শাশুড়ী অনেক দিন বলেছে–দেখো বউমা, আমার খোকাকে তুমি যা ভাবছো ও তা নয়, ওর মত মায়া-দয়ার শরীর হয় না, সকলের জন্যে ওর মায়া, সকলের দুঃখে ও দুঃখ পায়, কেউ ওর পর নয়, সবাই ওর কাছে আপন–
আরো বলতো–শুধু অন্য সকলের থেকে একটু আলাদা, এই যা। পাড়ার আর দশজন ছেলেদের থেকে আলাদা। দেখছো না সবাই রারোয়ারিতলায় যাত্রা-থিয়েটার-কবিগান নিয়ে মেতে আছে, ও সেদিকে নেই, কোথায় মাঠে-ঘাটে-ক্ষেতে-খামারে এক-একলা ঘুরে বেড়ায়। ছোটবেলায় প্রহ্লাদ চরিত্র যাত্রাগান হচ্ছে বার বাড়িতে, আমার কাছে বসে ও গান শুনছে, শুনতে শুনতে ও অজ্ঞান হয়ে গেছে। আমার তো তখন থেকেই ভয় হতো ও ছেলে বড় হলে সন্নিসী না হয়ে যায় না–
তখন সদানন্দকে নয়নতারা অতটা ভালো করে চেনেনি। মনে হয়েছিল সে বলে–তা ছোটবেলা থেকেই যদি আপনার ছেলের সেই রকম মতিগতি তো সে ছেলের বিয়ে দিলেন কেন? তেমন ছেলের তো বিয়ে দেওয়া উচিত হয়নি আপনার–
কিন্তু শাশুড়ীর সামনে সেদিন নয়নতারা মুখ ফুটে এ-কথা বলতে পারেনি। শুধু মনে মনে শ্বশুর-শাশুড়ীর ওপরই রাগ হয়েছিল তার। শাশুড়ী যত তার ছেলের গুণগান করতে তত তার রাগ হয়ে যেত শ্বশুর-শাশুড়ীর ওপর।
নয়নতারার মুখটা গম্ভীর হতে দেখলেই শাশুড়ী ছেলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠত। বলতো–এখন বউমা তুমি খোকাকে ওই রকম দেখছো বটে, কিন্ত ওর আর একটু বয়েস হোক, তোমার কোলে একটা খোকা আসুক, তখন দেখবে তোমার ঘর থেকে ও আর নড়তে চাইবে না, পুরুষমানুষের তো স্বভাবই এই, তোমার শ্বশুরকেও তো দেখেছি বউমা, সবাই-ই ওই রকম–
কিন্তু যত দিন যেতে লাগলো ততই যেন মানুষটার স্বভাব আরো তীক্ষ্ম, আরো কঠোর হয়ে উঠতে লাগলো। তখন মানুষটার দিকে চেয়ে দেখতেও তার ভয় করতো।
আর আশ্চর্য সেই শাশুড়ী। সেই শাশুড়ীই যে আবার একদিন ওই রকম হয়ে যাবে তাও যেন কল্পনার বাইরে। রাত্রে ঘরের দরজা বন্ধ করে শুতে দেবে না। এ কি আবদার শাশুড়ীর! বেশ হয়েছে। ভালো হয়েছে। অমন বংশ যে নির্বংশ হয়ে গেছে খুব ভালো হয়েছে, নয়নতারা শুনে খুব খুশী হয়েছে। নিখিলেশ নিজে গয়নাগুলো চাইতে নবাবগঞ্জে গিয়ে সব শুনে এসেছে। সে বাড়ি নাকি এখন ভূতের বাড়ি হয়ে গেছে। হবে না! তার অভিশাপ কি মিথ্যে হবে নাকি!
হঠাৎ বাইরের সদর দরজায় কড়া নড়ে উঠলো।
গিরিবালার এতক্ষণে সবে খাওয়া শেষ হয়েছে। রান্নাঘরের এঁটো কাঁটা পরিষ্কার করে চৌবাচ্চায় হাত ধুচ্ছিল। এমন অসময়ে আবার কে এল তার বাড়িতে! নিখিলেশ অফিস কামাই করে বাড়ি চলে এল নাকি?
নয়নতারার কাছে এসে গিরিবালা বললে–দিদিমণি, আপনার সঙ্গে কে দেখা করতে এসেছে দেখ–
গিরিবালার পেছনে কে বুঝি দাঁড়িয়ে ছিল।
–আরে নয়নদি! তোমার অসুখ বলে ছুটি নিয়েছ, আর তুমি তো দিব্যি বসে আছো, আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম–
–ওমা তুই!
হুড়মুড় করে উঠে পড়লো নয়নতারা। নইলে মালা একেবারে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়তো হয়ত। নয়নতারা তাড়াতাড়ি তাকে তার নিজের শোবার ঘরের ভেতরে নিয়ে গিয়ে বসালো। কিন্তু সেইটুকুর মধ্যে মালা যা দেখবার তা দেখে নিয়েছে।
ঘরের ভেতরে বসে মালা বললে–ও কে নয়নদি? ও-ঘরে? কারোর অসুখ নাকি?
নয়নতারা বললে–হ্যাঁ, কিন্তু তুই হঠাৎ কী মনে করে?
মালা বললে–কী আবার মনে করে? এতদিন অফিসে যাচ্ছ না, আমরা সবাই ভেবে অস্থির। তুমি ডাক্তারের সার্টিফিকেট দিয়েছ, আর আমি ভাববো না? তোমাকে একবার দেখতেও আসবো না?
–কিন্তু আজকে অফিস নেই তোর?
–ও মা, বুঝি জানো না, আজকে যে আমাদের ডিপার্টমেন্টের থিয়েটার হচ্ছে। তাই আজকে হাফ-হলিডে হয়ে গেল। সন্ধ্যেবেলা প্লে, সকাল-সকাল বাড়িতে গিয়ে খেয়ে দেয়ে সবাই সেজেগুজে থিয়েটার দেখতে যাবে, আমি বললুম আমি থিয়েটার দেখবো না, আমি বরং নৈহাটিতে গিয়ে নয়নদিকে দেখে আসি–
–তুই এসেছিস ভালো করেছিস, এখন তোর জন্যে কী খাবার আনাই বল্?
–কী যে বলো তুমি নয়নদি, আমি তো এইমাত্র অফিসের ক্যানটিন থেকে খেয়ে এলুম। খাওয়ার কথা থাক, তুমি তোমার কথা বলো, তোমার তো অসুখ-বিসুখ কিছু দেখতে পাচ্ছি না, তাহলে অফিসে যাচ্ছ না কেন? কী হয়েছে তোমার? এদিকে আমি কিনা অত দূর থেকে দৌড়তে দৌড়তে তোমাকে দেখতে এলুম–
নয়নতারা বললে–আমার নিজের অসুখ ঠিক নয়, আমার বাড়িতে অসুখ ভাই, এ এমন অসুখ, কিছুতেই সারছে না, এতদিনে এবার মনে হচ্ছে যেন একটু সেরে উঠেছে–
মালা বললে–কার অসুখ, নয়নদি, উনি কে?
নয়নতারা বললে–উনি আমাদের এক আত্মীয়–ওঁর অসুখের জন্যেই তো আমার অফিস কামাই, ওঁকে বাড়িতে একলা কার হাতে ফেলে অফিসে যাই বল?
–তোমার বাপের বাড়ির কেউ বুঝি?
নয়নতারা বললেন, আমার শ্বশুরবাড়ির লোক–
–তোমার দেওর বুঝি?
–না দেওর নয়—
–তবে?
মালার বড় কৌতূহল। নয়নতারা সে-প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে বললে–ওঁর কথা থাক, তুই অফিসের সব খবরটবর বল, কেতকীর খবর কী? নতুন কিছু গয়না গড়ালো আর?
বলে নয়নতারা আর মালা দুজনেই হেসে উঠলো। কেতকী হাজরার গয়নার শখের কথা অফিসময় সবাই জানে। টাকা হাতে পেলেই কেবল গয়না গড়াবে কেতকী।
–আর একটা খবর তোমাকে দিই নয়নদি, আমাদের ডেস্প্যাচ সেকশানের অরুণাদি, অরুণাদিকে চিনতে পারছো তো?
