আর উঠোনে দাঁড়িয়ে মালা, নিখিলেশ, গিরিবালা সেই দৃশ্য দেখতে লাগলো।
.
তারপর পৃথিবীর আর সব বাড়ির মত এ বাড়িতেও রাত নেমে এলো। রাত নেমে এলো নৈহাটিতে। রাত নেমে এল নবাবগঞ্জে। রাত নেমে এল বউবাজারের সমরজিৎবাবুর বাড়িতে আর নেমে এল বড় বাজারের দাতব্য ধর্মশালায়। এ রাত পৃথিবীতে আগেও অনেকবার নেমে এসেছে, কিন্তু নৈহাটির এই বোসপাড়ার বাড়িতে বুঝি আগে কখনও এমন করে রাত নেমে আসেনি।
ক্লান্তিতে, দুর্বলতায়, অবসাদে সদানন্দ অনেকক্ষণ তার নিজের বিছানার ওপর আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে ছিল। কিন্তু খানিক পরেই কাদের কথাবার্তার শব্দে তার আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল। পাশে ঘর থেকেই কথাগুলো আসছিল। মনে হলো পাশের ঘরে স্বামী-স্ত্রীতে তখন তুমুল ঝগড়া বেধে গেছে।
নিখিলেশের গলারই তেজটা বেশি। সে বলছে–কেন, আমি কি তোমার জন্যে কিছুই করিনি? সেদিনের কথা মনে করে দেখ তো, যেদিন তুমি শ্বশুরবাড়ি থেকে কাঁদতে কাঁদতে কেষ্টনগরে এলে, মাথার সিঁদুর মুছে ফেলে বাবার কাছে এসে দাঁড়ালে, সেদিন কোথায় ছিল এই সদানন্দবাবু? সেদিন তো তার কোনও পাত্তা ছিল না। তোমার বুড়ো শ্বশুর যখন রাত্তিরে শোবার ঘরে ঢুকে তোমার সতীত্ব নষ্ট করতে চেয়েছিল তখনই বা কোথায় ছিল এই সদানন্দ? আমি সেদিন তোমাকে যদি না বাঁচাতুম তো কে তোমাকে বাঁচাত শুনি? আমি যে সারাদিন অফিসে গাধার খাটুনির পর রাত জেগে তোমাকে পড়িয়েছি তোমাকে হায়ার সেকেণ্ডারি পাস করিয়েছি, তারপরে কত লোককে খোশামোদ করে কত লোকের পায়ে তেল দিয়ে তোমাকে গভর্ণমেন্ট সারভিস করে দিয়েছি, সে-সব তুমি একেবারে ভুলে গেলে?
নয়নতারা গলা শোনা গেল এবার। সে বললে–ওগো, তুমি চুপ করো এবার, ও-ঘর থেকে ও যদি শুনতে পায় তো সর্বনাশ হবে–
নিখিলেশ এবার আরো গলা চড়িয়ে দিলে। বললে–হোক, সর্বনাশ হোক, আমি কাউকে ভয় করি নাকি? আমি তো জ্ঞানত কোনও অন্যায় করিনি যে কাউকে আমি ভয় করতে যাবো–
নয়নতারা বললে–কিন্তু তুমি মদ খাওনি? তুমি মদ খাওয়া ধরলে কেন আগে তাই বলো? কার ওপর রাগ করে তুমি ওই বিষটা খেতে গেলে?
–খেয়েছি বেশ করেছি। আমার ভালো-মন্দ দেখবার যখন কেউ নেই, তখন আমি মদ খাবো না তো কী করবো? আমি তো রোজ মদ খাই–
–সে কী? তুমি রোজ খাও?
–হ্যাঁ খাই, রোজ খাই, আজকেও খেয়েছি। কিন্তু কেন খাবো না বলতে পারো?
–কিন্তু ও-সব ছাইপাঁশ খেলে কি তুমি বাঁচবে? ওগুলো খাওয়া কি ভালো? ও খেলে তো শুনেছি শরীর খারাপ হয়, পক্ষাঘাত হয়, আরো কত কী হয়–
–তা আমার পক্ষাঘাত হলে কার কী? পক্ষাঘাত হলে আমার হবে, তাতে অন্য কারো তো কিছু ক্ষতি হবে না।
নয়নতারা বললে–ওকথা বলো না গো, ওকথা বললে আমার মনে বড় কষ্ট হয়, তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে বলো। লোকের বাবা থাকে, মা থাকে, মাসি-খুড়ি-জেঠি ভাই-বোন কত কী থাকে, আমার কি সে-সব কেউ আছে? তুমি অমন রাগ করলে আমি কী নিয়ে থাকবো বলো, কার মুখের দিকে চেয়ে কোন্ ভরসায় আমি থাকবো বলো?
–কেন, তোমার তো সব আছে। তোমার তো কোনও ভাবনা নেই–
–সে কী, তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে?
–কেন, ও-ঘরে তোমার সদানন্দবাবু আছে—
নয়নতারা চমকে উঠলো। যেন কোনও অমঙ্গলের কথা তার কানে গেছে। বললে–ছিঃ, তুমি কি বলো তো, তোমার মুখে কি কোনও কথা আটকায় না!
–কেন আটকাবে? আমি তোমাকে যে দশভরি সোনার হার করিয়ে দিয়েছিলুম, সে হার তুমি সদানন্দবাবুর রোগ সারাবার জন্যে চারশো টাকায় বাঁধা রাখোনি?
ওদিক থেকে নয়নতারার আর কোন জবাব শোনা গেল না।
নিখিলেশ বললে–কী হলো, কথার জবার দিচ্ছ না যে? বলো, জবাব দাও–আমি কি সাধ করে মদ খাই? সদানন্দবাবুর জন্যে তোমার লুকিয়ে হার বাঁধা দেওয়াতে দোষ হলো না, আর আমার মদ খাওয়াতেই বুঝি যত দোষ হলো, না?
সদানন্দ বিছানায় শুয়ে শুয়ে কান পেতে সব শুনছিল। ও-ঘর থেকে থেকে স্পষ্ট তার কানে আসছিল কথাগুলো। কিন্তু নিখিলেশের কথার জবাবে নয়নতারার কোনও গলার আওয়াজ আর পাওয়া গেল না–
কিন্তু সদানন্দ যে ঘরের ভেতরে শুয়ে শুয়ে কী করবে তা সে বুঝতে পারলে না। কথাগুলো যত তার কানে আসছিল ততই তার নিজের ওপরেই ধিক্কার জন্মাচ্ছিল। চারদিকে গভীর নিশুতি। শুধু মাঝে মাঝে দূরের রেল স্টেশনের ইয়ার্ড থেকে ট্রেনের হুইস-এর শব্দ আসছে। নৈহাটি। এত জায়গা থাকতে সে কিনা এই নৈহাটিতে এসে আশ্রয় পেলে! কলকাতা যাতায়াতের পথে কতবার সে এখান দিয়ে ট্রেনে করে গেছে। কিন্তু তখনও কি একবারও ভেবেছে যে, একদিন সেই নৈহাটিতেই তাকে নামতে হবে, কিংবা এই নৈহাটিতেই নয়নতারা তার সংসার পাতবে, এই নৈহাটিতেই সে অসুস্থ হয়ে পড়বে আর নয়নতারা এমন করে তাকে তার নিজের বাড়িতে তুলে এনে তার নিজেরই জীবনে বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে।
বিছানার মাথায় দিকে একটা অল্প-পাওয়ারের বাতি জ্বলছে। সদানন্দর মনে হলো সেখান থেকেই শুয়ে শুয়ে সে চিৎকার করে ওদের ডাকে। চিৎকার করে ওদের ডেকে বলে– ওগো, তোমাদের সংসারে এসে আমি অশান্তির কারণ হয়ে উঠেছি, এবার আমাকে তোমরা তোমাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দাও, আমাকে তোমরা তোমাদের বাড়ি থেকে চলে যেতে বলো, তাতে আমি বাঁচি আর না বাঁচি তোমরা অন্তত এই অশান্তি আর অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকে বাঁচো–
