–পাপ? আমার মনের মধ্যে পাপ আছে না তোমার মনের মধ্যে পাপ! যেদিন থেকে ওঁকে এ বাড়িতে এনে তুলেছি সেই দিন থেকেই তো তুমি ওঁকে সহ্য করতে পারছ না–আমি কিছু বুঝতে পারি না মনে করছো?
–আমি কী সে কথা কোনও দিন তোমাকে বলেছি?
নয়নতারা বললে–মুখে বলবে কেন? মুখে কী কেউ তা বলে? কাজ দিয়ে তা প্রমাণ করেছ!
–কাজ? আমার কাজে কোথায় প্রমাণ পেলে যে আমি ওঁকে সহ্য করতে পারছি?
নয়নতারা এবার সোজা হয়ে দাঁড়ালো। বললে–তাহলে ওঁকে খাওয়াবার জন্যে ওষুধের নাম করে বিষ কিনে এনেছিলে কেন?
বিষ?
–হ্যাঁ, বিষ!
নিখিলেশের মুখ দিয়ে খানিকক্ষণের জন্যে কোনও কথা বেরোল না। তারপর ঢোঁক গিলে বললে–কে বললে?
–প্রমাণ চাও?
কিন্তু নিখিলেশ সে-সম্বন্ধে প্রমাণ চায় কী চায় না সে কথা শোনবার আগেই নয়নতারা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তারপর এক মুহূর্তের মধ্যে পাশের ঘর থেকে একটা কী নিয়ে আবার ফিরে এল। ওষুধের শিশি নিখিলেশের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললে–এটা তুমি কিনে আনোনি?
নিখিলেশ তখন বিমূঢ় হতবাক!
–কী, কথা বলছো না যে? আমার কথার জবাব দাও? এটা তুমি কী জন্যে কিনে নিয়ে এসেছিলে, বলো?
নিখিলেশ তখনও চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। তার মুখ দিয়ে তখন একটা কথাও বেরোচ্ছে না।
–কী হলো? তুমিই তো এতক্ষণ প্রমাণ চাইছিলে, আমি এখন প্রমাণ দেখিয়ে দিলুম। এবার জবাব দাও–
একটু থেমে নয়নতারা আবার বলতে লাগলো–তা ভাগ্যিস এটা আমি এঁকে খাওয়াই নি, খাওয়ালে কী সর্বনাশ হতো বলো তো? এটা আমি এতদিন ফেলে দিই নি, রেখে দিয়েছিলুম একদিন আমার নিজের কাজে লাগবে বলে। কী সর্বনেশে লোক বলো তো তুমি? যদি না দেখেশুনে এটা আমি এঁকে খাইয়ে দিতুম? ভাগ্যিস আমি ডাক্তারবাবুকে এটা দেখালুম! ডাক্তারবাবুই তো দেখে বললে–এটা বিষ! বললে–এটা কোত্থেকে এল? কে আনলে? আমি ডাক্তারবাবুর কথার কোনও জবার দিতে পারলুম মা, মনে মনে তোমার মতি-গতি দেখে আমি শুধু শিউরে উঠলুম, ভাবলুম মানুষ এত নীচও হতে পারে। একটা কুকুর বেড়ালকে বিষ খাইয়ে মারতেও মানুষ দু’বার ভাবে। আর তুমি এত নীচ যে একটা নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে মারতে তোমার এতটুকু সঙ্কোচও হলো না–বিষের শিশিটা কিনতে গিয়ে তোমার হাত একবার কাঁপলোও না, তুমি কিনা এসে আমাকে এক কাপ জলের সঙ্গে এই ওষুধটা এঁকে খাইয়ে দিতে বললে?
সমস্ত আবহাওয়াটা তখন থমথম করছে। এতক্ষণে যে কোথা দিয়ে সময় কেটে যাচ্ছে। তা কেউই টের পায় নি। সদানন্দ নয়নতারার কাছে গিয়ে ওষুধের শিশিটা নিতে গেল। বললে–ওটা আমাকে দাও–
নয়নতারা হাতটা সরিয়ে নিলে। বললে–না, তুমি ওটা নিয়ে কী করবে?
সদানন্দ বললে–আমার দরকার আছে–
নয়নতারা বললে–না, দরকার আমারই আছে। আমি এটা রেখে দেব। আমার কাছেই থাক। যখন সব মানুষকে চিনে গেলুম তখন হয়ত আমারই একদিন এটা দরকার হতে পারে, সেদিনের জন্যে আমি এটা যত্ন করে রেখে দেব–
–দিদিমণি–
হঠাৎ গিরিবালার গলার আওয়াজে সবাই চমকে উঠেছে। নয়নতারা ঘরের দরজার দিকে চেয়ে দেখলে গিরিবালা দাঁড়িয়ে।
–কী গো, কিছু বলবে?
–ডাক্তারবাবু এসেছেন—
ডাক্তারবাবুর নাম শুনে নয়নতারা কেমন অন্যমনস্ক হয়ে উঠলো। অবাকও কম হলো না। এত রাত্রে ডাক্তারবাবু কেন? ডাক্তারবাবুকে তো এ সময়ে আসতে খবর দেওয়া হয় নি! তিনি হঠাৎ কেন আসতে গেলেন? তার তো সকাল বেলা আসার কথা, যেমন রোজ একবার করে আসেন।
কিন্তু ভালো করে বাইরের দিকে চেয়ে দেখতেই নয়নতারার ভুল ভাঙলো। এ কী, সকাল হয়ে গেছে যে! তাড়াতাড়ি বাইরের উঠোনে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখলে, ডাক্তারবাবু হাত ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
নয়নতারাকে দেখেই ডাক্তারবাবু জিজ্ঞেস করলে–কী হলো, আমার পেসেন্ট আজকে কেমন আছে?
.
বউবাজারে সমরজিৎবাবুর বাড়িতে তখন আর এক নাটকের অভিনয় হয়ে চলেছে। বাইরে থেকে সমস্ত বাড়িটা তো বেশ শান্ত। কোথাও কিছু ব্যতিক্রম নেই। দিনের বেলায় কলকাতা শহরের চলমান সভ্যতার পালিশ গায়ে মেখে বেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। এককালে বড়লোকের সম্পত্তি বলে সুনাম ছিল বাড়িটার। সে-সুনাম বুঝি তখন আরো বেড়েছে। কারণ আগেকার মালিক ছিলেন গৃহস্থ মানুষ, কারো সাতে-পাঁচে তিনি থাকতেন না। কলকাতা শহরের রাজনীতি সমাজনীতির স্রোতে গা-ও ভাসাতেন না। দেশ স্বাধীন হবার পর কে কত সুবিধে করে নিচ্ছে, কার কতখানি অসুবিধে হচ্ছে তা নিয়েও তিনি কখনও মাথা ঘামাতেন না। তাঁর মত ছিল, সকলেই সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকুক, কারুর যেন কোনও অভিযোগ না থাকে, কেউ যেন কাউকে শোষণ না করে। আর যাদের টাকা আছে তারা যেন তাদের বাড়তি টাকা কিছু দাতব্য করে। যাদের আছে আর যাদের নেই তাদের লড়ালড়িতে যেন দেশে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি না হয়। এক কথায়, তিনি ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর শিক্ষিত মধ্যবিত্ত আওতায় মানুষ হওয়া একজন নিরীহ শান্তিপ্রিয় ভদ্রলোক।
শান্তিপ্রিয় ভদ্রলোকেরাই বোধ হয় এ যুগে সব চেয়ে কৃপার পাত্র। সত্যি বলতে কি, তাদের একূলও নেই ওকূলও নেই। তাদের সততাই তাদের সব চেয়ে বড় শত্রু। তাদের সততাকে লোকে নির্বুদ্ধিতা বলে ধরে নেয়। যেহেতু তারা শান্তি প্রিয় তাই তারা কোনও বাদ-প্রতিবাদে যেতে চায় না।
জীবনে সমরজিৎবাবু একবারই দৃঢ় হয়েছিলেন। আর সেইবারেই তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে গিয়েছিল। শান্তিপ্রিয় হওয়ার খেসারৎ তিনি ভালো করেই দিয়ে গেলেন। তাতে নিজের জীবনই যে শুধু তিনি বলি দিলেন তাই নয়, নিজের সহধর্মিণীর জীবনও চিরকালের মত বরবাদ করে দিয়ে গেলেন।
