তা ভাগ্য ভালো ছিল মানদা মাসির। ঠিক সেই সময়েই এল বাতাসী, আর এল বড়বাবু।
তখন থেকেই মানদার প্রধান কাজ হলো বাতাসীকে খুশী করা। কী করে বাবুকে খুশী করে তাকে বশ করতে হয় মানদা মাসি সে-সব বিদ্যে শিখিয়ে দিত বাতাসীকে।
বাতাসীর একটা গুণ ছিল যে মাসির কথাগুলো মন দিয়ে শুনতো।
মানদা মাসি বলতো–একটা কথা বলে রাখি বাছা–মন দিয়ে শোন, মন-পেরান দিয়ে বাবুর খাতির করবি বুঝলি, বাবু যদি মদ খেয়ে বমি করে দেয় তা তাতেও ঘেন্না করিস নি যেন। হাত পেতে সেই বমি তুলে নিবি, তবু মুখে রাগ দেখাতে পারবি না। সেই কথায় আছে না–মাটির বেড়ালই হোক, আর কাঠের বেড়ালই হোক ইঁদুর ধরতে পারলেই হলো–
আরো কত কথা শেখাতো বাতাসীকে। বলতো–পোড়া পেটের জন্যেই তো ভাত রে বাতাসী, নইলে ভাতের বয়ে গেছে পেট খুঁজতে
বাতাসী বলতো–কিন্তু মাতাল হলে যে বড়বাবুর আর জ্ঞান থাকে না মাসি–
মানদা মাসি বলতো–তা না থাকুক, ভাতারে কি ভাত দেয় মা! ভাত দেয় গতরে গতর যতদিন আছে তদ্দিন কামিয়ে নাও–তোমার গতর যখন থাকবে না তখন কেউ তোমায় দেখবে না—
তা বাতাসীর ভাগ্য ভালো ছিল বলতে হবে। তবে গতরের জোর কি ভাগ্যের জোর কে জানে, বড়বাবুর বাবু মারা যাওয়ার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই বাতাসী একেবারে বউ হয়ে গিয়ে বড়বাবুর বাড়িতে গিয়ে উঠলো। বাতাসী বললে–মাসি, তুমিও আমার সঙ্গে চলো–
মাসির কারবারেও তখন বেশ মন্দা চলেছে। সেই যে কলকাতায় বোমা পড়লো, তারপর শহর থেকে লোকজন পালাতে আরম্ভ করলো, তখন থেকেই মন্দা হয়েছিল। তারপর যেদিন হিন্দু-মুসলমানে দাঙ্গা হলো তখন আর তার কারবার চলে না। এক-একদিন মেয়েদের হাঁড়ি চড়ে না পর্যন্ত। খদ্দের দূরের কথা, দরজা সামনে দিয়ে একটা পিঁপড়ে পর্যন্ত রাস্তা মাড়ায় না। অতদিনের বনেদী পাড়া, এককালে কত জাঁকজমক ছিল পাড়ার, কত ইজ্জৎ ছিল। তখন কারবারের এমন বাড়বাড়ন্ত ছিল যে খদ্দেরে ভিড়ে মেয়েদের নাওয়া-খাওয়ার সময় পর্যন্ত ছিল না। সেই পাড়ারই তখন একেবারে মড়াখেগো দশা। এক-একদিন বউনিই হয় না, এমন আকাল।
সুতরাং বাতাসীর কথায় মানদা মাসির অবস্থাটা প্রায় সেই রকম হলো–পাগলা ভাত খাবি, না আঁচাবো কোথায়?
মানদা মাসি বললে–যেতে তো আমি তৈরি, কিন্তু তোকে একটা কাজ করতে হবে মা, পারবি?
–কী কাজ বলো না।
–বড়বাবু তো এখন বাপের সম্পত্তির মালিক হলো, আমাকে এখন কিছু টাকা পাইয়ে দিতে পারিস? আমি এমনি নোব না, ধার হিসেবে নেব, সুদ চাইলে সুদও দিতে পারি। তা বলবি তুই?
বাতাসী বললে–তোমার তো অনেক টাকা মাসি, তুমি আবার টাকা কী করবে?
–ওমা, তুই আমার টাকা কই দেখলি? আমার টাকা কোথায়? টাকা থাকলে আজ আমি এই বুড়ো বয়েসে তোর খোসামোদ করি? টাকা থাহলে আমি আজ এর-ওর দোরে হন্যে হয়ে বেড়াই?
–তা তোমার বাড়িতে ভালো ভালো মেয়ে রাখলেই পারো। ভালো মেয়ে রাখলেই বড়লোক খদ্দের আসবে।
দূর পাগলী মেয়ে, ভালো মেয়ে যে রাখবো তাতেও তো টাকা লাগবে। ভালো মেয়ে কি এমনি অকাশ থেকে উড়ে আসে! তার জন্যে দালাল লাগাতে হয়। সে এ-সব বাজে দালালের কম্ম নয়। এর জন্যে বড় বড় সব দালাল লাগে, তাদের খাইও যে তেমনি। যে পূজোর যে-নৈবিদ্যি তা তো তুই জানিস নে। এ কারবারে অনেক ল্যাঠা। ভালো দালাল না রাখলে ভালো মেয়ে তারা যোগাবে কে? বাড়িটাও তেমনি একটা ভালো পাড়ায় নিয়ে যেতে হবে। ভালো মানুষের ছেলেরা কি আর আমার এই টিনের চালের বাড়িতে আসতে চায়? তা মতলোব আমি সব দিতে পারি, কিন্তু শুধু পিঠে খেলেই তো চলবে না, পিঠের ফোঁড় গুনবে কে?
কথাগুলো বুঝেছিল বাতাসী। বড়বাবুর কাছে যখন বাবার মৃত্যুর খবরটা এল তখনই বাক্স-প্যাটরা বেঁধে নিলে বাতাসী। মানদা মাসিও নিজের বাড়ির জিনিসপত্র গুছিয়ে তৈরি হয়ে এল।
বড়বাবু মানদা মাসিকে দেখে জিজ্ঞেস করলে–তুমি? তুমি আবার কোথা যাবে?
বাতাসী বললে–মাসি আমার সঙ্গে যাবে—
বড়বাবু জিজ্ঞেস করলে–কেন?
বাতাসী বললে–না গেলে আমার দেখাশোনা করবে কে সেখানে?
বড়বাবু বললে–তোমাকে দেখবার কি লোকের অভাব আছে সেখানে? লোক না থাকে লোক রাখবো। মাসির অনেক কাজ, মাসির নিজের কাজকারবার কে দেখবে?
মাসি এতক্ষণে কথা বললে–কারবারের কথা আর বোল না বাবা, কারবার আমার ডকে উঠেছে–
–কেন?
–খদ্দের কোথায়? খদ্দেরই তো লক্ষ্মী আমার। এমন হাল হয়েছে কলকাতার, এ একেবারে লক্ষ্মীছাড়া কাণ্ড! মেয়েরা আমার সব উপোস করতে বসেছে।
–কেন? কেন?
–সে-সব বাবা তোমাকে পরে বলবো, এখন তো তোমার অত শোনবার সময় নেই। এখন তোমার নিজেরই কত ভাবনা, তার ওপরে আমার ভাবনা দিয়ে আর তোমার মাথা ভারি করতে চাই না–
তা সেই-ই হলো সূত্রপাত। সেইদিন থেকেই মানদা মাসি বড়বাবুর পেছেনে লেগে পড়ে ছিল। শ্রাদ্ধ-শান্তি যেদিন চুকে গেল সেই দিন থেকেই মানদা মাসি বাতাসীকে বলতে কী রে, বড়বাবুকে তুই বলেছিস?
বাতাসীর তখন সুখের শেষ নেই। এত বড় সংসারের গিন্নী। চাকরবাকর, ঝি রাঁধুনী, এক গ্লাস জল পর্যন্ত নিজের হাতে গড়িয়ে খাবার দায় নেই। ঘুম থেকে ওঠবার আগেই মুখের কাছে চা এসে হাজির হয়। আর শোবার আগে যতক্ষণ না বড়বাবু বাড়ি ফেরে ততক্ষণ মানদা মাসি তার পা টিপে দেয়। এমন বিনা-পয়সার পা টেপবার লোক ক’টা বাড়ির বউ পেয়েছে?
