ভীম বিশ্বাস বলতো-হোক সব্বোনাশ, যে সব্বোনাশের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি তার চেয়ে আর কত বেশি সব্বোনাশ হবে তাই দেখতে চাই আমরা
প্রকাশ রায় বলতো–আরে, আমিও তো বউকে তাই বললুম। বললুম এত ঝঞ্ঝাট আর সইতে পারছি নে–টাকাগুলো সক্কলকে বিলিয়ে দিই–
–তা বউমা কী বললেন শুনে?
প্রকাশ রায় বলতো–বউ বললে–তুমি জেনে-শুনে ভালোমানুষদের এই সব্বোনাশ করবে? আমরা নিজে যা ভুগছি তা ভুগছি, পরকে কেন আবার ভোগানো মিছিমিছি! জামাইবাবুর অবস্থা তো আমি নিজের চোখে দেখেছি কি না। এত টাকা হাতে আসার পর থেকেই জামাইবাবু যেন কেমন হয়ে গেল। তখন থেকে কেমন মুখের হাসি মিলিয়ে গেল, পেটের ক্ষিধে চলে গেল, চোখের ঘুম উবে গেল। যে-মানুষ আমাকে ডেকে ডেকে কথা বলতো, সেই মানুষই শেষকালে আবার আমাকে দেখলেই খেঁকিয়ে উঠতো–
–কেন রায় মশাই, ওরকম কেন হতো?
অশ্বিনী ভট্টাচার্য বলতো–তা হোক রায় মশাই, আগে তো টাকা হোক আমাদের তার পরে যা-হয় হবে। একবার টাকা হলে তখন আমরা চোখ কান-নাক বুঁজে না-হয় সব ঝঞ্ঝাট সহ্য করবো। আপনি কিছু কিছু দিন আমাদের। টাকা হাতে পেলে আমার নিজের মেয়েটার বিয়ে দিতে পারি তাহলে
ভীম বিশ্বাস বললে–আমিও তাহলে এক জোড়া বলদ কিনি, গেল মাসে আমার দুটো বলদই চুরি হয়ে গেল–
আশু চক্কোত্তি বললো, আমিও তাহলে বাস্তুভিটের খড়ের চালটার ওপর টিন দিয়ে ফেলি–
প্রকাশ রায় বলতো–তা টাকা না হয় তোমাদের আমি মাথা পিছু দু’দশ হাজার করে দিয়ে দিলাম, কিন্তু শেষকালে যেন আবার আমাকে তোমরা দুষো না, তা বলে রাখছি–
–আজ্ঞে তা কেন দুষবো? আমাদের কপালে যা আছে তা তো আর কেউ খণ্ডাতে পারবে না
প্রকাশ রায় বলতো–ঠিক আছে, তাহলে তাই-ই দেব। তাহলে অশ্বিনী, তুমি কত নেবে?
অশ্বিনী বলতো–আজ্ঞে, আমাকে যদি হাজার দশেক দেন তো খুব উবকার হয় আমার
প্রকাশ রায় বলতো–ঠিক আছে, তোমাকে দশ হাজারই দেব—
তারপর ভীম বিশ্বাসের দিকে ফিরে বলতো তুমি? তোমার কত চাই?
ভীম বিশ্বাস বলতো–আজ্ঞে আমাকে আপনি যা দেবেন তা-ই নেব। আমার কাছে এক টাকাও যা, এক হাজার টাকাও তাই–
প্রকাশ বলতো–ঠিক আছে, তোমাকেও দশ হাজার দেব। যত হাল্কা হতে পারি ততই তো আমার ভালো রে বাবা
অশ্বিনী জিজ্ঞেস করতো–কবে দেবেন?
প্রকাশ বলতো–আরে, টাকা তো আমি এখনই দিয়ে দিতে পারি। কিন্তু আমার ভাগ্নে? সে আসুক আগে। সে না এলে তো আমি এ টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারা করতে পারছিনে–
–তা যদি আপনার ভাগ্নে না আসে?
–না আসে মানে? যেমন করে হোক তাকে এখানে ধরে আনতেই হবে। সে না এলে তাকে ছাড়বো কেন? সে না এলে গভর্মেন্ট যে সব টাকা বাজেয়াপ্ত করে নেবে–তাকে এখেনে পাকড়ে এনে তার হাতে টাকাটা তুলে দিয়ে তবে আমি খালাস পাবো, তার আগে নয়–
কথাটা শুনে আশেপাশের সকলের মুখ শুকিয়ে যেত। তবে আর টাকা পেয়েছে তারা! চৌধুরী মশাই-এর ছেলে এখানে এলে সব বানচাল হয়ে যাবে। আশ্চর্য! এতগুলো টাকা কিনা পরের হাতে চলে যাবে? তখন কি আর তাদের কেউ চিনতে পারবে?
যখন আসর ছেড়ে সবাই উঠতো তখন সকলের মুখ গম্ভীর হয়ে যেত। তাহলে আর অশ্বিনী ভট্টাচার্যির মেয়ের বিয়ে হয়েছে, তাহলে আর ভীম বিশ্বাস একজোড়া বলদ কিনেছে, তাহলে আর আশু চক্কোত্তির বাড়ির খড়ের চালের ওপর টিন উঠেছে! ভগবানের মনে কী আছে তা ভগবানই জানে।
প্রকাশ রায় তখনও রাস্তার ঠাকুরটার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একমনে তাকে তার মনের বাসনাগুলো মনে মনে জানাচ্ছে। বলছে-মা, তোমার কাছে গলা ছেড়ে কিছু বলতে পারছি না, আশে-পাশে সব লোকজন রয়েছে। হাটের মধ্যে কি মনের কথা গলা ছেড়ে বলা যায়? তুমিই বলো মা? তুমিই বলো মা! কিন্তু লোকে তো বলে তুমি অন্তর্যামী, মনের কথা তোমাকে বলা বৃথা। তুমি তো সবই জানো মা, তুমি তো সবই বুঝতে পারো
হঠাৎ পাশে একটা ষাঁড় এসে দাঁড়াতেই প্রকাশ চমকে উঠেছে। চমকে উঠে আবার পাশে সরে দাঁড়ালো। আর একটু হলেই তাকে গুতিয়ে থেঁতো করে দিত। বললে–দূর, দূর, বেরো বেরো–
সবাই মিলে তাড়া দিতেই শিবের জীবটা সরে চলে গেল। আবার প্রকাশ হাত-জোড় করে মনঃসংযোগ করবার চেষ্টা করলে। বলতে লাগলো–এই দেখ, ঠাকুর, ভালো কাজে কত বাধা, দেখলে তো? একটু আগে একটা মটর-গাড়ি এসে চাপা দিচ্ছিল, এখন আবার এসেছে একটা ষাঁড়। তোমাকে যে একটু মন দিয়ে ডাকবো তারও উপায় নেই। তা যাকগে বাজে কথা। কাজের কথাটা আগে ভাগে সেরে ফেলি। অনেক আশা করে এবার সদার খোঁজ পেয়েছি ঠাকুর? সেই কালীঘাটের মানদা মাসির বস্তি থেকে শুরু করে বউবাজারের বড়বাবুর বাড়ি পর্যন্ত গিয়েছি। আবার এখন যাচ্ছি পাথুরেপটির মারোয়াড়ীদের ধর্মশালায়। সেখানে গিয়ে যেন সদার দেখা পাই। দেখো ঠাকুর, সদার যেন সুমতি হয়, সদা যেন টাকাটা আমাকে দিয়ে দেয়। সদার বাপের ওই আট লাখ টাকাটা পেলে আমার বড় উপকার হয় ঠাকুর…আমার বহুদিনের শখ আমি কলকাতায় একটা বাড়ি করবো, আর খাঁটি বিলিত হুইস্কি খাবো, দিশী মাল খেয়ে আমার জিভে একেবারে মরচে পড়ে গেছে।
–রাজাবাবু, রাজাবাবু…
একটা ভিড়ের গোলমাল কানে আসতেই প্রকাশ রায় আবার একপাশে সরে দাঁড়ালো। প্রায় পঞ্চাশ-ষাটজন ভিখিরি একজন লোককে ঘিরে ধরেছে। কাকে ঘিরে ধরেছে তা দেখা যায় না। কিন্তু সবাই মিলে গোল হয়ে তাকে ঘিরে ধরেছে আর চেঁচাচ্ছে রাজাবাবু, ও রাজাবাবু, ও রাজাবাবু, একটা পয়সা দাও
