হঠাৎ পেছনে একটা মোটর-গাড়ির ভোঁ বেজে উঠলো। প্রকাশ রায় সঙ্গে সঙ্গে পাশে সরে এসেছে। কী বে-আক্কেলে সব লোক রে বাবা। গাড়ি চাপা দেবে নাকি। দেখছে ভগবানকে নমস্কার করছি, ঠিক সেই সময় পেছনে ভোঁ ভোঁ করছে! এ কোন্ যুগ এল রে বাবা যে ভগবানকে পর্যন্ত মানতে চায় না কেউ!
গাড়িটা চলে যেতেই প্রকাশ রায় আবার মনঃযোগ করবার চেষ্টা করলে। একটু যে মন দিয়ে ভগবানকে ডাকবো তারও উপায় নেই বড়বাজারে। বেছে বেছে সদা কি না এই হতচ্ছাড়া জায়গায় এসে উঠেছে।
প্রকাশ আবার ঠাকুরকে লক্ষ্য করে আট লাখ টাকার হিসেব দিতে লাগলো। সমস্ত টাকাটার সবটার হিসেব দিতে লাগলো–আট লাখ টাকার সবটা আমার চাই নে ঠাকুর, অত লোভ আমাকে দেখিও না তুমি! লোভ বড় খারাপ জিনিস ঠাকুর, কথায় আছে লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। আমার চার লাখ পেলেই কোনও রকমে চলে যাবে ঠাকুর। এক লাখ দিয়ে প্রথমে একটা বাড়ি করবো কলকাতায়, আর বাকি তিন লাখ টাকা ব্যাঙ্কে ফিক্সড ডিপোজিট রেখে দেব। তাতে আমার হাতে আসবে মাসে তিন হাজার টাকাতেই কোনও রকমে চালিয়ে নেব আমি ঠাকুর। বাকি চার লাখ টাকা সদা নিক। টাকা তিন হাজার আসলে তারই বাপের টাকা, আমি তো ফাউ ঠাকুর। আর সদার বউ? সে মাগীর কপালই খারাপ, মিছিমিছি বিয়ে করতে গেল। যদি আজ সে বিয়ে না করতে তো তার কপালেই এই টাকাটা ছিল। তা বিয়ে করেছে সে ভালো করেছে, আমারই ভালো হয়েছে! তুমি শুধু দেখো ঠাকুর, যেন আদ্দেক টাকাটা আমার হাতে আসে–
আট লাখের অর্ধেক হলো চার লাখ। প্রকাশ রায় আবার হিসেব করতে লাগল। অনেকবার হিসেব করেছে সে। যেদিন থেকে ভগ্নীপতি মারা গেছে সেই দিন থেকেই প্রকাশ হিসেব করে চলেছে।
বউ বলতো–অত হিসেব করছো কেন বার বার? তোমায় টাকা দেবে না কলা, ছাই দেবে–
প্রকাশ বলতো–তুমি চুপ করো তো! তুমি মেয়েমানুষ, মেয়েমানুষের মত থাকবে, সব কথায় তুমি কথা বলতে আসো কেন?
বউ বলতো–সারা জীবন তো তুমি কেবল টাকা-টাকা করে সকলের গায়ে তেল মাখিয়ে এসেছ, ক’টা টাকার মুখ দেখেছ তুমি শুনি?
প্রকাশ বলতো–এবার দেখ কী হয়! এবার শুধু বসে বসে দেখ, কেবল বসে বসে দেখে যাও। যদি কলকাতায় পেল্লায় বাড়ি না করি তো তুমি আমায় কুকুর বলে ডেকো–
–তা তোমার ভাগ্নে কি তোমায় টাকা দেবে ভেবেছ?
–দেবে না তো কী করবে সে এত টাকা? আমার ভাগ্নেকে আমি চিনি না, তুমি আমাকে চিনিয়ে দেবে? টাকা তার হাতের ময়লা তা জানো?
বউ বলতো–ওই টাকাই তোমাকে একদিন পথে বসাবে! এতদিন তোমার সঙ্গে ঘর করছি, তোমাকে আমি চিনি নে বলতে চাও?
প্রকাশ রেগেমেগে আর কোনও কথা বলতো না। কেবল শেষকালে বলতো মেয়েমানুষের সঙ্গে কথা বলাই ঝকমারি, ওই জন্যেই তো মেয়েমানুষের সঙ্গে আমি জীবনে কথা বলি না–
কথা বলি না বলতো বটে, কিন্তু এক মিনিট পরেই আবার কথাও বলতো। বলতো–তুমি কেবল আমার ওপর রাগই করতে পারো, কিন্তু টাকা আমি কার জন্যে চাইছি, আমার জন্যে টাকা চাইতে বয়ে গেছে। টাকা তো তোমাদের জন্যেই চাইছি, তাহলে টাকার ওপর যদি তোমার এতই বিরাগ তো আমার কাছে আর টাকা-টাকা কোর না এবার থেকে—
বউও রেগে যেত। বলতো–তা তোমার কাছে টাকা চাইবো না তো টাকা চাইবো কার কাছে শুনি? টাকা আমি রোজগার করতে বেরোব বলতে চাও? যদি রোজগার করতে বলো, তো এই বুড়ো বয়েসে তা-ও করতে পারি–
প্রকাশ রায় তখন খেতে বসেছিল। বউএর কথায় আর খেতে পারলে না। রাগে সেই ভাতের থালায় এক লাথি মেরে উঠে পড়লো। সমস্ত মেঝেময় তখন ভাত-ডাল-চচ্চড়ি একেবারে ছত্রখান। তারই ওপর ওপর পা দিয়ে মাড়িয়ে একেবারে কুয়োতলায় গিয়ে পা হাত-মুখ ধুয়ে নিয়ে বৈঠকখানা ঘরের দিকে চলে যেত। বলতো–দুত্তোর টাকার নিকুচি করেছে–
বৈঠকখানা ঘরে তখন মোসায়েবের দল রায় মশাই-এর জন্যে হাঁ করে বসে থাকতো। রায় মশাই সেখানে গিয়ে বসতো। পিসেমশাই এর হুঁকোতে তখন তামাক সাজাই থাকতো। সেই হুঁকো তখন সে ভুড়ুক-ভুড়ুক করে টানতো।
অশ্বিনী ভট্টাচার্যি জিজ্ঞেস করতো–সেবা হলো রায় মশাই?
প্রকাশ বলতো–হলো।
তারপর একটু থেমে ধোঁয়া ছেড়ে বলতো–সেবা হলে কী হবে, আমার মনে তো শান্তি নেই হে–
সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতো, বলতো–কেন, মনে শান্তি নেই কেন রায় মশাই?
প্রকাশ রায় বলতো–ওই যে টাকা! টাকা যে কী সব্বোনেশে জিনিস তোমরা কী করে জানবে? টাকা হোক তোমাদের, তখন বুঝবে টাকা কী সব্বোনেশে জিনিস! উঃ, জামাইবাবু আমার যে কী সব্বোনাশটাই করে গেল–
–কেন? চৌধুরী মশাই-এর কথা বলছেন? চৌধুরী মশাই আবার আপনার কী সব্বোনাশ করে গেলেন?
–সব্বোনাশ করে গেলেন না? এই লাখ-লাখ টাকা কি আমার ধাতে সয় হে? এই একটু আগে বউএর সঙ্গে এই নিয়ে ঝগড়া হচ্ছিল। আগে আমার টাকা ছিল না বেশ ছিলুম, খাচ্ছিলুম দাচ্ছিলুম পেট ভরে ঘুমোচ্ছিলুম, টাকা আসার পর থেকে আর ঘুম আসে না হে, বিছানার ওপর সারা রাত কেবল এপাশ-ওপাশ করি। তাই বউ বলছিল, এ কী আমাদের সব্বোনাশ হলো! তার চেয়ে টাকাগুলো তুমি নিও না, গাঁয়ের দশজনকে বিলিয়ে দাও–
–বউমা বলছিলেন নাকি? তা দিন না রায় মশাই। আমাদের একটু টাকা বিলিয়ে দিন না, আমরা একটু টাকার মুখ দেখি–
প্রকাশ রায় বলতো–খবরদার খবরদার, টাকার নাম মুখে এনো না, সব্বোনাশ হয়ে যাবে তোমাদের–
