প্রকাশ বললে–সদার বাবা তো ভাগলপুরে ছিলেন। কিন্তু তিনি তো মারা গেছেন, সেই তার বাপ মারা যাওয়ার খবরটাই তাকে দিতে এসেছি–
–কিন্তু দাদাবাবুর তো বিয়েও হয়েছিল শুনে এসেছি।
প্রকাশ বললে–বাঃ তুমি তো বেশ চালাক-চতুর লোক হে, তুমি তো তা হলে সব জানো দেখছি।
–তা জানবো না, দাদাবাবু তো সব বলেছে আমাদের।
প্রকাশ বললে–বেশ বেশ, বেশ চালাক ছেলে ভাই তুমি, এখন সদার ঠিকানাটা ভাই দাও দিকিনি আমাকে। তার বাবা মারা যাবার পর লাখ লাখ টাকা রেখে গেছে, সে সব এখন কে খাবে বল তো? তা খবরটা তাকে না দিলে সব টাকা যে গভর্ণমেন্টের পেটে যাবে, তাই অত কষ্ট করে তার খোঁজে আসা, নাহলে আমার আর কী, আমার কলা, তারই ভালো, সে মাঝখান থেকে অনেকগুলো টাকা পেয়ে যাবে–
মহেশ হাসলো। বললে–আজ্ঞে টাকার কথা বলছেন? টাকার লোভ তার নেই—
প্রকাশ বললে–সদার টাকার লোভ নেই তা তুমি কেমন করে জানলে?
–আমি জানবো না, দাদাবাবু যে আমাদের এখানে ছিল আগে! আমার বাবু তো তাকে বাবুর সমস্ত সম্পত্তি উইল করে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তো তা নিলেন না–
–তোমার বাবুর কত টাকা?
–বাবুরও যে দেশে অনেক জমি-জমা, তার ওপর কলকাতার এই বাড়ি, এ সব তো বাবুর নিজের। এই সবই বাবু দাদাবাবুকে উইল করে লিখে দিয়েছিলেন–
–তারপর?
–সেই টাকা নেবার ভয়েই তো দাদাবাবু এবাড়ি ছেড়ে একদিন পালিয়ে গেলেন।
প্রকাশ অবাক হয়ে গেল কথাগুলো শুনে। সদার মত আহাম্মক আর দুনিয়াতে কেউ আছে এটা কল্পনাই করতে পারলে না প্রকাশ। সদা টাকা চায় না, আর টাকাই কিনা সদার পেছনে পেছনে ধাওয়া করছে! হায়রে, প্রকাশকে তো কেউ টাকা নিতে বলে না। একেই বলে টাকা-কপালে ছেলে!
–আমার ভাগ্নেটার বরাবর ওই রকম স্বভাব ভাই। আহম্মকের এক-শেষ! টাকাকে কি অত অচ্ছেদা করতে আছে? তুমিই বলো না, তুমি তো খুব চালাক-চতুর ছেলে। টাকা লক্ষ্মী তো, সেই লক্ষ্মীকে তুই অচ্ছেদ্দা করলি, তাহলে লক্ষ্মীও তো তোকে অচ্ছেদ্দা করবে, মা লক্ষ্মীকে কি অত অচ্ছেদ্দা করতে আছে? তুমিই বলো?
তারপর সে-প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে বললে–যাক গে, যে যা ভালো বোঝে করুক গে, তাতে তোমার আমার মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই ভাই। এখন সে কোথায় গেল সেইটে বলো দিকিনি। আমি তাকে কিছু বলবো না, শুধু তার বাপের টাকাটা তার হাতে তুলে দিয়ে আমি ছুটি পেতে চাই ভাই। পরের টাকার ঝঞ্ঝাট নিয়ে আমার আর ভাল্লাগছে না…।
মহেশ বললে–কিন্তু দাদাবাবু কাউকে বলতে বারণ করেছে যে–
–আরে আমি তো আর পর নই। আমি তো তার মামা। আমি তো তার ভালোর জন্যেই তাকে খুঁজছি। আমি তার বউকেও পর্যন্ত বলবো না। আমার ভাগ্নেটা এমন লক্ষ্মীছাড়া যে কী বলবো। নইলে শুনলাম তার বউটাও নাকি আবার বিয়ে করেছে
–বউ আবার বিয়ে করেছে? কে বললে–আপনাকে? আমি তো জানতুম না।
–আমি কি জানতুম? আমি কেষ্টনগর থেকে শুনে এসেছি। কেষ্টনগরে তো সদার শ্বশুরবাড়ি ছিল? যেই তার শ্বশুর মারা গেছে, আর বউটাও একটা ছোঁড়াকে বিয়ে করে তার সঙ্গে ভেগে পড়েছে। এখন সে বউ নাকি সেই ছোঁড়ার সঙ্গে নৈহাটিতে থাকে–
মহেশ বললে–দাদাবাবু বড় ভালো লোক–
প্রকাশ বললে–ভালো লোক বলেই তো এত ঝঞ্ঝাট। ভালো লোক না হলে কারো বউ এমন করে পালায়? তুমিই বলো না! তা তার ঠিকানাটা কোথায় বলো তো, আমি একবার গিয়ে ধরি তাকে এখন–
মহেশ বললে–আপনি বড়বাজার চেনেন তো? পাথুরেপটি? সেইখানে একটা মস্ত বড় ধর্মশালা আছে, সেই ধর্মশালায় খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন–
হঠাৎ পেছন থেকে মানদা মাসি চিৎকার করলে–এই হারামজাদা, এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দেওয়া হচ্ছে, আর আমি যে চেঁচিয়ে গলা…
–মাসি!
প্রকাশ চিনতে পেরেছে। এই মাসির খোঁজেই সে কালীঘাট থেকে এখানে এসেছে।
মাসি কিন্তু চিনতে পারলে না। বললে–কে গো বাছা তুমি?
–আমাকে চিনতে পারছো না? আমি প্রকাশ গো! সেই প্রকাশ রায়। তোমাকে সেই আমার ভাগ্নের ছবি দিয়ে গিয়েছিলুম। মনে পড়ছে? সেই যে সেই বাতাসীর বাবুকে দেখাবে বলেছিলে! মনে পড়ছে না?
এতক্ষণে বুঝি চিনতে পারলে মাসি। বললে–তা তুমি আমার এখানকার ঠিকানা পেলে কী করে বাছা?
–কেন, বাসন্তী! তোমার কালীঘাটের বাসন্তীকে জিজ্ঞেস করলুম। সে-ই তোমার ঠিকানা দিলে। তা তুমি তোমার অত ফলাও কারবার ছেড়ে এখেনে চলে এলে যে?
মাসি সেকথার জবাব না দিয়ে বললে–তোমার ভাগ্নে কোথায়? তাকে খুঁজে পেলে?
–না, সেই তাকে খুঁজতেই তো এইচি। আমার সেই ভগ্নীপতি মারা গিয়েছে, জানো? আমার সেই বড়লোক ভগ্নীপতি! এদিকে আবার ভাগ্নেও নিরুদ্দেশ। তার বাপ আট লাখ টাকা রেখে গেছে, সেই খবরটা আমার ভাগ্নেকে দিতে এসেছি–
এতক্ষণে যেন একটু নরম হলো মানদা মাসি। বললে–আট লাখ টাকা?
প্রকাশ বললে–হ্যাঁ–
সঙ্গে সঙ্গে মাসি যেন একেবারে অন্য রকম মানুষ হয়ে গেল। সমস্ত মুখের চেহারাটাই বদলে গেল মাসির। বললে–তা বাবা, তুমি এরকম করে বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন, ভেতরে এসো, ভেতরে এসে বোস না। ওরে, এই মহেশ, তুই হারামজাদা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিস কী? ভদ্দরলোকের ছেলেকে বাড়ির ভেতরে এনে বসাতে পারছিস নে?
তারপর প্রকাশের দিকে চেয়ে বললে–দেখেছ বাবা এদের আক্কেলখানা? তোমাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে গল্প করছে, এসো বাবা এসো, ভেতরে এসো, ছিঃ ছিঃ–
