পাশের দোকানঘর থেকে কে একজন চেঁচিয়ে উঠলো–মশাই-এর কোত্থেকে আসা হচ্ছে?
প্রকাশ রায় সুটকেসটা নিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেল। বললে–আমি আসছি ভাগলপুর থেকে। এই নবাবগঞ্জ এসেছি একটা কাজে–
–এখানে কার বাড়িতে যাওয়া হবে?
প্রকাশ রায় বললে–কারো বাড়িতে যাবো না, আমি এসেছি সদানন্দর খোঁজে, সদানন্দ চৌধুরী–
সদানন্দ চৌধুরীর নামটা উচ্চারণ করতেই দোকানের আশেপাশে যারা ছিল তারা কাছ ঘেঁষে এসে দাঁড়ালো। এ কোথাকার লোক! কী এর পরিচয়। সদানন্দ চৌধুরীর খোঁজ করে, এ তো সাধারণ লোক নয় হে!
চৌধুরী-মশাই চলে যাবার পর নবাবগঞ্জে কেউ তো সদানন্দ বেঁচে আছে কিনা, খেতে পাচ্ছে কিনা সে-খোঁজও কখনও নেয় নি।
–তা আপনি এতদিন পরে সদার খোঁজ করছেন কেন?
–জিজ্ঞেস করতে এসেছি সে কোথায় আছে আপনারা জানেন কিনা। আমাকে তার সন্ধান দিতে পারেন কিনা। তাকে আমার বড় দরকার–
পরমেশ মৌলিক এতক্ষণ একমনে হুঁকো টানছিলেন। এবার তিনি মুখ খুললেন। বললেন–আপনার নিবাস?
প্রকাশ বললে–ভাগলপুর। আমি হচ্ছি সদানন্দর মামা–
–প্রকাশ মামা? শালাবাবু? তাই বলুন, এতক্ষণ বলেন নি কেন? বসুন বসুন, তা এ কী চেহারা হয়েছে আপনার? চুল পেকে গেছে। ওঃ কতকাল পরে দেখা হলো। তা চৌধুরী-কর্তা কেমন আছেন?
চৌধুরীমশাই মানে হরনারায়ণ চৌধুরী। প্রকাশ রায় বললে–জামাইবাবু গেল হপ্তায় মারা গেছেন।
মারা যাওয়ার খবর শুনেই সবাই যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল। বললে–মারা গেছেন?
পরমেশ মৌলিক হরনারায়ণ চৌধুরীর কাছারিতেও কিছুদিন কাজ করেছিলেন। খবরটা শুনে তিনি সকলের চেয়ে বেশি চমকে উঠলেন। বললেন–সে কী? মারা গিয়েছেন? শেষকালে কী হয়েছিল?
প্রকাশ রায় বললে–তেমন কিছুই হয় নি, বেশ ভালোই ছিলেন। কদিন ধরে দেখছিলুম তিনি বাইরে বেরোচ্ছিলেন না, একদিন ঘরের দরজা খুলে দেখি তিনি মরে পড়ে আছেন। কেউ জানতেও পারি নি আমরা…
নতুন লোকের আমদানি দেখে ততক্ষণে আরো কিছু লোক এসে জড়ো হয়েছিল। হরনারায়ণ চৌধুরীর মৃত্যুর খবর শুনে অনেকেই দীর্ঘশ্বাস ফেললে। অনেকেই তাকে দেখেছে। যারা দেখে নি তারা নাম শুনেছে। চৌধুরী বংশের কাহিনী শুনেছে। সেই হরনারায়ণ চৌধুরীর মর্মান্তিক পরিণতির বর্ণনা শুনে সবার মুখ দিয়েই অজান্তে একটা ‘আহা’ শব্দ বেরিয়ে এল। এমনিই হয় গো। যত বড়লোকই হও, সকলের পরিণতি ওই মৃত্যুতে। ওর থেকে কারোর মুক্তি নেই। এই পুরোন কথাটাই যেন আবার সকলের নতুন করে মনে পড়ে গেল।
প্রকাশ রায় বললে–তা এখন সে যা হবার হয়ে গেছে, এখন আমি এসেছি সদাকে খুঁজতে। কোথায় গেলে তাকে পাই বলতে পারেন? কলকাতায় গিয়েছিলাম, সেখানে তারাও তার কোনও সন্ধান জানে না, তাই নবাবগঞ্জে এলাম, এখন এর পর কোথায় গেলে তাকে পাবো তাও বুঝতে পারছি না
পরমেশ মৌলিক বললেন–সদা কি আর বেঁচে আছে? আমার তো বিশ্বাস হয় না। শেষকালের দিকে তার অবস্থা বড় খারাপ হয়েছিল। একদিন মাত্র এসেছিল এ-গাঁয়ে–তাও সে অনেক কাল হলো–
–কেন?
নিতাই হালদার পাশেই দাঁড়িয়ে শুনছিল। সে আর থাকতে পারলে না। বললে–কেন ভালো থাকবে? আপনারা কি তার কোনও খোঁজখবর নিয়েছিলেন? নিজের বাপ যাকে দেখতো না, সে কী করে ভালো থাকবে? তাকে কি কেউ খেতে পরতে দিত? এখন তার বাপ মারা গেছে, তাই সম্পত্তির লোভে তার খোঁজখবর নিতে এসেছেন আপনারা। কিন্তু তখন কোথায় ছিলেন?
পরমেশ মৌলিকও তাই বললেন–হ্যাঁ শালাবাবু, শেষকালের দিকে সদার বড় কষ্টে দিন কেটেছে–অত বড় বংশের ছেলে, তার কিনা এই দশা। শেষকালে একটা যাত্রার দল এসেছিল গাঁয়ে, তাদের পেছন পেছন সে চলে গেল–
প্রকাশ রায় যেন এতক্ষণে খানিকটা সুরাহা পেলে। বললে–যাত্রার দলের সঙ্গে? কোথায় গেল তাদের সঙ্গে?
–তা কি ছাই দেখেছি? যাত্রার দল কি আর এক জায়গায় বসে থাকে শালাবাবু? তারা তো ঘুরে বেড়ায় চারদিকে। আজ আছে হুগলী, কালই হয়ত আবার চলে গেল আসামের দিকে
–তবু একটা আপিস তো আছে তাদের কোথাও। যাত্রাদলের নামটা জানতে পারলেও হয় তাদের হেড-অফিসে গিয়ে খোঁজ নিতে পারি–
পরমেশ মৌলিক বললেন–কত যাত্রার দলই তো আসে! ও যাদের সঙ্গে গিয়েছিল তাদের নামটা ঠিক মনে ঠিক মনে পড়ছে না।
তারপর অন্য যারা আশেপাশে ছিল তাদের দিকে ফিরে বললেন–তোমরা জানো নাকি হে কেউ নামটা?
নিতাই হালদার পাশেই ছিল। সে আর থাকতে পারলে না। বললে–তা এতদিন কোথায় ছিলেন আপনারা শালাবাবু? এতদিন তো আপনারা একবারও তার খোঁজ নিতে আসেন নি? এখন চৌধুরী মশাই মারা গেছেন তাই তাঁর অগাধ টাকার ওয়ারিশানকে খুঁজে বার করতে এসেছে। আমরা সব বুঝতে পেরেছি–
প্রকাশ রায় কথাগুলো শুনে যেন কেমন চুপসে গেল।
নিতাই হালদার তবু থামলো না। বলতে লাগলো–চৌধুরী মশাই-এর লাখ লাখ টাকা এখন সবই তো পাবে সদানন্দ, তাই তার জন্যে এখন আপনাদের যত দরদ উথলে উঠেছে, না? তাই এখন খোঁজ পড়েছে তার। ভেবেছেন পাগল ভাগ্নেকে সামনে খাড়া করে টাকাগুলো নিজেদের পেটে পুরবেন। তা মতলোব আপনাদের খুবই ভালো শালাবাবু। কিন্তু একটা কথা বলে রাখছি, সদানন্দর যা হয় হোক, এতে আপনাদেরও কিন্তু কিছু ভালো হবে না। আপনাদের এ টাকা ভোগে আসবে না। কারণ এখনও আকাশে চন্দ্র-সূর্য ওঠে, ভুলে যাবেন না মাথার ওপর ভগবান বলে এখনও একজন আছেন–
