–কী হলো, কী দেখছো বলো?
মানুষটার ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো একটু নড়ে উঠলো। দু’চোখে অগাধ কৌতূহল উগ্র হয়ে উঠলো।
–তুমি কে?
নয়নতারা আরো নিচু হলো এবার। মানুষটার মুখের কাছকাছি মুখ নামিয়ে আনলো। বললে–আমি নয়নতারা–
হঠাৎ যেন মানুষটার সর্বাঙ্গে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। ঠোঁটের একটা পাশ থর থর করে কেঁপে উঠলো।
–আমাকে চিনতে পেরেছ? নয়নতারাকে মনে পড়ে তোমার? আমি সেই নবাবগঞ্জের নয়নতারা! যাকে ফেলে তুমি পালিয়ে গিয়েছিলে! মনে পড়েছে?
মানুষটা তখনও একদৃষ্টে নয়নতারার দিকে চেয়ে আছে।
নয়নতারা জোরে জোরে বলতে লাগলো-–এ আমার বাড়ি। তুমি ট্রেনে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে। তাই আমি তোমাকে সেখান থেকে আমার বাড়িতে এনে তুলেছি, বুঝলে? তোমার খুব শরীর খারাপ হয়ে গিয়েছিল তাই তোমার জ্ঞান ছিল না। ডাক্তারবাবু বলেছেন তোমার কোনও ভয় নেই, তুমি শিগগির সেরে উঠবে। অমন করে চেয়ে চেয়ে কী দেখছো? অনেকদিন ধরে তুমি অসুখে ভুগছ কিনা, তাই তোমার শরীর খুব দুর্বল হয়ে গেছে–কিছু ভেবো না–আমি তোমাকে ঠিক সারিয়ে তুলবো–
এতগুলো কথা মানুষটার কানে গেল কি না নয়নতারা বুঝতে পারলে না। নয়নতারার দিকে মানুষটা তখনও ফ্যা ফ্যা করে শুধু চেয়েই দেখতে লাগলো।
নয়নতারা বুঝতে পারলে না মানুষটা তার কথা শুনতে পাচ্ছে কি পাচ্ছে না। মুখে চোখে তেমন কোনও আভাসও পাওয়া গেল না।
একটু থেমে নয়নতারা আবার বললে–আমার কথা তুমি বুঝতে পারছো?
সদানন্দ মাথা নাড়তে চেষ্টা করলে।
নয়নতারা বললে–আমাকে চিনতে পেরেছ তুমি? বলো, চিনতে পেরেছ?
সদানন্দ আবার মাথা নাড়লে। কী যেন বলতে চেষ্টা করতে গেল। কিন্তু কিছু বলতে পারলে না।
নয়নতারা বললে–কিছু বলবে? তুমি কিছু বলবে আমাকে?
সদানন্দ অনেক চেষ্টা করে বললে–আমি…এখানে…কোথায়?
নয়নতারা বললে–এটা আমার বাড়ি, আমি তোমাকে আমার বাড়িতে নিয়ে এসেছি, তোমার খুব অসুখ হয়েছিল কিনা তাই…
–আমার অসুখ হয়েছিল?
–হ্যাঁ, তুমি ক’মাস ধরে আমার বাড়িতেই রয়েছ। তুমি ট্রেনে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে, তাই তোমাকে দেখতে পেয়ে আমার বাড়িতে নিয়ে এসেছি। এখন তুমি ভালো হয়ে গেছ, আর কোনও ভয় নেই।
কথাটা শুনে সদানন্দ যেন উসখুস করতে লাগলো। এপাশ-ওপাশ চারদিকে দেখতে লাগলো। যেন চিনতে চেষ্টা করতে লাগলো চারিদিকের পরিবেশ। চারিদিকের পরিবেশ দেখে তার যেন কেমন অস্বস্তি হতে লাগলো। যেন তার ভালো লাগলো না এই শুয়ে থাকাটা। যেন উঠে বসতে চেষ্টা করতে গেল।
–ও কী করছে? উঠছো কেন? উঠছো কেন? শুয়ে থাকো।
নয়নতারা সদানন্দকে ধরে শুইয়ে রাখবার চেষ্টা করলে। দুর্বল শরীর সদানন্দর, পাখির পলকা শরীরের মত।
নয়নতারা আবার বলে উঠলো–কেন উঠতে চেষ্টা করছে, উঠো না, পড়ে যাবে–
নয়নতারার কথায় সদানন্দ হতাশ হয়ে আবার নির্জীব হয়ে শুয়ে পড়লো। অসহায় হয়ে শুধু নয়নতারা মুখের দিকে চেয়ে রইল। যেন বলতে চাইলে আমাকে ছেড়ে দাও তুমি, আমাকে মুক্তি দাও–
সেই আরো একবার যেমন করে কথাগুলো বলেছিল তেমনি করেই যেন কথাগুলো বলতে চাইলে সদানন্দ। নয়নতারা বুঝলো। কিন্তু-না-বোঝার ভান করে সদানন্দকে বলতে লাগলো–তুমি আগে ভালো হও, তারপরে চলে যেও, আমি তোমাকে এখানে আটকে রাখবো না, তুমি থাকতে চাইলেও আমি তোমাকে এখানে থাকতে দেবো না–
সদানন্দ এবারে আবার কথা বললে। বললে–তুমি কেন..আমাকে এখানে আনলে?
নয়নতারা বললে–এখানে না আনলে তুমি কি বাঁচতে? তোমার যে খুব শরীর খারাপ হয়েছিল। তুমি যে গাড়ীতে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে–
এর জবাবে সদানন্দ কিছু বললে না। নিজের হাত দুটো শুধু নিজের মাথায় ঘষতে লাগলো।
নয়নতারা জিজ্ঞেস করলে–তোমার মাথা ব্যথা করছে? আমি টিপে দেব?
কোনও জবাব না পেয়ে নয়নতারা নিজে থেকেই সদানন্দর কপালটা আস্তে আস্তে টিপতে গেল। কিন্তু সদানন্দ হাত দিয়ে নয়নতারার হাতটা সরিয়ে দিলে।
নয়নতারা বললে–এখনও দেখছি তোমার রাগ গেল না আমার ওপর! এখনও তুমি সে সব কথা ভুলতে পারোনি দেখছি! মাথা টিপে দিলে তোমার কী ক্ষতি হয়?
সদানন্দ স্পষ্ট গলায় বললে—না–
নয়নতারা বললে–না কেন? আমাকে এখনও ঘেন্না করো? আমি হাত দিলে কি তোমার গায়ে কাঁটা ফোটে?
সদানন্দ এ-কথার কোনও জবাব দিতে পারলে না। নয়নতারার হাতে আত্মসমর্পণ করে যেন সে তৃপ্তি পেল। নয়নতারা একমনে তার মাথা টিপে দিতে লাগলো, আর সদানন্দ নির্জীবের মত শুয়ে রইল চোখ বুজিয়ে। নয়নতারার মনে হলো মানুষটা যেন এতদিনের অসুস্থতার পর তার সেবায় একটু আরাম পাচ্ছে। দুপুরবেলা চারিদিকে সব চুপচাপ। দূরে স্টেশনে বুঝি কোনও ট্রেনের হুইসল্ বেজে উঠলো। কোথাকার ট্রেন কে জানে! হয়ত ওই ট্রেনটাই তার আগেকার শ্বশুরবাড়ি রেলবাজারে যাবে। কিম্বা হয়ত ট্রেনটা রেলবাজার থেকেই আসছে। কে জানে! রেলবাজার! নামটা মনে পড়তেই মনটা অনেক দিনের পুরোন দিনগুলোর মধ্যে তলিয়ে গেল। আশ্চর্য! এমন যে হবে তা কি সে কল্পনা করতে পেরেছিল? তার জীবন তো এতদিন অন্য খাতে বইছিল। অফিস করছিল, মাসকাবারি মাইনে ঘরে আনছিল। নিখিলেশের সঙ্গে নিজের জীবনটা জড়িয়ে ফেলে সে তো একেবারে অন্য মানুষই হয়ে গিয়েছিল। তাহলে আবার তার পুরনো জীবনের ফেলে আসা মানুষটকে এমনভাবে কেন সে বাড়িতে এনে তুললো? ভগবান তার এ কী করলে? এখন একে নিয়ে সে কী করবে?
