–ওগো তুমি চলে যেও না, তুমি থাকো। যে যাই বলুক আমি তোমার কোনও কষ্ট কোনও অপমান হতে দেব না, তুমি থাকো, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, তুমি থাকো–
সদানন্দ বললে–আর এখানে থাকা যে আমার চলে না নয়নতারা, আমাকে যে চলে যেতেই হবে–
–কেন? তোমাকে চলে যেতে হবে কেন? আমি তো আছি, আমি যখন থাকতে বলছি তখন তোমার থাকতে আপত্তি কী?
সদানন্দ গলা চড়িয়ে বলে উঠলো—না–না–সে কিছুতেই হয় না–
বলে চলে যেতেই সদর দরজাটা তার মুখের ওপর শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দূরের স্টেশন থেকে একটা ট্রেনের হুইলের শব্দে মনে হলো যেন নিখিলেশ তাকে ডাকছে–ওগো, কী হলো, কী হলো তোমার? স্বপ্ন দেখলে নাকি?
নয়নতারা যেন এতক্ষণে বাস্তবে ফিরে এল। তারপর বিছানা থেকে উঠলো। নিখিলেশ বললে–কী হলো? যাচ্ছো কোথায়?
নয়নতারা বললে–ও-ঘরে গিয়ে একবার দেখে আসি ও কেমন আছে–ঘুমের ওষুধটা ওকে খাওয়াতে ভুলে গিয়েছিলুম–
নিখিলেশ বললে–তুমি কি পাগল হয়ে গেলে নাকি, ভোরবেলা গেলেই তো হতো–
নয়নতারা সেকথার উত্তর না দিয়ে দরজার খিল খুলে বাইরে চলে গেল, নিখিলেশও বিছানা থেকে উঠে পেছন পেছন চললো।
কিন্তু পাশের ঘরে গিয়ে যা-দেখলে তাতে নয়নতারার আর বিস্ময়ের শেষ রইল না। কোথায় গেল মানুষটা! বিছানা যেমন ছিল তেমনি পড়ে আছে। ঘরের অন্য জিনিসগুলোও যেখানে থাকবার সেখানে রয়েছে শুধু সদানন্দই নেই। একবার কী যেন সন্দেহ হলো নয়নতারার। ঘরের বাইরে গিয়ে উঠোনের দরজাটাও লক্ষ্য করলে। দরজার খিল খোলা। তবে কি মানুষটা চলে গেল? এই অন্ধকারে এত রাত্রে অসুখ শরীর নিয়ে কোথা গেল সে!
হঠাৎ নিখিলেশের দিকে চেয়ে নয়নতারা বললে–এ নিশ্চয় তোমার কাজ—
নিখিলেশ বললে–আমার কী কাজ?
–তুমি নিশ্চয় তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছ। তুমি সব পারো।
নিখিলেশ বললে–আমি সদানন্দবাবুকে তাড়িয়ে দেবো কেন?
নয়নতারা বললে–তুমি ছাড়া আর কে তাড়াবে তাকে? তুমিই তো তাকে খুন করবার মতলব করেছিলে। আমি তোমাকে খুব চিনে গেছি।
–কিন্তু গিরিবালাও তো কিছু জানতে পারে। তাকে একবার জিজ্ঞেস করো না–
–সে তোমার মত অত নীচ নয়, সে বুড়ো মানুষ সারাদিন খেটে-খুটে ঘুমোচ্ছ, সে কিছু জানলে আমাকে নিশ্চয়ই বলতো, এ তুমি ছাড়া আর কেউ নয়, এ তোমারই কাজ–
নিখিলেশ বললে–বিশ্বাস করো সত্যি বলছি আমি আর কিছু জানি না–
–তাহলে সে কোথায় গেল তাই বলো? তুমি কী বলতে চাও সে নিজের থেকে চলে গেছে? এত রাত্তিরে কেউ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়? তাকে তো হঠাৎ ভুতে ধরে নি। এ নিশ্চয়ই তোমার কাজ—নিশ্চয়ই–নিশ্চয়ই–
নিখিলেশ বলতে গেল–তুমি মিছিমিছি আমার ওপর রাগ করছো নয়ন–শোন–
–না, তোমার কথা আমি শুনতে চাই না, তোমার মুখও আমি দেখতে চাই না–তুমি যাও, আমার সামনে থেকে তুমি বেরোও।
বলে নিখিলেশের মুখের ওপর নয়নতারা ঘরের দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করে দিলে। তারপর সদানন্দর খালি বিছানাটার ওপর উপুড় হয়ে পড়ে বালিশে মুখ গুঁজে হাউ-হাউ করে কাঁদতে লাগলো।
নিখিলেশ বাইরে থেকে ডাকতে লাগলো-নয়ন, দরজা খোল, দরজা খোল—
৩.৭ সদানন্দর সন্ধান
পাথুরেপট্টি খুঁজতে প্রকাশ রায়ের বেশি দেরি হলো না। বহু বছর ধরে কলকাতায় যাতায়াত করে করে কলকাতার অলি-গলি প্রকাশ রায়ের মুখস্থ হয়ে গিয়েছে। তখন বয়েস কম ছিল তার। দিদির পয়সায় প্রকাশ রায় কলকাতায় এসেছে, তারপর হাতের টাকা যখন ফুরিয়ে গিয়েছে তখন আবার খালি হাতে নবাবগঞ্জে ফিরে গিয়েছে। এসব অনেক দিন আগেকার ঘটনা। তারপর একদিন দিদি মারা গিয়েছে, নবাবগঞ্জের আর সুলতানপুরের জমি-জমাও বিক্রি হয়ে গিয়েছে। বলতে গেলে ভগ্নীপতি মারা যাওয়ার পর থেকে প্রকাশ রায়ের আশা ভরসাও চলে গিয়েছে। এখন ভরসা একমাত্র সদানন্দ।
তা সদানন্দর সন্ধান যে এমনভাবে পাওয়া যাবে তা আগে ভাবতে পারে নি প্রকাশ। অথচ আগে কত খুঁজে বেড়িয়েছে সদানন্দকে। কোথায় কালীঘাট, কোথায় শেয়ালদ’ , কোথায়, বড়বাজার। যে-মানুষটা বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছে, সে তো কলকাতার বাইরেও চলে যেতে পারে। কলকাতার বাইরে চলে গেলে অবশ্য তাকে আর খুঁজে পাওয়া যেত না।
মাসি জলখাবারের বন্দোবস্ত করেছিল প্রকাশের জন্যে। যেই শুনেছে সদানন্দ আট লক্ষ টাকার সম্পত্তি পাবে আমনি আপ্যায়নের বহর বাড়িয়ে দিয়েছিল। বাবা, টাকা এমনই জিনিস রে! তোমার টাকা আছে সেই কথাটা শুনেই লোকে তোমায় খাতির করতে শুরু করবে! নইলে সুলতানপুর-সুদ্ধ লোক রাতারাতি তাকে এমন করে খাতির করছেই বা কেন?
বড়বাজারের কাছটায় এসে পড়তেই যেন ভিড়ে প্রকাশ রায়ের দম আটকে আসার অবস্থা হয়ে এল। প্রকাশ রায়ের মনে হলো বড়বাজারের ভিড় যেন আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।
একটা অশ্বত্থ গাছের তলায় একটা আগাগোড়া সিঁদুর মাখানো মূর্তিকে ঘিরে তখন বেশ ধুপ-ধুনো দিয়ে কাঁসরঘণ্টা বাজিয়ে ঘটা করে পূজো হচ্ছে। কী ঠাকুর কে জানে! তবু প্রকাশ রায় সেখানে দাঁড়িয়েই ঠাকুরটার উদ্দেশ্যে দু’হাত জোড় করে প্রণাম করলে। প্রণাম করতে তো আর পয়সা খরচ হয় না। আর ঠাকুর মানেই ঠাকুর। তা সে পাথরেরই হোক আর মাটিরই হোক।
বললে–হে ঠাকুর, হে ভগবান, আমার দিকে একটু দেখো তুমি, আমার দিকে একটু নেকনজর দিও–আমার ভাগ্নেটা টাকা কড়ি কিছু চায় না, তা না চাক্ গে, সে সন্নিসী মানুষ, তার টাকা না হলে চলে যায়, কিন্তু আমার যে বড় টাকার টানাটানি–আমার অভাবটা একটু মিটিয়ে দিও বাবা। আমি তোমার কাছে আর কিছুই চাইনে বাবা, অন্য লোককে তুমি যা-খুশী দিও, আমি কিছু বলতে যাবো না, কিন্তু আমাকে বেশ মোটা-রকম টাকা দিও তুমি, টাকা পেলে আর কোনও দিন তোমায় বিরক্ত করবো না বাবা, তুমি তো জানো বাবা, আমার সংসারের অবস্থা।
