নয়নতারা বললে–এইবার মনে হচ্ছে যেতে পারবো, এখন ও-ঘরে উনি একটু ভালোর দিকে যাচ্ছেন, আজ তো আমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলেছেন–
মালা কী বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই বাইরে দুম করে কী একটা শব্দ হলো। কিছু একটা ভারি জিনিস যেন কাছেই কোথাও পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে নয়নতারা সচকিত হয়ে উঠলো। কী পড়লো! কোথায় পড়লো।
নয়নতারা তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে আসতেই দেখলে–সর্বনাশ!
সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠলো-গিরিবালা, ও গিরিবালা–কোথায় তুমি–
শব্দটা গিরিবালার কানেও গিয়েছিল। সে তখন রান্নাঘর পরিষ্কার করতে ব্যস্ত। দিদিমণি ডাকবার আগেই সে শব্দ শুনে উঠোনে বেরিয়ে এসেছে।
–ওমা এ কী?
মালাও দেখলে সদর দরজার ভেতরের দিকে উঠোনের ওপর একজন পুরুষ মানুষ অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। এই মানুষটাই তো একটু আগে ঘরের মধ্যে শুয়ে ছিল। বাইরে কী করে এল?
কিন্তু নয়নতারার তখন আর জ্ঞান নেই। তাড়াতাড়ি মানুষটার মুখের কাছে মুখ নিচু করে দেখতে চাইলে সে বেঁচে আছে না অজ্ঞান হয়ে গেছে!
গিরিবালাকে বললে–গিরিবালা, শিগগির এক ঘটি জল নিয়ে এসো, এ কী সর্বনাশ হলো!
গিরিবালা ঘটি করে জল নিয়ে এসেছে তখনি। সদানন্দর মাথায় চোখমুখে জল দিতে দিতে নয়নতারা বললে–তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে বলো দিকিনি গিরিবালা, মানুষটা যে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে, তুমি একবার দেখতেও পাওনি? এখন কী হবে? আর সদর দরজাটাই বা অমন হাট করে খোলা কেন?
গিরিবালা অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। বললে–আমি তো দরজা খুলিনি দিদিমণি, এখন তো দেখছি খোলা রয়েছে–
নয়নতারা রেগে গেল। বললে–তুমি খুলবে না তো কে আবার দরজা খুলে রাখতে যাবে? আর রুগী মানুষ বিছানা থেকে উঠে এতখানি হেঁটে এসেছে, তুমি একবার দেখতেও পেলে না? অনেকদিন পরে মালা এসেছে, আমি তার সঙ্গে একটু ও-ঘরে গল্প করছি, আর এরই মধ্যেই এই কাণ্ড! আমি তো কোনও দিন ওঁকে একলা ছেড়ে উঠি না, আজ একটু ও-ঘরে গেছি, আর তুমি ওঁর পাশে একটু বসতে পারলে না? আমি যে কাজটা দেখবো না সেই কাজটাতেই কি গাফিলতি! আমি একলা ক’দিক দেখবো বলো তো? রান্নাঘরটা পরে ধুলে কী এমন ক্ষতি হতো শুনি?
গিরিবালা এর উত্তরে কী বলবে! মালাও যেন কেমন বিব্রত বোধ করতে লাগলো। সে এসেছিল একটু গল্প করতে। কিন্তু তার এই আসার ফলে যে সে নয়নদির সংসারে এত বড় একটা দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠবে তা সে কল্পণাও করতে পারেনি।
মালা বললে–কী হবে নয়নদি, আমার জন্যেই তো এই রকম হলো–
নয়নতারা বললে–তোর কী দোষ, গিরিবালাই তো যত কাণ্ড বাধালে! কেন, এখন রান্নাঘর না ধুলে চলতো না–
গিরিবালা বললে–সন্ধ্যে হয়ে গেল, তাই ভাবলুম–
–তুমি থামো, তোমাকে আর কথা বলতে হবে না–এখন তুমি ওদিকটা ধরো, আমি মাথার দিকটা ধরছি, ধরো, কোনও রকমে ঘরে নিয়ে চলো–
গিরিবালা নিচু হয়ে সদানন্দর নিচের দিকটা ধরলে। নয়নতারা সামনের দিকটা। সদানন্দর হাত দুটো দিয়ে নিজের গলাটা জড়িয়ে নিলে। তারপর গিরিবালাকে বললে–খুব সাবধান, সাবধানে তোল–
মালার নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছিল। সেও হাত লাগালে। সদানন্দর শরীরের মাঝখানটা ধরে একটু সাহায্য করবার চেষ্টা করলে।
ঠিক সেই সময়ে তিনজনেই অবাক হয়ে দেখলে খোলা সদর দরজার সামনেই এসে দাঁড়িয়েছে নিখিলেশ।
আর নিখিলেশ নিজেও অবাক। অফিস থেকে বাড়ি আসার আগে প্রতিদিন সে যা কল্পনা করে আজকে একটু আগে বাড়ি আসার সময় সেই দৃশ্য দেখবে বলেই সে কল্পনা করেছিল। ভেবেছিল বাড়ি গিয়ে দেখবে রোগীর সামনে বসে নয়নতারা মাথায় আইসব্যাগ দিচ্ছে মাথা টিপে দিচ্ছে। কিম্বা থার্মোমিটারে রোগীর জ্বর পরীক্ষা করছে। নয়তো রোগীর সামনে চেয়ারে বসে বসে একদৃষ্টে তাকে পাহারা দিচ্ছে। এইরকম একটা-না-একটা রোজই তাকে দেখতে হয়।
কিন্তু এ অন্যরকম। নিখিলেশ দেখলে সদানন্দর দুটো হাত নয়নতারার গলায় জড়ানো, আর নয়নতারা তাকে জড়িয়ে ধরে পাঁজাকোলা করে তোলবার চেষ্টা করছে। আর তার সামনে গিরিবালা, আর তার মাঝখানে আর একজন। নয়নতারার অফিসের বন্ধু। তাকেও চিনতে পারলে নিখিলেশ। এই মেয়েটাই অনেকবার গান শুনিয়ে গেছে তাদের।
ঠিক এই ঘটনার মধ্যে বাড়িতে ঢুকে পড়ে একজন অল্প-পরিচিত মহিলার সামনে নিখিলেশ যেন বিব্রত বোধ করলে।
নয়নতারা নিখিলেশকে দেখতে পেয়েই বলে উঠলো–ও, তুমি এসে গেছ? ভালোই হয়েছে, একটু এদিকটা ধরো তো গো–
নিখিলেশের সমস্ত মন যেন একেবারে অসহ্য হয়ে উঠলো। কিন্তু এই অবস্থায় কোন রাগ প্রকাশ করা শোভা পায় না। তার শিক্ষা-দীক্ষায়-ভদ্রতায় বাধে। অথচ মানুষের ধৈর্যেরও তো একটা সীমা আছে! নিখিলেশ জামার হাত দুটো গুটিয়ে নয়নতারাকে সাহায্য করতে এগোচ্ছিল।
কিন্তু সদানন্দ ঠিক সেই সেই সময়েই তার চোখ দুটো খুললো। বললে–আমাকে ধরতে হবে না, আমি নিজেই উঠতে পারবো–
বলে অনেক কষ্টে সকলের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলে। তারপর আস্তে আস্তে সেখানেই উঠে দাঁড়ালো।
নয়নতারা সদানন্দর আত্মনির্ভরতার চেষ্টার ওপর আর ভরসা করতে পারলে না। সে সঙ্গে সঙ্গে তাকে দুই হাতে ধরে ফেলেছে। পাছে সে পড়ে যায়। তারপর বললে–চলো, ঘরের দিকে চলো–
চারদিকে তখন বেশ সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। ঝাপসা আলোয় সমস্ত কিছু অস্পষ্ট। নয়নতারা সদানন্দকে দুই হাত ধরে ধরে তাকে বারান্দায় ওঠালো। তারপরে ঘরের ভেতের নিয়ে গিয়ে তাকে বিছানার ওপর শুইয়ে দিলে।
