মানদা মাসি বাতাসীর পা টিপে দেয় আর গল্প করে।
পা টিপতে টিপতে বলে–কী রে, আমার কথা বড়বাবুকে কিছু বলেছিলি?
বাতাসী চোখ বুঁজে বুঁজেই বলে–তোমার কথা আমি আর কী বলবো মাসি, তুমি নিজেই তো বলেছিলে।
মাসি বলে–আমি তো বলেই ছিলুম, কিন্তু তোকে তো সে-সব একবার মনে করিয়ে দিতে হয়! কাজের লোকের কী সব সময়ে সব কথা মনে থাকে?
বাতাসী বলে–তা আমারই কী কাজ নেই ভাবছো? আমারই কী সব কথা মনে থাকে?
মাসি বলে–তোর আবার কীসের কাজ রে? তোর কাজ করবার কত লোক রয়েছে, তুই একবার হুকুম কর না কোন কাজটা তোর করে দিতে হবে? যদি কেউ না করে তো আমি তাকে ঝাঁটা মেরে বাড়ি থেকে বিদায় করে দেব না–
বাতাসী বলে–তা এতই যদি তোমার ঝাঁটার জোর তো ওই মাগীটাকে বাড়ি থেকে বার করে দাও দিকিনি, দেখি তোমার কত ক্ষমতা?
–কোন মাগীটাকে? ওই বুড়ীকে?
–না, ওই ছুঁড়িকে।
মাসী বলে–ছুঁড়ির যে দেখাই পাইনে রে, ছুঁড়ি যে ঘর থেকেই বেরোয় না–
–তা কী এমন নন্দিনী যে ঘর থেকে একবার বেরুবেই না! বাড়ির ঝি-চাকর-ঠাকুর সবাই তো নবাব নন্দিনীকে নিয়েই অস্থির, আমাকে আর কে দেখছে বলো না, আমার কথা আর কে ভাবছে?
মাসি বলে–তা বড়বাবুকে সে কথা বললেই পারিস—
বাতাসী বলে–বড়বাবু আমার কথা শুনছে!
মাসি বলে–ওমা, তুই বলিস কী? বড়বাবু তোর জন্যে এত করে, তুই রাস্তায় পড়ে ছিলিস, বড়বাবু তোকে সেখান থেকে নিজের বাড়িতে এনে তুললে, সেই তুই-ই কিনা বড়বাবুর নামে এই বদনাম দিস?
তারপরে একটু থেমে বলে ঠিক আছে, আমি আজকে ওই মহেশ বেটাকে বলছি, ওই মহেশ বেটাই যত নষ্টের গোড়া। ওই মহেশটাই তো ছুঁড়ির ঘরে গিয়ে খাবার দিয়ে আসে। ওকে তুই ছাড়াতে পারিস না?
বাতাসী বলে–ও এতদিনের লোক, ওকে কী করে ছাড়াই বলো দিকিনি–
মাসি বলে–ঠিক আছে, তুই না ছাড়াতে পারিস, আমি ছাড়াবো। আমি এখুনি গিয়ে ছাড়িয়ে দিচ্ছি—
বলে সত্যি-সত্যিই মাসি উঠলো। উঠে বাড়ি কাঁপিয়ে চিৎকার করে ডাকতে লাগলো এই মহেশ, মহেশ–
মানদা মাসির চিৎকারে সমস্ত বাড়িটা তখন গমগম করে উঠলো। দোতলা থেকে একতলা পর্যন্ত সমস্ত আবহাওয়া যেন বিষিয়ে উঠলো মানদা মাসির চেঁচামেচিতে।
–কই, মহেশ কোথায়, মহেশ—
বাড়িতে আর কজনই বা লোক। দোতলার এক কোণের দিকে বাড়ি গিন্নী চুপ করে বসে ছিল। কথাটা তার কানেও গেল। কানে যেতেই মনটা বিষিয়ে উঠলো এক মুহূর্তে। কর্তা চলে গেছেন, তিনি চলে গিয়ে বেঁচেছেন। কিন্তু তাকে এ কোন্ নরকের মধ্যে ফেলে দিয়ে গেলেন তিনি। তিনি হয়ত বুঝতেই পেরেছিলেন যে একদিন এমন হবে। তাই হয়ত খোকাকে সব সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আর। গিন্নীর সামনে দেওয়ালের গায়ে সমরজিৎবাবুর একটা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি টাঙানো ছিল। সেই দিকে চেয়েই তিনি মনে মনে কী বলতে লাগলেন তা কেউ জানতে পারলে না।
–ঠাকুর, মহেশ কোথায় গেল?
ঠাকুর নিচের রান্নাঘরে নিয়ে ব্যস্ত ছিল। বললে–আমি তো দেখি নি মাসিমা–
–তুমি যদি দেখতেই না পাবে বাছা তো মাইনে নিচ্ছ কেন বসে বসে? বসন্ত কোথায় গেল? বসন্ত?
–সে বাজারে গেছে।
বাজারে গেছে! বাজারে যাবার আর সময় পেলে না হারামজাদা। যখন-তখন বাজারে যাওয়া তার আমি দেখাচ্ছি! কে তাকে বাজারে পাঠালে এখন? কে?
যেদিন থেকে মাসি আর নতুন বউমা এসেছে সেই দিন থেকেই এ বাড়ির আদি বাসিন্দাদের কারো মনে সুখ নেই। আগে ঠাকুর-চাকর কাজ করেছে, তখন কোনও ঝামেলা ছিল না কারো। তারা এ বাড়ির একজন হয়েই কাজ করে নিশ্চিন্ত হয়েছে। কারোর গালাগালি খাবার দুর্ভোগ সইতে হয়নি কখনও।
ঠাকুর বললে–আজ্ঞে, মহেশ তাকে বাজারে পাঠিয়েছে—
–আমি মহেশকে দেখাচ্ছি–দেখাচ্ছি তার মজাটা—
কিন্তু সদর দরজার সামনে মহেশ তখন একজন ভদ্রলোকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ভদ্রলোক গ্রাম থেকে এসেছে। কলকাতায় বিশেষ কাউকেই চেনে না। অনেক কষ্টে ঠিকানা খুঁজে এই বউবাজারের গলির মধ্যে এসেছে।
মহেশ জিজ্ঞেস করলে–তা মানদা মাসি আপনার কে?
ভদ্রলোক বললে–কে আবার, কেউই না। আমি কালীঘাটে তার বাড়িতে গিয়ে শুনলুম মাসি এখন এখানে, তাই দেখা করতে এলুম। তুমি এবাড়ির কে?
–আমি এ বাড়িতে চাকরি করি। আপনি কে? আপনার নাম কী?
ভদ্রলোক বললে–আমাকে মাসি চেনে, তুমি চিনতে পারবে না, আমি আসছি নবাবগগঞ্জ থেকে
–নবাবগঞ্জ? নদীয়া জেলার নবাবগঞ্জ? আমি তো সেখানে গিয়েছি। রেলবাজারে নেমে যেতে হয়।
–তুমি সেখানে গিয়েছ? কী করতে? তোমার দেশ নাকি?
মহেশ বললে–আমি গিয়েছিলুম সদানন্দবাবুর বাড়ির খোঁজখবর নিতে–
সদানন্দবাবু? সদা? সে-ই তো আমার ভাগ্নে গো! আরে আমি তো তার খোঁজেই কলকাতায় এসেছি। সে কোথায়? আমার কাছে কিছু লুকিও না ভাই, আমি তার মামা, আমি হন্যে হয়ে তাকে খুঁজছি আর সে কি না তোমাদের এখানে রয়েছে। তাজ্জব কাণ্ড তো! আমার নাম প্রকাশ। প্রকাশচন্দ্র রায়। আমার নাম বললেই চিনতে পারবে সে। তাকে একবার ডেকে দাও তো–ডেকে দাও–
মহেশ বললে–কিন্তু তিনি তো এখানে নেই
–নেই? কোথায় গেল?
মহেশ একবার ভাবলে লোকটাকে দাদাবাবুর ঠিকানা দেবে কিনা। ভালো করে চেয়ে দেখলে ভদ্রলোকের চেহারার দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করলে কিন্তু আমি তো নবাবগঞ্জ গিয়ে শুনে এসেছি দাদাবাবুর মা মারা গেছে, বাবা ছিল, তা তিনিও চলে গেছেন ভাগলপুরে। আমি যখন গিয়েছিলুম তখন তো নবাবগঞ্জে কেউ ছিল না–
