নয়নতারা একবার সদানন্দর মুখের দিকে তাকাল, তারপর আর একবার নিখিলেশের মুখের দিকে। কিন্তু নিখিলেশ তখন অপরাধীর মতন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নয়নতারা সদানন্দর দিকে চেয়ে বললে–চলো, চলো যা বলবার আছে তুমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে বলবে চলো–
সদানন্দ সে কথায় কান না দিয়ে নিখিলেশের দিকে চেয়ে বললে–আপনি ক্ষমা না করলে আমি এখান থেকে চলে যেতে পারবো না নিখিলেশবাবু। বলুন আপনি আমাকে ক্ষমা করেছেন!
এতক্ষণে নিখিলেশের মুখ দিয়ে কথা বেরোতে পারলো। বললে–আপনি কী দোষ করেছেন যে আপনাকে ক্ষমা করতে যাবো?
–কী দোষ করেছি? তার চেয়ে জিজ্ঞেস করুন কী দোষ করিনি? নয়নতারা যে আজকে আপনার সঙ্গে এই খারাপ ব্যবহার করছে এ আমারই দোষ, নয়নতারা যে আপনাকে লুকিয়ে আমার চিকিৎসার জন্যে হার বাঁধা দিয়েছে সেও আমারই দোষ। এই আজ যে আমার জন্যে আপনাদের সংসারে এই অশান্তি হচ্ছে এও আমারই দোষ। আমি সব টের পেয়েছি নিখিলেশবাবু। কিন্তু কী করবো বলুন? সব দোষ ঘটে গেছে আমার অজ্ঞাতে। বিশ্বাস করুন, আমি সকলের ভালো করতেই চেয়েছিলুম। আমি যে একদিন নয়নতারাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলুম তাও নয়নতারার ভালোর জন্যেই, বিশ্বাস করুন, সে সব-কিছুই নয়নতারারই ভালোর জন্যে–
নিখিলেশ গম্ভীর গলায় বললে–অত ভালো করার চেষ্টা সেদিন না করলেই হয়তো ভালো করতেন সদানন্দবাবু, তা হলে আর আমাদের কপালে এই দুর্দশা হতো না–
–দুর্দশা!
নিখিলেশ বললে–হ্যাঁ, দুর্দশা না তো কী? নয়নতারার শ্বশুর যেদিন ওর সতীত্ব নাশ করতে ওর শোবার ঘরে ঢুকেছিল, তখন কোথায় ছিল আপনার এই ভালো করবার চেষ্টা? যেদিন কেষ্টনগরে নয়নতারার বাবা মেয়ের এই অবস্থা দেখে স্ট্রোক হয়ে হঠাৎ মারা গেলেন, তখনই বা কোথায় ছিল আপনার এই ভালো করবার চেষ্টা?
নয়নতারা নিখিলেশের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললে–ওগো তুমি কীসব যা-তা বলছো? দেখছো রুগী মানুষ, সবে অসুখ থেকে উঠেছে এখনও ভালো করে সারেনি–
নিখিলেশ নয়নতারাকে ধমক দিয়ে উঠলো! বললে–তুমি থামো, একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন লোক, যে নিজের স্ত্রীকে অপমানের হাত থেকে বাঁচাতে পারে না, যে নিজের স্ত্রীকে ওই রকম বদমায়েশ শ্বশুর-শাশুড়ীর হাতে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় তার হয়ে তুমি ওকালতি করতে এসো না।
সদানন্দ বললে–না নিখিলেশবাবু, আপনি ভুল করছেন, আমি নয়নতারাকে কারো হাতে ফেলে রেখে পালাইনি, বরং চরম অপমানের হাত থেকেই নয়নতারাকে বাঁচিয়েছি–
–এই বুঝি আপনার নয়নতারাকে বাঁচাবার নমুনা?
–বাঁচানো আপনি কাকে বলেন? যারা বাইরে মানুষের চেহারা নিয়ে ঘোরাফেরা করে, আর ভেতরে পশুর মতন প্রকৃতি তাদের স্বরূপ চিনতে সুযোগ দেওয়া কি বাঁচানো নয়?
নিখিলেশ বললে–নিজের বাবা-মা’র সম্বন্ধে যদি এই-আপনার ধারণা তা হলে নয়নতারার মত মেয়েকে বউ করে কেন নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন?
সদানন্দ বললে–আপনি সব কথা জানেন না, তাই অমন কথা বলছেন। আমি তাদের চিনতে পেরেছিলাম বলেই বিয়ের দিন আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলুম, হিন্দু বাঙালীদের বিয়েতে যে-নিয়ম মানা হয় আমার বিয়েতে তাও মানা হয়নি, নয়নতারার হয়ত মনে আছে নিয়মমত আমার গায়ে-হলুদও হয়নি।
নয়নতারা নিখিলেশের সামনে গিয়ে আবার মিনতি করতে লাগলো। বললে–ওগো, যা হয়ে গেছে তা নিয়ে কেন তুমি আর পুরোন কাসুন্দি ঘাঁটছো?
তারপর সদানন্দর সামনে গিয়েও বলতে লাগলো–তুমি সবে একটু সেরে উঠেছ, এখন মাথা গরম কোর না, ওঁর কথা শুনো না তুমি। তুমি তোমার ঘরে চলো–
সদানন্দ বললে–কিন্তু আর যদি কখনও তোমার সঙ্গে দেখা না হয় তাহলে আমার কথাগুলো কবে বলবো? কবে আর এমন সুযোগ পাবো? কবে আমি আবার নিখিলেশবাবুর কাছে ক্ষমা চাইবো?
নিখিলেশ বলে উঠলো–আপনি নয়নতারার যা করেছেন তা তো করছেই, কিন্তু আমার যা ক্ষতি করেছেন, তার জন্যে আপনার ক্ষমা চাইবার অধিকার নেই–
নয়নতারা নিখিলেশকে ধমক দিলে। বললে–তুমি আবার ওই রকম করে কথা বলছো? রুগী মানুষের সঙ্গে কী রকম করে কথা বলতে হয় তাও তুমি জানো না? কাল সকালবেলাও তো ওকথাগুলো বলতে পারতে?
সদানন্দ বললে–না, কাল সকাল পর্যন্ত আমি আর থাকতে পারবো না, যা বলবার যা শোনবার তা আজকের মধ্যেই বলতে আর শুনতে হবে–
নিখিলেশ বললে–কাল সকাল পর্যন্ত আপনাকে আমি আর থাকতে দেবও না, আপনি এ বাড়ি ছেড়ে আজকে এখনি চলে যান–
–কি বলছ তুমি?
নয়নতারা নিখিলেশের একেবারে মুখের সামনাসামনি গিয়ে দাঁড়ালো। আবার বললে– তুমি যা-তা বলছো কেন? এই শরীরে উনি কোথায় যাবেন?
নিখিলেশ বলে উঠলো–সে যেখানে ওঁর খুশী সেখানে চলে যান, আমাদের বাড়িতে ওঁকে আর থাকতে হবে না, এখানে আমি আর থাকতে দেব না ওঁকে–
নয়নতারা বেঁকে দাঁড়ালো। বললে–না, উনি এখানে থাকবেন।
নিখিলেশ নয়নতারার কথায় প্রথমে একটু হতবাক হয়ে গেল। এমনভাবে নয়নতারা তার কথার প্রতিবাদ করবে তা সে ভাবতে পারেনি। কিন্তু সে এক মুহূর্তের জন্যে তারপরেই সে বলে উঠলো–না, তুমি থাকতে বললেও আমি ওঁকে থাকতে দেব না।
নয়নতারা বললে–তুমি কি পাগল হয়ে গেলে নাকি? তুমি নিজেই বুঝতে পারছে না তুমি কি বলছ। এত রাত্তিরে কেউ বাড়ির বাইরে যায়? আর উনি যাবেনই বা কোথায়?
