লোকটা বোধ হয় পয়সা দিচ্ছে না। বলছে–আমার কাছে পয়সা নেই এখন–-পয়সা নেই আমার কাছে—
তবু কেউ শুনছে না তার কথা। তারা একনাগাড়ে একই কথা বলে যাচ্ছে–রাজাবাবু, আমাকে একটা পয়সা–
বিচিত্র জায়গা এই বড়বাজার। দুশো বছর আগে এই বড়বাজার থেকেই প্রথম পয়সার আমদানি-রফতানি শুরু। পয়সা দিয়েই বড়বাজারের পত্তন আর পয়সা দিয়েই এই বড়বাজারের পরিসমাপ্তি। যেদিন পৃথিবীতে পয়সার খেলা থাকবে না, সেদিন বড়বাজারও ধ্বংস হবে। সেদিন আর সবই থাকবে, শুধু বড়বাজারই থাকবে না। এই বড়বাজারে এলেই দেখা যাবে পয়সা কাকে বলে, পয়সার চাহিদা কত। এই বড়বাজারে এলেই বোঝা যায় যে পৃথিবীতে সব কিছু মিথ্যে, একমাত্র সত্যি হচ্ছে পয়সা। পয়সার দৌলতেই বড়বাজার আর বড়বাজারের দৌলতেই পয়সা। শুধু যে বড়লোকদেরই ভিড় এখানে তা নয়, ভিখিরিদেরও ভিড়। এখানে পয়সা আছে বলে যারা পয়সাওয়ালা লোক তারা যেমন এখানে আসে, যাদের পয়সা নেই তারাও এখানে আসে।
প্রকাশ রায়ের বড় ভালো লাগলো দৃশ্যটা দেখতে। কই তাকে তো কেউ পয়সার জন্যে ঘিরে ধরছে না। ওই লোকটাকেই বা ধরছে কেন। লোকটার পয়সা আছে এটা বোধ হয় সবাই জানে। পয়সাওয়ালা লোক বোধ হয়।
পয়সাওয়ালা লোকদের দেখতে প্রকাশ রায়ের বড় ভালো লাগে। পয়সাওয়ালা লোকদের কাছাকাছি থাকতেও তার বড় আনন্দ হয়।
প্রকাশ ভিড় ঠেলে লোকটার চেহারা দেখে অবাক হয়ে গেল। সদানন্দ না! ঠিক সদানন্দের মতন। কিন্তু যেন খুব রোগা হয়ে গেছে।
তখনও ভিখিরিদের ছেলে-মেয়ে বুড়োবুড়ি সবাই চিৎকার করছে রাজাবাবু, একটা পয়সা দাও–
সদানন্দর মুখটা গম্ভীর-গম্ভীর। সে হাত নেড়ে নেড়ে সকলকে বলছে–আজ আমার কাছে একটাও পয়সা নেই বাবা, তোমরা আজকে আমাকে ছেড়ে দাও, পরে তোমাদের পয়সা দেব আমি, পরে দেব
সদানন্দও পয়সা দেবে না, তারাও ছাড়বে না। সে এক তুমুল টানাটানি কাণ্ড!
–এই সদা, সদা—
গোলমালের চোটে সদানন্দর কানে সে-শব্দ পৌঁছুলো না। সে তখনও ভিখিরিদের হাত থেকে ছাড়ান পাবার চেষ্টায় ছটফট করছে। সকলকে লক্ষ্য করে বার বার বলছে–আমাকে তোমরা এখন ছাড়ো ভাই, আমি এখন ফতুর, পরে দেব
প্রকাশ রায় আরো ভিড় ঠেলে একেবারে সদানন্দর গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে–এই সদা, কোথায় যাচ্ছিস?
এতক্ষণে যেন সদানন্দর কানে গেল কথাটা। মুখ ফিরিয়ে প্রকাশ মামাকে দেখে চিনতে পারলে। বললে–প্রকাশ মামা? তুমি?
প্রকাশ মামা বললে–তুই এখানে? আর আমি যে এতকাল ধরে চারিদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি তোকে। তুই ধর্মশালায় কোথায় থাকিস আমাকে মহেশ বলে দিলে–
–মহেশ? তাকে তুমি চিনলে কী করে?
–সেখান থেকেই তো আসছি। তোকে খুঁজতে আমি সেই কালীঘাটে মানদা মাসির বস্তিতে গিয়েছিলুম। সে এক কাপ্তেন পাকড়েছে। পাকড়ে এখন পুলিসের বড়বাবুর সব্বোনাশ করবার মতলব করেছে, জানিস। মাগীর তো বরাবর টাকার খাঁই, তা তো তুই জানিস?
সদানন্দ বললে–আমি সে-সব কিছুই জানি না–
প্রকাশ মামা বললে–সে কি রে, তুই জানিস না মানে? মাসি যে বললে–তুই তাকে চিনিস। তোকেও মাসি নাকি ভাল করে চেনে।
সদানন্দ বললে–সে ভুল করেছে–
–ভুল করেছে কী রে! মাসি কি ভুল করবার মানুষ যে ভুল করবে? মাসি যে বললে সে নাকি তোর চরণ-পূজো করেছিল?
চরণ-পূজো! এতক্ষণে মনে পড়লো। সেই কালীঘাটের রাস্তায় তাকে ধরে চরণ-পূজো করার ঘটনা।
প্রকাশ মামা আবার বললে–আমি তো কিছুই বুঝতে পারলুম না মাসির কথা। মাসিটা একেবারে মিথ্যে কথার জাহাজ। সত্যিই তো, মাসি তোর চরণ-পূজো করতে যাবেই বা কেন, আর তুই-ই বা মাসিকে তোর চরণ-পূজো করতে দিবি কেন? সত্যিই তো!
সদানন্দ বললে–না মামা, মাসী আমার চরণ-পূজো করেছে–
–সে কী রে? মাসি তোর চরণ-পূজো করেছে? এত লোক থাকতে তোর চরণ-পূজো করলে কেন? কী মতলোবে?
সদানন্দ বললে–স্বপ্ন দেখেছিল–
–স্বপ্ন দেখেছিল মানে?
–স্বপ্ন দেখেছিল সে ঘুম থেকে উঠে যে ব্রাহ্মণকে প্রথম দেখতে পাবে তার চরণ পূজো করলে তার কোমরের বাত সেরে যাবে!
প্রকাশ মামা হো-হো করে হেসে উঠলো। বললে–মাগী তো কম মতলববাজ নয়। তারপর? তারপর কী হলো?
–তারপর আর কী হবে! সেই বড়বাবু এসে পড়াতে সব ভেস্তে গেল!
–বড়বাবু? পুলিশের বড়বাবু? তারই মেয়েমানুষের বাড়িতে তুই গিয়েছিলি?
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ–
–আরে তা সেই বড়বাবুকেই তো মাসি এখন পাকড়েছে। বাপ মারা যাবার পর বড়বাবু নিজের মেয়েমানুষকেও যে সেখানে নিয়ে গেছে। আমি যে গিয়ে সব দেখে এসেছি রে। এখন মাসির মুসকিল হয়েছে, তার অনেক টাকা চাই। আমার কাছে সেই টাকার গন্ধ পেয়ে একেবারে চেপে ধরেছিল, আমি জানতে পেরে পালিয়ে এসেছি। কিন্তু মহেশ তার আগেই তোর ঠিকানাটা আমাকে বলে দিয়েছে। তা কোথায় আছিস তুই? কোন ধর্মশালায়? ভালোই হলো তোর সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়ে গেল
আজও মনে আছে সদানন্দর সেই সব দিনের কথাগুলো, সেই প্রকাশ মামার সঙ্গে রাস্তায় হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া আর তারপর আবার সেই ধর্মশালায় গিয়ে ওঠা। মানুষের জীবন সত্যিই বিচিত্র। কী ভাবে সে জীবন কাটাতে চেয়েছিল আর কী ভাবে শেষ পর্যন্ত তার জীবনটা কাটলো। আর প্রকাশ মামাই বা কী ভাবে টাকার জন্যে খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছিল।
