সদানন্দ বললে–কিন্তু সে তো কোনও দোষ করে নি মামা। তাকে যে দাদু মিছিমিছি মারলে। বংশী ঢালীকে দিয়ে বেকসুর অপমান করলে। সে তো কিছু করে নি
প্রকাশ মামা যেন সব ভেবে-চিন্তে একটা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে এসেছে। বললে–নাঃ, এবার জামাইবাবুকে তোর বিয়ের কথা বলতে হবে দেখছি।
–বিয়ে? বিয়ে আমি করবো না মামা।
–সে কী রে? তুই ঠাকুর্দার সবেধন নাতি, বাপের চোখের মণি একমাত্র ছেলে। বিয়ে করবি না? তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে? জানিস তোর মতন পাত্তোর পেলে মেয়ের বাপরা লুফে নেবে?
সদানন্দর ও-সব কথা ভালো লাগতো না। বিকেল বেলা যখন ইস্কুল থেকে হেঁটে-হেঁটে আসতো, এক-একদিন শীতের দিনে বাড়ি আসতে আসতে চারদিক অন্ধকার হয়ে আসতো। তখন মনে হতো কে যেন তার পেছনে-পেছনে আসছে। শুকনো পাতার ওপর হাঁটতে যেমন মড়মড় শব্দ হয় তেমনি শব্দ করতে করতে তার পিছু পিছু আসছে কেউ। অনেক দিন মনে হয়েছে গাঁয়েরই কোনও লোক ক্ষেত-খামার থেকে ফিরছে। কিংবা কোনও বাড়ির বউ গাঙ থেকে জল নিয়ে ফিরছে। না, তা নয়, অনেক সময় রাস্তার আশেপাশে-সামনে-পেছনে কাছে-দূরে কেউ-ই থাকে না, অথচ কে যেন তার পেছনে-পেছনে হাঁটে।
একদিন ধরে ফেলেছিল। লোকটা একেবারে আসতে আসতে তার গায়ে এসে পড়েছিল। সদানন্দ চমকে উঠেই চেঁচিয়ে উঠেছে–কে?
–আমি!
‘আমি’ কথাটা কেউ বললে কিনা বুঝতে পারলে না সে। কিংবা হয়ত তার নিজের মনের আতঙ্কটাই শব্দ হয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু সে এক মুহূর্ত। এক মুহূর্তের মধ্যে চোখের সামনে দিয়ে সে অদৃশ্য হয়ে গেল। কিন্তু সেই অদৃশ্য হওয়ার আগেই যেটুকু দেখতে পেলে তাতে মনে হলো সে আর কেউ নয়, সে হলো কপিল পায়রাপোড়া।
ঘটনাটা প্রকাশ মামাকে বলতেই প্রকাশ মামা আর দেরি করলে না। সোজা জামাইবাবুর কাছে চণ্ডীমণ্ডপে চলে গেল। বললে–জামাইবাবু, সদার বিয়ে দিতে হবে–
–বিয়ে! জামাইবাবু কথাটা শুনে প্রথমে অবাক হয়ে গিয়েছিল। দিদিও তেমনি। বিয়ে তো সদার দিতেই হবে। তা বলে এখনি? এত তাড়াতাড়ি?
প্রকাশ বললে–বিয়ে না দিলে তোমার ছেলে শেষকালে সন্নিসী হয়ে বনে চলে যাবে, তখন ঠ্যালা বুঝবে–
তা প্রকাশের কথায় কেউ কান দেয় নি। গরীবের কথায় প্রথমে কেউ কান দেয়ও না তেমন। তাই কথায় আছে গরীবের কথা বাসি হলে তবে লোকে তার দাম দেয়। শেষকালে কর্তাবাবু যখন কথাটা তুললেন তখন সকলের টনক নড়লো। আর কর্তাবাবুর তখন দুটো পা-ই পড়ে গেছে। একেবারে পঙ্গু। সিন্দুকটার কাছে শুয়ে শুয়েই দৈনন্দিন কাজকর্ম চালান। তার ইচ্ছে চোখ বোজবার আগে তিনি নাতির ছেলের মুখ দেখে যেতে চান। দেখে যেতে চান যে তার বংশের ধারা অক্ষয় হয়ে রইল।
কথাটা শালাবাবুর কানে যেতেই সে লাফিয়ে উঠেছে। দিদির টাকায় সে বসে বসে খায় আর তার বদলে একটু কিছু উপকারও করতে পারবে না? দিদির উপকার করবার সুযোগ পেয়ে সে যেন বেঁচে গেল।
বললে–কুছ পরোয়া নেই, কী রকম পাত্রী চাই সেইটে শুধু আমায় বলে দাও–
কর্তাবাবুর হুকুম পাত্রী হবে ডানা কাটা পরী। ডানা কাটা পরী মানে পরীর মতন দেখতে শুনতে বলতে কইতে হওয়া চাই, শুধু পরীদের যে ডানা থাকে সেটা থাকবে না।
–আর?
–আর পরীর মতন উড়লে চলবে না।
প্রকাশ বললে–তা ডানাই যদি না থাকে তো উড়বে কেমন করে? আর যদি উড়তে চায় তো তুমি না হয় তার পায়ে শেকল লাগিয়ে দিও।
দিদি হাসতে লাগলো। বললে–আজকালকার মেয়ে কি শেকল মানবে ভাই?
হয়ত শ্বশুর-শাশুড়ীকেই মানতে চাইবে না। এ তো আর আমাদের কাল নয়। আমাদের দশ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল, তখন কোমর থেকে কাপড়ের কষি খুলে যেত, শাশুড়ী তাই শেষকালে গেরো দিয়ে বেঁধে দিত তবে লজ্জা রক্ষে হতো–
প্রকাশ বললে–তাহলে সেই রকম দশ বছরের মেয়েই এনে দেব–তুমি যেমন অর্ডার দেবে, তেমনি বউ পাবে–
দিদি বললে–তাই দে ভাই, নইলে কর্তাবাবু আবার কবে আছেন কবে নেই, একটু শিগগির শিগগির কর তুই–
তা শেষ পর্যন্ত সেই রকম মেয়েই পাওয়া গেল। বয়েসও কম, দেখতেও ডানাকাটা পরী। আরও একটু বয়েস কম হলে অবশ্য ভালো হতো। কিন্তু ঠিক তোমার অর্ডার মাফিক পাত্রী কোথায় পাবো? তাহলে তো কুমোরকে ডেকে ফরমায়েশ করতে হয়। কৃষ্ণনগরের কাছে বাড়ি। বাপ পণ্ডিত। সংস্কৃত শাস্ত্র জানা মানুষ। স্বামী আর স্ত্রী, আর সংসার বলতে ওই একটি মেয়ে। সেকালে পূর্বপুরুষকে দেওয়া রাজাদের দু’শো বিঘের মত জমি-জমা আছে। মোটামুটি সচ্ছল পরিবার। নগদ কিছু দিতে পারবো না। যদি মেয়ে পছন্দ হয় তো রাঙা সুতো হাতে দিয়ে নিয়ে যান। তারপর মেয়ের ভাগ্য আর ঈশ্বরের ইচ্ছে।
এই-ই হলো নয়নতারা। এ গল্পের আসামী সদানন্দ চৌধুরীর স্ত্রী। আমাদের নায়িকা।
প্রকাশ রায় এই নতুন বিয়ের কনে নয়নতারাকে নিয়ে এই রাস্তা দিয়েই একদিন নবাবগঞ্জে এসেছিল। নবাবগঞ্জের জমিদার নরনারায়ণ চৌধুরীর বাড়ি যেতে গেলে এই বারোয়ারিতলার হাটের মধ্যে দিয়েই যেতে হয়। এই রাস্তা দিয়েই একদিন নয়নতারা চৌধুরীবাড়ির বউ হয়ে এসেছিল, আবার ঠিক সেই বধূ বেশেই এই রাস্তা দিয়েই চলে গিয়েছিল। এই রাস্তা দিয়েই একদিন সেকালের এক সামন্ততান্ত্রিক ভূস্বামী পরিবারে চূড়ান্ত সমৃদ্ধি এসে উদয় হয়েছিল, আবার নয়নতারার সঙ্গে সঙ্গে এই রাস্তা দিয়েই তা অস্ত গিয়েছিল চিরকালের মত। এই-ই সেই চিরকালের উদয়-অস্তের শাশ্বত পথ, সেই রেলবাজার থেকে নবাবগঞ্জের বারোয়ারিতলার হাট পর্যন্ত। এবার সেই ঘটনার কতকাল পরে প্রকাশ রায় আবার উদয় হলো এই নবাবগঞ্জে। মোবারকপুরে বাস থেকে নেমে পায়ে হাঁটা পথে। এখন আর আগেকার সেই মোবারকপুর নেই। সেই মোবারকপুর কেন, সেই নবাবগঞ্জও নেই। নবাবগঞ্জে চৌধুরীদের সেই বাড়িটাও আর চৌধুরীদের নেই। নরনারায়ণ, হরনারায়ণ, চৌধুরীবাড়ির গিন্নি, প্রকাশ রায়ের দিদি, তারাও কেউ নেই। একদিন রেলবাজারের পাটের আড়তদার প্রাণকৃষ্ণ শা’ মশাই জলের দরে অত বড় তিনমহলা বাড়িটা কিনে নিলে। কিন্তু প্রাণকৃষ্ণ শা’ও তা রাখতে পারলে না। ব্রাহ্মণের সম্পত্তি, বিশেষ করে বসতবাড়ি কিনতে নেই। এমন কি জলের দরে পেলেও না। কিন্তু প্রাণকৃষ্ণ শা’ মশাই সে-কথা শুনলে না। ভাবলে ভারি লাভ করলুম! কিন্তু এখন? সেই প্রাণকৃষ্ণ শা’ও একদিন জন্মাষ্টমীর দিন সাপের কামড়ে অপঘাতে মরলো। তার পর থেকে সেই চৌধুরীবাড়ি এখন ভুতের বাড়ি হয়ে খাঁ খাঁ করছে। দিনের বেলাতেও লোকে সেদিকে মাড়াতে ভয় পায়। বলে–ওবাড়িতে ব্রহ্মদত্যির অভিশাপ আছে, ওদিক মাড়িও না–
