–কে? অরুণা বোস?
–না, অরুণা পাল, চল্লিশ বছর বয়েস হয়ে গেছে, মনে নেই? ডেসপ্যাচ সেকশানের হেড-অ্যাসিসটেন্ট?
–হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি, তা তার কী হয়েছে?
–সেই অরুণাদি বিয়ে করছে!
নয়নতারা চমকে উঠলো।
বললে–ও মা, সে কী রে? সে তো বুড়ি হয়েছে, চুল পেকে গেছে যে তার।
মালা বললে–তা সে যেমন বুড়ি, তেমনি বুড়ো বরও তার জুটেছে। কার সঙ্গে তার বিয়ে হচ্ছে জানো?
–কার সঙ্গে?
–আমাদের বাজেট সেকশানের বড়বাবুর সঙ্গে–
নয়নতারা আরো অবাক হয়ে গেল। বাজেট সেকশানের বড়বাবু আর-ডি-চ্যাটার্জি, রসিকদাস চট্টোপাধ্যায়। আগে একটা বিয়ে হয়েছিল বড়বাবুর, কিন্তু সে বউ বিয়ের পরেই মারা গিয়েছিল, তারপর আর বিয়ে করেনি ভদ্রলোক।
নয়নতারা বললে–-সে তো বুড়ো থুত্থুড়ো রে, তার সঙ্গে অরুণাদির বিয়ে? সে তো রিটায়ার করবে শিগগির, তাকে কী দেখে পছন্দ হলো অরুণাদি’র? টাকা?
মালা বললে–তা ছাড়া আর কী বলবো বলো! রিটায়ার করে অনেক পেনসন পাবে তো, পেনসন কমিউট করে কয়েক হাজার টাকা পাবে, সেই টাকার লোভ–আর অরুণাদিরও তো আর কেউ নেই, শেষকালে বুড়ো বর রিটায়ার করে বাড়িতে বসে রান্না করে দেবে, আর অরুণাদি অফিস করবে, ঠাকুর-চাকরের খরচটা বেঁচে যাবে–
নয়নতারা বললে–তাহলে শুধু টাকা! টাকার জন্যেই এই বয়েসে বিয়ে করতে গেল অরুণাদি? কিন্তু এতদিনই যদি বিয়ে না করে থাকতে পেরে থাকে তো আর বাকি জীবনটা থাকতে পারলে না?
মালা বললে–আরো কত মজার খবর আছে অফিসের, তোমায় কী বলবো নয়নদি। তুমি ছিলে না, তোমাকে এই সব খবর দেবার জন্যেই তো আরো এলাম।
গিরিবালা ততক্ষণে চা করে নিয়ে ঘরে এসেছে। সঙ্গে আবার মিষ্টি।
–ও মা, এসব আবার আনলে কেন নয়নদি! এরকম করলে কিন্তু আর আমি আসবো তোমার কাছে, এই আমি উঠলুম।
বলে মালা উঠে দাঁড়ালো। নয়নতারা বললে–উঠছিস কেন, আমিও তো চা খাবো রে, আমারও তো চা খাওয়ার সময় হয়েছে, এই নে, খা–
মালা বসলো। তারপর চা খেতে খেতে বললে–এবার যাবো নয়নদি, তা তুমি তো বললে না কার অসুখ, ও ঘরে কে রয়েছে তা তো বললে না–
পাশের ঘরে শুয়ে সদানন্দর কানে এতক্ষণ সব কথাগুলো ভেসে আসছিল। সবে সেদিন সে একটু সুস্থ হয়েছে। নয়নতারা তাকে গরম জলে স্নান করিয়ে দিয়েছে। নয়নতারার গলাও শুনতে পাচ্ছিল সে, আর একজন মেয়ের গলাও শুনতে পাচ্ছিল। তার মনে হলো সে যেন সব বুঝতে পারছে। তার অবর্তমানে নয়নতারা নবাবগঞ্জ ছেড়ে কেন কেষ্টনগরে না গিয়ে এখানে এই নৈহাটিতে এসেছে তাও যেন বুঝতে পারছে।
কদিন থেকেই অল্প-অল্প একটা ধারণা হচ্ছিল তার। কিন্তু আজকে যেন আরো স্পষ্ট হলো জিনিসটা–
হঠাৎ মালা জিজ্ঞেস করলে-কবে তুমি অফিসে যাবে, নয়নদি? তোমার জন্যে যে আমরা সবাই হাঁ করে বসে আছি–
নয়নতারা বললে–আমি কী করে যাই তুই বল, এই রুগীকে তাহলে কে দেখবে?
–তা ওঁর নিজের লোক কেউ নেই? ওঁর বিয়ে হয়নি? স্ত্রী ছেলে মেয়ে তাঁরা কোথায়?
–তারা নেই
মালা বললে–ও মা, কেউ নেই? তা তুমিই বা এত ঝক্কি ঘাড়ে নিতে গেলে কেন?
নয়নতারা বললে–সবাই তো তাই-ই বলে।
মালা বললে–তা বলবেই তো। তোমাদের তো ঝাড়া হাত পা। আপনি আর কোপনি! তুমি এসব পরের ঝঞ্ঝাট ঘাড়ে নিতে গেলে কেন নয়নদি–তোমাকে দেখে তো তাই অফিস-সুদ্ধু মেয়ে সবাই আমরা হিংসে করতুম।
সদানন্দর কেমন খারাপ লাগলো কথাগুলো শুনতে। তবে কি সে এবাড়িতে অবাঞ্ছিত। নয়নতারা তো আবার বিয়ে করেছে। বিয়ে করে সুখেই আছে। চাকরি করছে অফিসে। অফিসে যায়নি বলে অফিসের বন্ধুরা তার বাড়িতে পর্যন্ত খোঁজ নিতে এসেছে। এই অবস্থায় কেন সে এখানে আসতে গেল? কেন নয়নতারা তাকে বাড়িতে এনে তুললে? আর তুললোই যদি তাহলে সে জেনেশুনে কেন এখানে থাকবে? সে এখান থেকে চলে গেলেই তো আবার ওদের সংসারে শান্তি ফিরে আসে।
চারদিকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলো সদানন্দ। এই ঘর, দেয়ালের গায়ে ঠেসান দেওয়া একটা আলমারি। তাতে কয়েকটা পুতুল। ঘরের মধ্যে দু’চারটে চেয়ার। আর একদিকে দেয়ালের তাকে ওষুধের শিশি জড়ো করা। কত ওষুধ খেয়েছে সে! তার অসুখের জন্যে কত টাকা খরচ হয়ে গেছে এদের!
–নিখিলেশবাবু কেমন আছেন রে!
–ওঁর কথা আর বলিসনি তুই, আমার ওপর ভীষণ রেগে গেছে জানিস?
–কেন?
–ওই যে আমি অফিসে যাচ্ছি না। অফিসে যাচ্ছি না বলে আমার মাইনে কাটা যাচ্ছে। সেই জন্যে রাগ। টাকার লোকসান হচ্ছে বলে ওঁর যত রাগ। এ ক’দিন আমার সঙ্গে ভালো করে কথাই বলছে না ভাই।
–তা নিখিলেশবাবুর দোষ কী নয়নদি, যে-কোনও স্বামীই তাই করতো। এতগুলো টাকা লোকসান কি মুখের কথা! সে-টাকায় কতগুলো শাড়ি হয়ে যেত বলো তো?
নয়নতারা বললে–দূর, একজনের জীবনের চেয়ে কি শাড়িই বড় হলো নাকি?
–তা তো বুঝলুম, কিন্তু উনি তো তোমার নিজের কেউ নন। নিজের স্বামী হলে অবশ্য অন্য কথা ছিল, কিন্তু উনি তো পর, মানে নিজের ছেলে-মেয়ে-স্বামী-ছাড়া মেয়েমানুষের কাছে আর সবাই-ই তো পর, বলো?
সদানন্দ আর থাকতে পারলে না। হ্যাঁ, সে তো পরই বটে। হাজারবার পর। এখন নয়নতারার কাছে সে আর নিজের লোক নয়। নিখিলেশবাবুকে বিয়ে করার পর থেকে সদানন্দ নয়নতারার চিরকালের মত পর হয়ে গেছে। সত্যিই তো, ওই মহিলা তো অন্যায় কথা কিছুই বলেনি। আজকের মানুষের কাছে পাড়া-প্রতিবেশী-আত্মীয়-স্বজন বন্ধু বান্ধব বাবা-মা-শ্বশুর-শাশুড়ী সবাই-ই পর বই-কি। নিজের বলতে তো শুধু নিজের স্বামী, নিজের ছেলে-মেয়ে এই সব। এ ছাড়া তো আর কেউ নিজের নয়। তাহলে কেন সে এখানে থাকবে! সে এখানে থাকবে কেন? সে এখানে আছে বলেই তো নয়নতারা অফিসে যেতে পারছে না। তার জন্যেই নয়নতারার অফিসে মাইনে কাটা যাচ্ছে! যে-কোনও স্বামীই তো এতে স্ত্রীর ওপর রাগ করবে।
