প্রকাশ মামা হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে–তোর চেহারা এরকম হলো কেন রে? কোনও অসুখ-টসুখ করেছিল নাকি?
সদানন্দ বললে—হ্যাঁ–
–তা শরীরের দিকে একটু নজর না দিলে শরীর তো খারাপ হবেই। শরীরের আর দোষ কী রে! কিন্তু কেন এত কষ্ট করছিস বল্ তো? কার ওপরে তোর রাগ?
সদানন্দ এ কথার কোন জবাব দিলে না।
–তোকে একটা কথা বলা হয় নি। তুই বোধ হয় শুনিসও নি। দিদি জামাইবাবু সবাই মারা গেছেন, তা জানিস তো? দিদি অবশ্য আগেই মারা গিয়েছিল–
সদানন্দ বললে–সে আমি মহেশের কাছে আগেই শুনেছিলুম–
–তুই মাইরি অদ্ভুত ছেলে। তোর মা’র মারা যাওয়ার খবর শুনলি অথচ একবার নবাবগঞ্জে গেলি না? জামাইবাবুর সঙ্গে একবার দেখা করলি না?
সদানন্দ বললে–গিয়েছিলুম তো। কিন্তু বাবার কাছে যে ব্যবহার পেয়েছি তারপর আর সেখানে থাকতে ইচ্ছে হয় নি।
–তা তোর বাপ খারাপ ব্যবহার করলো সেইটেই তোর মনে লাগলো? আর তোর বউ যে শ্বশুর-শাশুড়ীর সঙ্গে কী ব্যবহার করলে তা শুনেছিস? তখন আমি তোকে খুঁজতে কলকাতায় ঘুরে মরছি তাই নিজের চোখে দেখতে পাই নি। তুই শুনলে তোরও রাগ হতো তোর বউ-এর ওপর
সদানন্দ বললে–আমি জানি–
প্রকাশ মামা শুনে অবাক হয়ে গেল। বললে–সে কী রে, তুই জানিস সব? কী করে জানলি? কে বললে?
–দিদিমা!
–দিদিমা? তোর আবার দিদিমা কে?
–বেহারি পাল মশাই-এর স্ত্রী। তাদের বাড়িতেই তো সে-রাত্রে ছিলুম।
প্রকাশ বললে–আসলে তোর বউটারই দোষ, বুঝলি? আমি রূপ দেখে তোর সঙ্গে বিয়ে দেওয়ালুম, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে মেয়েটা এত নচ্ছার তা কে জানতো! জানিস, তোর বউটা আবার ওদিকে একটা কাণ্ড করে বসেছে! আমি এখানে আসবার আগে তোর শ্বশুরবাড়ি কেষ্টনগরে গিয়ে সব শুনে অবাক! তোর বউ আবার একটা বিয়ে করেছে রে– শুনলুম এখন বরের সঙ্গে নাকি নৈহাটিতে বাসা করে আছে–
সদানন্দ এ কথার কোনও জবাব দিলে না।
প্রকাশ মামা বললে–তুই কিছু বলছিস না যে?
–কী আর বলবো!
প্রকাশ মামা বললে–তা তো বটে, তুই-ই বা কী বলবি! তোর বউ যদি বিয়ে করে তো তাতে তোরই বা বলবার কী আছে! যাকগে, তুই কিছু মন খারাপ করিস নি। বুঝলি, তুইও একটা বিয়ে করে ফ্যাল, তোর ভাবনা কী! আমি তখনই জানি মেয়েদের অত রূপ ভালো নয়; রূপসী মেয়েদের জীবন কখনও সুখের হয় না, এ আমি বরাবর দেখে এসেছি!
তারপর যেন হঠাৎ খেয়াল হলো। বললে–কই রে, আর কতদূর? আর কতদূর তোর ধর্মশালা?
সদানন্দ বললে–এই কাছেই—
প্রকাশ মামা বললে–উঃ, মাসির হাত থেকে যে ছাড়া পেয়েছি এই আমার রক্ষে–
–কেন?
–আরে, যেই শুনেছে তোর টাকা পাওয়ার কথা আর ওমনি আমাকে খাতির করতে আরম্ভ করেছে!
সদানন্দ বুঝতে পারলে না কথাটা। বললে–টাকা? আমার টাকা পাওয়ার কথা? আমার কীসের টাকা?
–হ্যাঁ, সেই কথা বলতেই তো তোর কাছে আসা রে! জামাইবাবু মারা যাওয়ার পর তো তোর জন্যে আট লাখ টাকা রেখে গেছে। সে-সব টাকা তো তোর রে! তুই-ই তো জামাইবাবুর একমাত্র সন্তান, তুই পাবি না তো কে পাবে? তুই না থাকলে সে টাকা পেত তোর বউ। কিন্তু তোর বউ তো আবার বিয়ে করে ফেলেছে। সুতরাং ভালোই হয়েছে। তুই এখন সে টাকার একমাত্র মালিক, আমি ব্যাঙ্কে গিয়ে সব কথা শুনে উকিলের সঙ্গে পরামর্শ করেছি। উকিলের কথামত তোর কাছে এসেছি, এখন তুই যা ইচ্ছে তাই কর–
সদানন্দ বললে–বাবার টাকা আমি নেব না–
প্রকাশ মামা বললে–কেন রে? বাবা না-হয় তোর দোষ করেছে, কিন্তু তোর বাবার টাকা কী দোষ করলে?
সদানন্দ বললে–না, ও টাকাও আমি নেব না–
–তা, কেন নিবি নে তা বলবি তো? ও তো তোর হক্কের টাকা! তুই না নিলে গভর্মেন্ট নিয়ে নেবে। মিছিমিছি গভর্মেন্টকে ও-টাকা দিয়ে তোর লাভ কী? গভর্মেন্ট তো চোর। চোরকে খাইয়ে তোর কী উপকারটা হবে শুনি? আর যদি তুই নিজে না নিতে চাস তো আমাকে দিয়ে দে। আমি ছাপোষা মানুষ। আমার ছেলেমেয়ে নাবালক, এই বয়েসে দুটো টাকা হলে আমি তবু একটু আরাম করে খাই-দাই! আরাম করে যে কটাদিন বাঁচি ঘুমোই, এখন আমার খেয়ে-দেয়ে-ঘুমিয়ে সুখ নেই, টাকা পেলে বুড়ো বয়েসে তাহলে আর আমাকে ভাবতে হয় না–জানিস, সংসারে টাকাই হলো আসল রে, টাকাই হলো বুকের বল–
ততক্ষণ ধর্মশালার কাছে এসে গিয়েছিল।
পাঁড়েজী খবর পেয়েই ছুটে এসেছে। সদানন্দকে দেখে হইচই বাধিয়ে দিলে। কতদিন আগে বাবুজী চলে গিয়েছিল, একটা খবর পর্যন্ত পায়নি সে। সবাই সদানন্দর খোঁজ নিয়েছে। কত লোক যে বাবুজীকে খোঁজ করতে এসেছিল তার ঠিক নেই।
–এ কী চেহারা হয়েছে আপনার বাবুজী?
সদানন্দ সে কথার উত্তর না দিয়ে বললে–পাঁড়েজী, তোমার কাছে কিছু টাকা আছে?
–টাকা? টাকা কী করবেন? কত টাকা?
সদানন্দ বললে–দু’চার-পাঁচ-দশ যা থাকে দাও না—
পাঁড়েজী বললে–আবার বুঝি কেউ চেয়েছে?
প্রকাশ মামা এতক্ষণ কথাগুলো শুনছিল। বললে–টাকা তো আমার কাছে আছে। কত টাকা তোর দরকার? আমাকে বল না–
সদানন্দ বললে–তুমি দিতে পারবে? তাহলে দাও? ওই ছেলেমেয়েগুলো অত করে চাইছিল, দিতে পারিনি–মনটা কেমন করছে–আমি তোমার টাকা আবার তোমাকে দিয়ে দেব–
যে-মানুষটা আট লাখ টাকার মালিক হতে যাচ্ছে তাকে টাকা দিতে প্রকাশ রায়ের কোনও ভয় নেই। তা ছাড়া একটু পরে সদানন্দর কাছেই তো তাকে হাত পাততে হবে। সুতরাং সদানন্দকে টাকা দিতে তার আপত্তি নেই। পকেট থেকে কটা টাকা সদানন্দর দিকে এগিয়ে দিতেই সে সেগুলো নিয়ে বেরোল–
