সদানন্দ সেই বিছানার ওপর শুয়ে শুয়েই অনেকক্ষণ ধরে ছটফট করতে লাগলো। এই কয়েক ঘণ্টা আগেই তো এবাড়ি থেকে সে চলে যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছিল, কিন্তু কেন সে তখন ধরা পড়ে গেল! দরজার খিলটা খুলে সে তো নিঃশব্দেই চলে যেতে চেয়েছিল। এমনভাবে চলে যেতে চেয়েছিল যাতে কেউ টের না পায়। কিন্তু কেন সে চলে যেতে পারলে না? কেন ধরা পড়ে গেল সকলের চোখে? কেন অমন করে তার মাথাটা ঘুরে গেল?
পাশের ঘরে হঠাৎ আবার নিখিলেশবাবুর গলা শোনা গেল–না না না, কিছুতেই–
নয়নতারা বোধ হয় তখন কাঁদছে। কেঁদে কেঁদে গলাটা বোধ হয় তার তখন ভারি হয়ে গেছে। ভারি গলাতেই সে বলে উঠলো–ওগো তোমার দুটি পায়ে পড়ি, এমন করে আর চেঁচিও না তুমি–
নিখিলেশ বললে–কেন চেঁচাবো না? আমার নিজের বাড়িতে আমি যা ইচ্ছে তাই করবো, আমি চেঁচাবো, গান গাইবো, হাসবো, কাঁদবো, তাতে কার কী বলবার আছে?
নয়নতারা বললে–তুমি এত রেগে যাচ্ছে কেন? আগে তো তোমার এত রাগ ছিল না–
নিখিলেশ বললে–তুমি আজকে আমার রাগটাই দেখলে, কিন্তু একবারও তো তুমি তোমার নিজের দোষটা দেখলে না–
–আমি তো বলছি দোষ করেছি, এবার হলো তো? এবার তোমার রাগ থামাও–
–তুমি দোষ স্বীকার করলেই বুঝি তোমার সাতখুন মাপ হয়ে গেল? তাহলে তো মানুষ খুন করে দোষ স্বীকার করলেই সবাই রেহাই পেয়ে যেত!
নয়নতারা বললে–ওগো, ও সব তর্ক এখন থাক। ওই নিয়ে আমি এই রাত তিনটের সময় তর্ক করতে চাই না তোমার সঙ্গে–
–তা কেন করবে? তাতে যে তোমার নিজের মুখেই কালি লাগবে! কিন্তু এখন কী হলো? এখন তো তোমার অফিসের বন্ধুরাও জেনে গেল। আমি না হয় মুখ বন্ধ করে রইলুম, কিন্তু তোমার বন্ধুদের মুখ চাপা দেবে কী করে? তারা তো জেনে গেল তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কোথায় নেমে এসেছে–আর তার জন্যে কে দায়ী?
নয়নতারা বললে–দেখ, ওদের কথা তুমি বোল না, ওদের মন তোমার মত অত নীচ নয়–
–তার মানে?
–হ্যাঁ, তার মানে আমি যা বলেছি ঠিকই বলেছি। তোমার নিজের মনটা যেমন তুমি অন্য লোককেও সেইরকম মনে করো। একটা অসহায় অসুস্থ মানুষকে বাড়িতে এনে সেবা করেছি বলে তুমি আমাকে এমন যা-তা কথা শোনাবে!
নিখিলেশ বললে–কেন শোনাবো না? তোমার অফিসের বন্ধুদের জিজ্ঞেস কোর তো তারা কেউ নিজের স্বামী থাকতে বাইরের একটা উটকো মানুষের জন্যে লুকিয়ে লুকিয়ে সোনার হার বাঁধা দেয় কিনা–
নয়নতারা এবার ক্ষেপে উঠলো যেন। বললে–তুমি ওকে উটকো লোক বললে? সব জেনেশুনেও তোমার মুখে ওই কথা বেরোল? একটু ভদ্র ভাষা বলতেও তুমি শেখোনি?
–তুমি আমাকে ভদ্রতা শিখাতে এসো না। তাহলে একদিন যে তোমার সঙ্গে অভদ্র ব্যবহার করেছিল তার কাছে গিয়েই শুলে পারো, আমার কাছে এলে কেন? আমি কি তোমায় ডেকেছিলুম?
–তাহলে বেশ, তাই যদি তুমি চাও তাই-ই যাচ্ছি—
–হ্যাঁ যাও, আর জীবনে তাহলে আমার ঘরে কখনও এসো না
নয়নতারা বলে উঠলো–তাহলে এও বলে রাখছি, আমিও আমার হার বাধা দিয়েছি বেশ করেছি–
নিখিলেশও বলে উঠলো–তাহলে আমিও বলছি, আমিও মদ খেয়েছি বেশ করেছি। এখন দেখছি সেদিন তোমায় বিপদ থেকে উদ্ধার করবার জন্যে তোমাকে বিয়ে করাটাই আমার ভুল হয়েছিল–
–তাই যদি ভাবো তাহলে আমাকে ছেড়ে দাও না। এখন তো সে-পথও খোলা আছে। তাতে তুমিও বাঁচো আমিও বাঁচি–
–তা তো এখন বলবেই, এখন তোমার চাকরি হয়ে গেছে কিনা, এখন আর আমার পরোয়া করবে কেন? তোমার পাকা চাকরি, মোটা মাইনে পাচ্ছো, পেনসন পাবে রিটায়ার করলে, এখন আর আমার কথা মনে থাকবে কেন? মেয়েমানুষ জাতটাই এইরকম নেমকহারাম–আগে জানলে…
–চুপ করো, স্কাউন্ড্রেল কোথাকার, তোমার মুখ দেখতেও আমার ঘেন্না হয়।
নিখিলেশ রাগের মাথায় আরো কী বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই সামনে যেন ভূত দেখে দুজনেই চমকে উঠেছে। সদানন্দ তাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। একেবারে সশরীরে।
একটা মুহূর্ত শুধু নিজেকে সামলে নিতে নয়নতারার সময় লাগলো। কিন্তু তারপর একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গেছে সে। বললে–এ কি, তুমি?
সদানন্দ দরজার দুটো চৌকাট ধরে কোনও রকমে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
বললে–হ্যাঁ আমি–
–কিন্তু তুমি তো ঘুমোচ্ছিলে! আমি তো তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এ-ঘরে এসেছি। তুমি আবার জাগলে কখন?
সদানন্দ বললে–আমি এতক্ষণ জেগেই ছিলুম। কিন্তু আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারলুম না। আমি একটা কথা বলতে এসেছি শুধু–
নয়নতারা তখন পাগলের মতন অবস্থা। বললে–তা কথা বলার যদি দরকার ছিল তো আমাকে তুমি ডাকলেই পারতে। তুমি নিজে আসতে গেলে কী বলে? তোমার যে শরীর খারাপ! তুমি যদি অন্ধকারে মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে কী সব্বোনাশ হতো বলে দিকিনি। এখুনি চলো চলো তোমাকে শুইয়ে রেখে আসি–
বলে নয়নতারা সদানন্দর হাতটা ধরতে গেল।
সদানন্দ বললে–না, থাক–তার দরকার হবে না—
নয়নতারা সদানন্দর কথায় কান না দিয়ে সদানন্দকে ধরলে। কিন্তু সদানন্দ নয়নতারার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নিখিলেশের দিকে চেয়ে বললে–নিখিলেশবাবু, আপনার কাছে আমি ক্ষমা চাইছি–
ঘটনার আকস্মিকতার ঘোর তখনো হয়ত কাটেনি নিখিলেশের। এক মুহূর্ত কোনও জবাব দিতে পারলে না সে।
সদানন্দ আবার বললে–জানি আপনি আমায় ক্ষমা করবেন না, তবু আপনার কাছে আমার ক্ষমা চাওয়া কর্তব্য মনে করেই আমি ক্ষমা চাইছি–আমায় ক্ষমা করবেন তো?
