–জানিস, এই ওঁর জন্যে অনেক টাকা খরচ হয়ে গেল।
–তাই নাকি? কত টাকা খরচ হলো সবসুদ্ধ?
–তা অনেক।
–নিখিলেশবাবুকে তো ভালো বলতে হবে নয়নদি। আমার কর্তা হলে তো রুগীকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিতেন।
নয়নতারা–কিন্তু ওঁকে তো খরচের কথা কিছু বলিনি। উনি কিছুই জানেন না। উনি মনে করেছেন বড় জোর শ’খানেক কি শ’দেড়েক টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু ভাই আজকাল ওষুধের কী গলাকাটা দাম হয়েছে! এক-একটা ইনজেকশানের অ্যামপিউলের দামই পঁচিশ টাকা তিরিশ টাকা করে। এক-একটা সামান্য ভিটামিনের বড়ি, তাও এক টাকা পাঁচ সিকে করে। তারপর ডাক্তারবাবু যতবার এসেছে ততবার আটটাকা করে ভিজিট দিতে হয়েছে– খরচ কী কম হলো? যে কটা টাকা আমার জমেছিল সব ওঁর অসুখেই চলে গেল–
–তা সবসুদ্ধ কত খরচ হলো?
নয়নতারা বললে–তুই যেন কাউকে বলসিনি ভাই, উনি শুনলে ক্ষেপে যাবেন। উনি জানে শ’খানেক শ’দেড়েক, কিন্তু আমার নিজের কাছে ছিল তিনশো টাকা, সেটা সব খরচ হয়ে গেল। তারপর আর টাকা নেই। তখন কী করি! শেষকালে ভাই আমার গলার হারটা স্যাকরার দোকানে বাঁধা দিয়ে চারশো টাকা নিয়ে এসেছি
মালা চমকে উঠেছে। বললে–সে কী? ওমা, কী চমৎকার ডিজাইনের হারটা গড়িয়েছিলে তুমি, সেটা পরলে তোমায় খুব মানাতো, তুমি কিনা সেইটে বাঁধা দিলে?
–চুপ কর ভাই, অত চেঁচাসনি, শেষকালে আমার ঝি আবার শুনতে পাবে। কথাটা এখনও কেউ জানে না, কাউকে বলিনি। দেখিস ভাই, অফিসে যেন কারো কানে না যায়–
সদানন্দ ঘরের বাইরের দিকে চেয়ে দেখলে। দরজা দিয়ে বাইরে উঠোনের একটা ফালি দেখা যায়। সেখানে কাউকে দেখতে পাওয়া গেল না। বোধ হয় পাশের ঘরে ছাড়া কেউ কোথাও নেই। না, এখানে আর এক মুহূর্ত তার থাকা উচিত নয়। আস্তে আস্তে সদানন্দ উঠতে চেষ্টা করলে। মাথা যেন ঘুরতে লাগলো তার। অনেক কষ্টে তক্তপোশের ওপর উঠে বসতে গিয়েই ঘেমে নেয়ে গেল। তারপর উঠে দাঁড়াতে গিয়ে সমস্ত শরীর ব্যথায় টনটন করে উঠলো।
কিন্তু সে-সব ভাবলে চলবে না। পরের সংসারে বিপর্যয় অধিকার নেই তার। সত্যিই নয়নতারা আজ তার কাছে পর। সদানন্দর নিজেরই লজ্জা করতে লাগলো। প্রথমে একটা হাত দিয়ে কোনও রকমে দেয়ালটা ধরলে সে। তারপর দেয়াল ধরে ধরে বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। কেউ কোথাও নেই। চারদিকে বেলা পড়ে এসেছে। মনে হলো সন্ধ্যে হবো হবো। সামনের উঠোনটা ফাঁকা। আর একটু পরে অন্ধকার হয়ে গেলে কিছুই দেখা যাবে না। সদানন্দ বারান্দায় দেয়াল ধরে ধরে বারান্দার সিঁড়ি দিয়ে উঠোনে নামবার চেষ্টা করলে। উঠোনের ডান দিকেই দরজা। দরজাটা খুলে বাইরে বেরোলেই রাস্তা! একবার রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে পারলে আর কোনও ভাবনা নেই। অনেকদিন নয়নতারাকে সে ভুগিয়েছে। অনেক কষ্ট তাকে দিয়েছে, অনেক টাকা তার খরচ হয়ে গেছে তার জন্যে। এবার তাকে মুক্তি দেবে সে। সত্যিই তো, সে যাকে স্ত্রীর মর্যাদা দেয়নি তার কাছ থেকে সেবা নেবার অধিকারও তার নেই। জীবন যাকে প্রবঞ্চনা করেছে, জীবনের কাছে তার আকাঙ্খা করবার কি কিছু থাকে! অথচ সেই জীবনকে সুন্দর করবার আকাঙ্খা নিয়েই তো সে একদিন গৃহত্যাগ করেছিল। সেদিন তো সে ভেবেছিল নিজের সকলকে পরিত্যাগ করলেই বাইরের সবাই তার নিজের হবে। সবাইকে আপন করবার ইচ্ছেতেই সে তো পথে বেরিয়ে পড়েছিল। এই কি সেই তার সকলকে নিজের করবার নমুনা! সবাইকে তো সে কেবল কষ্টই দিয়েছে, সকলেরই কাছে সে তো কেবল বোঝা হয়েই রয়েছে। একদিন সকলের বোঝা হবার ভয়ে সমরজিৎবাবু বাড়ি থেকেও সে এমনি করে নিঃশব্দে সরে এসেছিল। তারপর সেই পাঁড়েজী। ধর্মশালার পাঁড়েজীর কাছে সে বোঝা ছাড়া আর কিছুই নয়। তা মুখে সে যা-ই বলুক না কেন! নিজের সংসার ছারখার করেছে বলে পরের সংসার ছারখার করবার অধিকার তাকে কে দিলে? না, এখান থেকে যদি সে কোনও রকমে কলকাতায় পৌঁছোতে পারে তাহলে পাঁড়েজীর কাছেও আর গিয়ে দাঁড়াবে না। পাঁড়েজীকে গিয়ে বলবে না যে আমাকে আশ্রয় দাও। পৃথিবীর কাউকে সে বলবে না–তুমি আমার আশ্রয়স্থল! আর যদি কোথাও থাকতেই হয় তো আশ্রয়ের প্রতিদানে কিছু কাজ করে দেবে সে।
কিন্তু কী কাজই বা করতে পারে সে! তার কাছ থেকে লোকে কী-ই বা চাইবে? টাকা? টাকা তার কোথায়? অথচ আজ যদি এই বাড়ি থেকে চলে যাবার সময় কিছু টাকা সে দিয়ে যেতে পারতো, যদি বালিশের তলায় নয়নতারার সোনার হার বাঁধা রাখার চারশো টাকাও রেখে যেতে পারতো, তাহলেও সে নয়নতারার সংসারের কিছু সাশ্রয় করেছে বলে গর্ব বোধ করতে পারতো। কিন্তু তা নয়, সমরজিৎবাবুর বাড়িতে যেমন, পাঁড়েজীর ধর্মশালায় যেমন, এখানেও ঠিক তেমনি সে গলগ্রহ। অথচ গলগ্রহই যদি সে হবে তাহলে নবাবগঞ্জ কী দোষ করেছিল! নবাবগঞ্জে তার পৈতৃক অর্থের ভারবাহী হয়ে জীবন কাটানোটা কেন তার কাছে অত অসহ্য মনে হয়েছিল!
মালা বললে–আজ তাহলে আসি নয়নদি, কলকাতায় ফিরতে আবার রাত হয়ে যাবে, তিনি আবার আমার দেরি দেখে ভাববেন, নার্ভাস মানুষ তো
–কিন্তু আর একদিন আসিস ভাই, অনেকদিন পরে দেখা হলো, বেশ ভালো লাগলো—
মালা এবার সত্যিই উঠে দাঁড়ালো। বললে–তুমি অফিসে না যাওয়া পর্যন্ত আমাদের অফিসের আড্ডাটি জমছে না নয়নদি–
