমি তার প্রায়শ্চিত্ত করো আজ–
সদানন্দও বোধ হয় তাদের মনের কথাগুলো বুঝতে পারতো। সদানন্দও বলতো–তোমাদের কিছু বলতে হবে না, তোমাদের ওপর যে-পাপ করেছে আমার বাবা-ঠাকুর্দাদা, সেই সব পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে আমি আজ রাস্তায় নেমেছি, যতদিন প্রায়শ্চিত্ত না হবে ততদিন আমি এমনি করে তোমাদের পয়সা দিয়ে যাবো–নাও নাও, আমার কাছে যা আছে সব তোমরা নাও–
দশ টাকার নোটের ভাঙানি আর কতক্ষণ থাকে! এক মুহূর্তের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে গেল সব। পকেট ফাঁকা হয়ে গেল।
পেছন থেকে প্রকাশ মামার গলা শোনা গেল–কী রে, এখানে কী করছিস, কতক্ষণ তোর জন্যে বসে আছি আর তুই এখেনে…
