এ-বাড়ীর গিন্নী ছিলেন তিনিই। কিন্তু সমরজিৎবাবুর মৃত্যুর পর থেকে তাঁর আর কোনও কর্তব্য রইল না। এ বাড়ির গিন্নী হয়ে বসলো–মানদা মাসি।
প্রথম প্রথম সমরজিৎবাবুর স্ত্রী কিছু বলতে চাইতেন, কিন্তু মানদা মাসি থামিয়ে দিত। বলতো–তুমি চুপ করো না দিদি, তুমি বুড়ো মানুষ, পূজো-আচ্ছা নিয়ে থাকলেই পারো। তোমাকে সব ব্যাপারে মাথা ঘামাতে কে বলেছে?
সমরজিৎবাবু মারা যাবার পর থেকেই যেন এ বাড়ির সব হালচাল একেবারে রাতারাতি বদলে গেল।
বাড়ির গিন্নী সব দেখেশুনে একেবারে চুপচাপ হয়ে গেলেন। এককালে কত সুখ ছিল কত প্রতিপত্তি ছিল। সেসব স্মৃতি যেন তখনও চোখের ওপরেই ভাসতো।
একমাত্র মহেশই বলতে গেলে গিন্নীমার খোঁজখবর নিত তবু। দোতলায় একেবারে কোণের ঘরটায় তাকে ঠেলে দিয়েছে নতুন বউমা।
মহেশ এলে চুপি চুপি ডাকে—মা—
গিন্নীমা বলেন–কে?
–আমি মহেশ মা। আপনার খাওয়া হয়েছে?
গিন্নিমা জিজ্ঞেস করেন–বাড়িতে কারো শব্দ পাচ্ছিনে কেন রে? নতুন বউমা কোথায়? মহেশ বলে বড়বাবু নতুন বউদিকে নিয়ে বায়োস্কোপ দেখতে গেছে–
–ও—
এর বেশি আর কিছু বলেন না তিনি। এর বেশি বলবার প্রবৃত্তিও কখনও হয় না তার। আগে হলে অন্তত একবার রান্নাঘরের দিকে যেতেন। কর্তা কী খাবেন না-খাবেন তার তদারকও করতেন একটু। ঘর থেকে দশবার বেরোতেন, তারপরে কর্তা গঙ্গাস্নান সেরে আসবার পর থেকে কাছে কাছে থাকতেন।
কিন্তু আসল মানুষ চলে গেলে বোধ হয় বাড়ির চেহারাটাই এমনি বদলে যায়। এ বাড়ির চেহারাটাই তাই বোধ হয় আমূল বদলে গেছে।
–বউমা কী করছে?
–বউদির ঘরের দরজা বন্ধ। সকাল থেকেই খুলছে না।
–খায় নি?
মহেশ বললে–না।
গিন্নীমা বললে–একবার দরজা ঠেললিনে কেন?
মহেশ বলে–ওরে বাবা, তা হলেই হয়েছে। বউদির চেহারা দেখলেই আমার ভয় পায়, আমি ও-চেহারা আর দেখতে পারিনে–
গিন্নীমা বলেন–তা তুই-ই বা এ বাড়িতে আর আছিস কেন? তোর বুঝি এত হেনস্থা ভাল লাগে?
–আমি?
মহেশ বলে–আমি চলে গেলে তখন শ্মশান জাগবে কে? শ্মশান জাগতেই তো বসে আছি! আপনি মরবেন, বৌদি মরবেন, তখন ফেলবে কে? তখন তো মড়া ফেলতে এই মহেশেরই ডাক পড়বে?
এ-সব পুরোনো কথা। এ-সব কথা শুনলে গিন্নিমার দুঃখও হয় না, ভাবান্তরও হয়না। আগে হতো। আগে চোখের জল মুছতেন আঁচলে। মনে মনে নিজের ভাগ্যকে অভিশাপ দিতেন। এই অগাধ সম্পত্তি, এই ঐশ্বর্য আর এই প্রাচুর্যের ধ্বংস কামনা করতেন। কিন্তু বেশিক্ষণ ভাবনার মধ্যে ডুবে থাকতে পারতেন না। নিচে থেকে মানদা মাসির গলার শব্দে তার সমস্ত দুশ্চিন্তার জাল ছিঁড়ে ছিঁড়ে একাকার হয়ে যেত।
কিন্তু এবাড়িতে আসার পর থেকে সেই মানদা মাসিরই সুখ হয়েছে সব চেয়ে বেশি। মানদা মাসি ছোটবেলা থেকেই বড় কষ্টে মানুষ হয়েছে। কোথায় ছিল তার মা আর কোথায়ই বা ছিল তার বাবা, তার কোনও দিন হদিস মেলে নি। লোকের আত্মীয়স্বজন থাকে, তারাই সাধারণত ছোটবেলায় সকলকে মানুষ করে। তারপর একটু খুঁটে খেতে শিখলেই তারা সরে দাঁড়ায়। তখন সবাই স্রোতের শ্যাওলার মত রাস্তায়-ঘাটে ভেসে ভেসে বেড়ায়। কলকাতার সমস্ত মানদা মাসিদের অতীত জীবনের ইতিহাস এই রকমই। তখন মানদা মাসি কালীঘাটের মন্দিরের সামনে ভিক্ষে করে বেড়াতো। একটা ছেঁড়া ময়লা ফ্রক পরে যাত্রীদের পেছন-পেছন আঠার মতন লেগে থাকতো। গলায় কান্নার সুর মিশিয়ে ঘ্যানঘ্যান করতো। মন্দিরের সদর দরজা থেকে শুরু করে একবারে ট্রাম রাস্তার মোড় পর্যন্ত কাঁদতে কাঁদতে যেতো, আর গ্রামোফোনের ফাটা রেকর্ডের মত একটা কথাই বার বার আবৃত্তি করতো–একটা পয়সা দাও বাবা, একটা পয়সা দাও বাবা–একটা পয়সা…
তখন বলতে গেলে ওইটেই সারাদিনের বুলি হয়ে গিয়েছিল মানদা মাসির। ঘুমোতে ঘুমোতে যদি কোনও দিন মাঝরাত্তিরে তার ঘুম ভেঙ্গে যেত তাহলেও ওই কথাগুলো মুখ থেকে বেরিয়ে আসতো–একটা পয়সা দাও বাবা–একটা পয়সা দাও বাবা…
তারপর একদিন ফ্রক ছেড়ে গায়ে শাড়ি উঠলো। আর তারপরে যা হয় তাই হলো। তখন আর ঘুরে ঘুরে পয়সা চাইতে হতো না। তখন বরং খাতির বেড়ে গেল মানদার। কালীঘাটের ধর্মশালা আর পাণ্ডাদের যাত্রীনিবাসে পূণ্যার্থীরা ডেকে ডেকে আদর করে মানদাকে পয়সা দিতে লাগলো। একখানা শাড়ি থেকে দুখানা শাড়ি হলো তার তখন।
তখন আর রাস্তায় ঘুরতে হলো মা মানদাকে। মন্দিরের পাণ্ডাদের বস্তিতে খোলার ঘর ভাড়া নেওয়ার প্রয়োজন যাকে বলে একেবারে অনিবার্য হয়ে উঠলো। তখন মানদার দিনেও খদ্দের, রাত্তিরেও খদ্দের। এমন কি, এক একদিন সকাল দশটার সময়ও তার দরজায় খদ্দেরের ভিড় লেগে যেত।
সে এক স্বর্ণযুগ গেছে মানদা মাসির জীবনে!
কিন্তু সে আর কতদিন! বলতে গেলে ক’টা তো বছর মাত্র। কিন্তু সেই কটা বছরের মধ্যেই একবোরে আস্ত একটা বাড়ির মালিক হয়ে বসলো মানদা মাসি। একেবারে বাড়িউলি!
সেই অবস্থাই চলছিল এতদিন। সুখে-দুঃখে অনেক বছর কেটে গিয়েছিল। কখনও টাকা কিছু জমতো, আবার হয়ত একদিন সব টাকা ফতুরও হয়ে যেত। যেত বেশির ভাগ ঘুষ দিতে গিয়ে। এ ব্যবসায় ওই একটা দোষ। টাকা এলেও তাকে বেশি দিন ধরে রাখা যায় না। চোলাই মদের কারবার সঙ্গে থাকে বলে যথাস্থানে ঘুষ দিতে হয়। সেই ঘুষের চাপ মাঝে মাঝে এত তীব্র হয়ে ওঠে যে তখন ইচ্ছে করে কারবার গুটিয়ে নিই।
