নিখিলেশ বললে–কোথায় যাবেন তা আমার জানবার দরকার কী?
নয়নতারাও এবার একটু কঠোর হয়ে উঠলো। বললে–না, উনি যাবেন না–
–হ্যাঁ যাবেন।
নয়নতারা বললে–না, আমি বলছি উনি যাবেন না। উনি যেতে চাইলেও এই অবস্থায় আমি ওঁকে চলে যেতে দেব না।
সদানন্দ এবার এতক্ষণে কথা বললেন, আমি এখানে আর থাকতে চাই না, নিখিলেশবাবু আমাকে জোর করে ধরে রাখলেও না। আর আমি সজ্ঞান অবস্থায় থাকলে এখানে আসতুমও না। কিন্তু যাবার আগে আপনার কথার জবাব না দিয়ে যাবো না, নইলে এখান থেকে চলে গিয়েও আমার মনে শান্তি থাকবে না। আপনি একটু আগে জিজ্ঞেস করছিলেন আমি কেন নয়নতারাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করিনি, আপনি তো তা-ই জিজ্ঞেস করছিলেন?
নয়নতারা সদানন্দর সামনে এসে বললে–না, তোমাকে সে-সব কথা বলতে হবে না। আমি সব জানি–
সদানন্দ বললে–তুমি জানো কি না তা আমি জানি না। পৃথিবীর কোন মানুষই তা জানুক তাও আমি চাই না, আমি নিজেও কাউকে তা জানাতে চাই না।
নিখিলেশ বললে–সেইটেই তো স্বাভাবিক, নিজের পাপ কি কেউই নিজের মুখে প্রকাশ করে? সবাই তো তা চেপেই রাখতে চায়–
সদানন্দ কথা বলছিল আর ক্লান্তিতে হাঁফাচ্ছিল। বললে–আপনি ঠিকই বলছেন, কিন্তু এ-ক্ষেত্রে আলাদা, নয়নতারার সঙ্গে আমার সম্পর্কের ব্যাপারটা ঠিক সে-ধরনের পাপ নয়। পাপটা আমার পূর্বপুরুষের।
নিখিলেশ বুঝতে পারলে না কথাটা। জিজ্ঞেস করলে–তা পূর্বপুরুষের পাপ সম্বন্ধে আপনি যদি এতই সচেতন তাহলে সেই পাপী পূর্বপুরুষকেই তো আপনি ত্যাগ করতে পারতেন–আপনি পূর্বপুরুষের পাপের জন্যে যখন বাড়ি ত্যাগ করলেন তখন একলা না গিয়ে আপনার স্ত্রীকেও তো সঙ্গে নিতে পারতেন–ওই রকম শ্বশুর-শাশুড়ীর হেফাজতে নয়নতারাকে ফেলে রেখে নিজে কেন আপনি নিরুদ্দেশ হয়ে চলে গেলেন?
নয়নতারা লক্ষ্য করলে ক্লান্তিতে দুর্বলতায় সদানন্দর দম আটকে আসছে আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না সে।
নিখিলেশের দিকে চেয়ে বলে উঠলো–তুমি কী বলো তো? এখন এই রাত্তির বেলা এই সব কথা না বললে কি তোমার চলতো না? দেখছো মানুষটার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে–
সদানন্দ নয়নতারার কথায় কান না দিয়ে নিখিলেশের দিকে চেয়ে বললে–কেন চলে গেলুম জানেন? শুনতে চান?
নয়নতারা সদানন্দকে লক্ষ্য করে বললে–সে সব কথা ওকে বলতে হবে না–আবার তোমার জ্বর বাড়বে, আবার তুমি অসুখে পড়বে, সকালবেলা ডাক্তারবাবু এলে তখন আমাকেই বকাবকি শুরু করবেন, চলো তুমি তোমার ঘরে শোবে চলো–আমি তোমাকে শুইয়ে রেখে আসি–
নিখিলেশ বললে–কেন তুমি ওকে বলতে বাধা দিচ্ছ? যা বলতে চান উনি তা বলতে দাও না–
নয়নতারা বললে–উনি যা বলবেন তা আমি ভালো করেই জানি, আর বলতে হবে না–
নিখিলেশ বললে–কিন্তু তুমি জানলে কী হবে? আমি তো শুনি নি, আমাকে শুনতে দাও না–
নয়নতারা বলে উঠলো–না, তোমাকে শুনতে হবে না। তোমার সে-সব শুনে কী লাভ? আর তুমি শুনলেও তো তা বুঝতে পারবে না। তুমি যদি বুঝতে পারতে তাহলে আমার সঙ্গে আর এই রকম ব্যবহার করতে না–
–কেন, আমি তোমার সঙ্গে কী রকম ব্যবহার করেছি?
–তুমি আবার বলছো কী রকম ব্যবহার করেছ? বলতে তোমার লজ্জা করছে না?
নিখিলেশ বললে–কী রকম ব্যবহার করেছি বলো?
–বলবো সকলের সামনে?
–নিশ্চয়ই বলবে। আমি এমন কিছু করি না যার জন্যে আমাকে লজ্জা পেতে হবে।
–তা হলে কেন তুমি মদ খাও, বলো?
–মদ?
নয়নতারা বললে–হ্যাঁ, মদ। তুমি নিজে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে রোজ বাড়ি ফের আর অন্য লোককে দোষ দিচ্ছ বউকে ফেলে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্যে। তোমার লজ্জা করে না কথা বলতে! মদ খেয়ে বাড়ীতে আসাটা বুঝি দোষের নয়? আর বউকে বাড়িতে ফেলে চলে যাওয়াটাই বুঝি দোষের?
নিখিলেশ ধমকে উঠলো। বললে–তুমি থামো!
নয়নতারা গর্জে উঠলো। বললে–কেন থামবো? যখন কথাটা উঠেছে তখন ভালো করেই কথাটা উঠুক। কথাটা চিরকালের মত পরিষ্কার হয়ে যাক। আমি কত কষ্ট করে টাকা জমাতুম ভবিষ্যতের জন্যে, আর তুমি সেই টাকা কিনা মদ খেয়ে নষ্ট করে দেবে?
নিখিলেশ এবার উত্তেজিত হয়ে উঠলো। বললো–বাজে কথা বোল না, তুমি ভালো করেই জানো কেন আমি মদ খাওয়া ধরেছি–তুমি যদি নিজের হার বাঁধা না দিতে তো আমি কি কোনও দিন মদ খেতুম? এর আগে কি কোনও দিন মদ খেয়েছি? আগে তো প্রত্যেক দিন অফিস থেকে তোমাকে নিয়ে একসঙ্গে বাড়ি ফিরেছি–তখন তুমি কোনও দিন আমাকে মদ খেতে দেখেছিলে?
নয়নতারা বললে–তা আমার হার কি আমি নিজের জন্যে বাঁধা রেখেছি? বাড়িতে কারো অসুখ হলে মানুষ কী করে? টাকা ধার করে না?
–কিন্তু আমাকে তুমি সে কথা কিছু জানিয়েছিলে? আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে?
নয়নতারা বললে–কেন তোমাকে জানাতে যাবো? তোমাকে জানালে কি তুমি রাজি হতে? টাকা খরচ হবে বলে তুমিই তো এঁকে হাসপাতালে পাঠাবার জন্যে পীড়াপীড়ি করেছিলে। কেন, এঁর জন্যে টাকা খরচ হলে তোমার এত রাগ হয় কেন? ইনি কি এখানে থাকতে এসেছেন মনে করো?
নিখিলেশ রেগে গেল এবার। বললে–আবার বাজে কথা বলছো তুমি? আমি কখনও কি বলেছি যে সদানন্দবাবু এখানে থাকতে এসেছেন?
নয়নতারা বললে–কিন্তু তুমি তো তাই-ই মনে করেছিলে।
নিখিলেশ বললে–তোমার নিজের মনের মধ্যেই এই পাপ রয়েছে তাই তুমি অমন কথা বলতে পারলে!
