বলে খপ করে প্রকাশের হাতখানা ধরে টানতে লাগলো। বললে–এই সব হারামজাদাদের নিয়ে হয়েছে আমার সংসার, যেদিকে দেখবো না সেই দিকেই চিত্তির!
প্রকাশকে টানতে টানতে মাসি একেবারে বাড়ির ভেতরের বৈঠকখানা ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালো। বললে–তোমার ভগ্নীপতি কত টাকা রেখে গেছে বললে?
প্রকাশ আবার বললে–আট লাখ টাকা, তা ছাড়া সোনা রুপো-জড়োয়ার গয়না, বাসনপত্তোর, তারও দাম কম করে কয়েক হাজার টাকা
–সবই তোমার সেই ভাগ্নের? আর কেউ ওয়ারিশন নেই?
–না। সদা যে আমার ভগ্নীপতির একই সন্তান–
–তা এখন যদি তোমার ভাগ্নেকে খুঁজে না পাও, তখন? তখন টাকাটা কে পাবে?
প্রকাশ বললে–তখন সব পাবো আমি—
পাশে দাঁড়িয়ে মহেশও সব শুনছিল। মাসি তার দিকে চেয়ে থমকে উঠলো–তুই হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছিস কী? বেটার কোনও দিকে যদি খেয়াল থাকে। ভদ্দরলোক বাড়িতে এসেছে আর তুই ঠুটো জগন্নাথ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিস? যা, দৌড়ে চা-জলখাবার নিয়ে আয়, ঠাকুরকে বলবি চায়ের জল বসাতে, আর দোকান থেকে পাঁচ টাকার মিষ্টি আনবি, রাজভোগ, রাবড়ি যা ভালো-ভালো খাবার দেখবি নিয়ে আসবি—যা–
তারপর প্রকাশের দিকে চেয়ে বললে–তুমি একটু বোস বাবা। আমি মহেশকে টাকাটা বার করে দিই–আচ্ছা, তোমার ভাগ্নে বড় ভালো ছেলে ছিল, জানো একদিন তাকে ডেকে আমি তার চরণ-পূজো করেছিলুম–
বলে মাসি ভেতরে চলে যাচ্ছিল। প্রকাশ বলে–অত জলখাবারের ব্যবস্থা করতে হবে না মাসি, আমি অত খেতে পারবো না–
মাসি বললে–খেতে পারবে না মানে? এই তো তোমাদের খাবার বয়েস গো আর এতদিন পরে এলে আমি তোমাকে না-খাইয়ে ছেড়ে দিতে পারি? তুমি বোস, আমি আসছি—
বলে মাসি ভেতরে চলে গেল। মাসির পেছনে-পেছনে মহেশও চলে গেল ভেতরে।
প্রকাশ উঠলো। মাসির খপ্পরে একবার পড়লে আর ছাড়া পাওয়া যাবে না। মাসি টাকার গন্ধ পেয়েছে। টাকার গন্ধ পেলে মাসিকে আটকানো দায়। সামনের রাস্তায় নেমে আর কোনও দিকে চেয়ে দেখলে না প্রকাশ। একেবারে বড়বাজারের পাথুরেপটির দিকে পা বাড়িয়ে হন্ হন্ করে এগিয়ে চললো।
.
আস্তে আস্তে আবার রাত নেমে এল পৃথিবীতে। রাত নেমে এল বউবাজারে। বড়বাজারের পাথুরেপটিতেও রাত নেমে এল। আর রাত নেমে এল নৈহাটিতে নয়নতারার বাড়িতে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এই গ্রহটিতে আগে আরো অনেক কোটি কোটি বার রাত নেমে এসেছে, হয়ত ধ্বংস হয়ে যাবার আগে আরো অনেকবারই রাত নামবে। কিন্তু এরাত যেন এক মহা স্মরণীয় রাত। নয়নতারার জীবনের আগেকার অনেক রাতের সঙ্গে যেন এর কোনও মিল নেই। সেই নরনারায়ণ চৌধুরীর অত সাধের পুত্রবধূর জীবনে এমন রাত যেন আগেও কখনও আসে নি।
অঘোর ঘুমের মধ্যে নয়নতারার মনে হলো ঘরের দরজায় যেন টোকা পড়লো একবার। প্রথম বারের টোকাটা অস্পষ্ট, কিন্তু দ্বিতীয়বার টোকা পড়তেই নয়নতারা ভালো করে চারিদিকে চেয়ে দেখলে। পাশেই শুয়ে আছে নিখিলেশ। ঘুমে অচৈতন্য। নয়নতারা আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে উঠলো। এমন সময় কে আর দরজায় ধাক্কা দেবে!
কিন্তু দরজা খুলতেই দেখলে সদানন্দ।
–তুমি?
সদানন্দ বললে–আমি চলে যাচ্ছি–
নয়নতারা বললে–চলে যাচ্ছ? কিন্তু তুমি যে এখনও ভালো করে সেরে ওঠো নি।
সদানন্দ বললে–আমি না-সারলেও চলে যাবো। এখান থেকে আমাকে চলে যেতেই হবে, আর আমি একলাও এখান থেকে যাব না, তোমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাবো, তুমিও চলো–
নয়নতারা খানিকক্ষণ বিমূঢ় হয়ে সদানন্দর মুখের দিকে চেয়ে রইল। তারপর বললে—কিন্তু–
কিন্তু যে কথা সে বলতে চাইছিল তা আর মুখ দিয়ে বেরোল না তার। তার আগেই সদানন্দ বললে–তুমি যদি না-ই যাবে তো কেন তুমি আমাকে তোমার বাড়িতে এনে তুলেছিলে?
–তখন যদি তোমাকে আমার বাড়িতে না আনতুম তা হলে যে তোমার বিপদ হতো!
সদানন্দ বললে–আমার বিপদ হলে তোমার কী? আমি তো তোমার সঙ্গে সব সম্পর্ক ত্যাগ করেছিলুম। তা হলে কেন তুমি আবার আমার সঙ্গে সম্পর্ক পাতালে?
নয়নতারা কেমন যেন স্তিমিত হয়ে এল। বললে–আমি তোমার সঙ্গে কখন সম্পর্ক পাতালুম?
-সম্পর্ক না পাতালে নিখিলেশবাবুকে লুকিয়ে কেন তুমি আমার অসুখ সারাবার জন্যে তোমার সোনার হার বাঁধা দিয়েছিলে? কেন সারা রাত জেগে জেগে আমার অসুখের সময় সেবা করেছিলে? নিখিলেশবাবু যখন ওষুধের নাম করে বিষ কিনে এনেছিলেন কেন তখন তুমি সে-বিষ আমাকে খাওয়ালে না? কেন তখন তোমার সন্দেহ হয়েছিল? কেন তুমি ডাক্তারবাবুকে জিজ্ঞেস করতে গিয়েছিলে? একেও কি সম্পর্ক পাতানো বলে না?
নয়নতারা বললে–আজকে তুমি এই কথা বলছো!
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ, আজকে আমার ভুল ভেঙেছে বলেই এই কথা বলছি–
–ক’বছর আগে তোমার এ-ভুল ভাঙলো না কেন? ক’বছর আগে ভুল ভাঙলে তো আমি কোনও কিছু না ভেবে তোমার সঙ্গেই চলে যেতে পারতুম। এতদিন পরে কেন এমন করে তোমার ভুল ভাঙলো? এখন যে বড় দেরি হয়ে গেছে–
সদানন্দ বললে–যত দেরিই হোক, তবু আমার তো বেশি দেরি হয় নি, এখনও অনেক সময় আছে। চলো, সকাল হয়ে গেলে সবাই আবার জেনে ফেলবে, রাত থাকতে থাকতেই চলো বেরিয়ে পড়ি–
নয়নতারা যেন ককিয়ে উঠলো। বললে–ওগো, তুমি অমন করে বোল না–
–কেন বলবো না?
–না, তুমি বুঝতে পারছে না, আর যে তা হয় না—
সদানন্দ বলে উঠলো–হয় হয়, তুমি ইচ্ছে করলেই হয়। তুমি যাবে না তাই বলো–
