প্রকাশ রায় উঠলো। বললে–উঠি পাল মশাই, আবার অনেক দূর যেতে হবে–
–কোথায় যাবে এখন?
–কোথায় আর যাবোয় দেখি সদাকে কোথায় পাওয়া যায়। যার সম্পত্তি তার হাতে তুলে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হতে চাই। জামাইবাবুর লাখ লাখ টাকার সম্পত্তি, এখন সে যদি না আসে তো গভর্মেন্টই তো সব বাজেয়াপ্ত করে নেবে
বেহারি পাল বললে–কেন? তা কেন? তুমিই সব পাবে! তুমি ছাড়া আর তো কেউ নেই চৌধুরী মশাই-এর–
–না পাল মশাই, টাকার ওপরে আমার অত লোভ নেই। টাকার লোভ যদিও বা আগে ছিল, এখন আর তাও নেই। টাকা থাকার পরিণাম তো চোখের সামনেই দেখলুম। অত টাকা থাকায় লাভটা কী হলো বলুন? শেষকালে তো মুত্যুর সময়ে এক গণ্ডুষ জলও পেলেন না জামাইবাবু–
কথা শেষ করে প্রকাশ রায় উঠলো৷ কিন্তু ফয়সালা হলো না কিছুই। এখান থেকে কোথায় যাবে তাই-ই ভাবতে লাগলো যেতে যেতে। কলকাতা ছাড়া সে আর কোথায়ই বা যাবে ভাগ্নেকে খুঁজতে! আর কলকাতা কি নবাবগঞ্জ যে সেখানে গেলেই সদানন্দকে খুঁজে বার করা যাবে? তা ছাড়া কলকাতাও তো আর এখন সে কলকাতা নেই। সে কলকাতা নাকি আরো জমজমাট হয়েছে। উদ্বাস্তুদের ভিড়ে নাকি কলকাতার রাস্তায় হাঁটাও দায় হয়েছে। ট্রামে বাসে আর দাঁড়াবার জায়গাও নাকি পাওয়া যায় না। আশে-পাশের সব জায়গায় নাকি তাদের ঝুপড়ি দোকান-ঘর উঠেছে।
হঠাৎ মানদা মাসির কথাটা মনে পড়ে গেল। মাসি বেঁচে আছে কি না তাই-ই বা কে জানে। আর সেই পুলিসের বড়বাবু। সেই বাতাসীর বাবু। তাকে তো সে সদার একটা ছবিও দিয়ে এসেছিল সেবার।
রেল বাজার থেকে প্রকাশ রায় আবার কলকাতার ট্রেনে চেপে বসলো।
.
নৈহাটির একটা বাড়ীর একটা ঘরে সদানন্দ তখন চোখ মেলে চাইলে। প্রথমে অস্পষ্ট, তারপর আরো স্পষ্ট হয়ে উঠলো দৃষ্টিটা। তারপর আস্তে আস্তে পাশ ফিরে শুলো।
মাথার বালিশটা মাথা থেকে সরে গিয়েছিল। নয়নতারা সেটা আবার মাথার নিচে ঠিক করিয়ে বসিয়ে দিলে। মাথায় নয়নতারার হাতের স্পর্শ লাগতেই সদানন্দের কেমন যেন চৈতন্য ফিরে এল।
মাথার ওপর চোখ দুটো যেন কাকে খুঁজে বেড়াতে লাগলো। সামনে নয়নতারাকে দেখে একদৃষ্টে সেই দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে রইল। তারপর আবার চোখ বুজলো।
নয়নতারার মনে হলো মানুষটা বোধহয় আবার ঘুমিয়ে পড়লো। আস্তে আস্তে সে বাইরে চলে এল। সকালবেলা নিখিলেশ ভাত খেয়ে অফিসে গেছে। তারপর গিরি বালাকে রোগীর কাছে বসিয়ে নিজের কাপড় কাচা, চান করা সব কিছু তাড়াতাড়ি সেরে নিয়ে কোনও রকমে ভাত মুখে গুঁজে দিয়ে আবার রোগীর কাছে এসে গিরিবালাকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। গিরিবালাও তো মানুষ। বুড়ো মানুষ, একলা সে-ই বা কত পারবে? রান্না করতে করতেই তাকে হয়ত ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে ডাক্তারের বাড়ি ছুটতে হয়। আবার সেখানে থেকে এসেই ঘর ঝাঁট দেওয়া। কটা দিক সে দেখবে! সব চেয়ে বেশী মুসকিল হয়েছে নিখিলেশকে নিয়ে। আজকাল লাস্ট ট্রেনের আগে বাড়িই আসে না সে। জিজ্ঞেস করলে বলে–অফিসে কাজ পড়েছে–
অথচ আগেও তো নিখিলেশ অফিসে গিয়েছে। তখন যত কাজই থাকুক ঠিক ছুটির সময়ে নয়নতারার অফিসে এসে হাজির হতো। একদিনের জন্যেও তার এক মিনিট দেরি হয়নি। নয়নতারা বুঝতে পারে ও-মানুষটা যে এ বাড়িতে শয্যাশায়ী হয়ে রয়েছে, ও-মানুষটার জন্যে যে এতগুলো টাকা খরচ হচ্ছে, নয়নতারার অফিস কামাই হচ্ছে, এটা নিখিলেশের পছন্দ নয়। কিন্তু পুরুষ মানুষ এত অবুঝ কেন? এইটুকু বোঝে না কেউ যে, আজ না হয় ওর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখা উচিত নয়, কিন্তু এককালে তো ওর সঙ্গে তার অগ্নি সাক্ষী রেখে বিয়ে হয়েছিল। একটু ভদ্রতা, একটু সহানুভূতি দেখানোও কি অন্যায়। বাড়িতে কুকুর-বেড়াল পুষলেও তো মানুষ তাকে দুটো খেতে দেয়, অসুখ-বিসুখে তার সেবা করে। আর এতো তাও নয়, এ তো জলজ্যান্ত একটা মানুষ! এর জন্যে এমন করে রাগ করতে আছে!
শুকনো কাপড়গুলো ঘরের আলনায় রেখে দিয়ে আবার নয়নতারা এ-ঘরে এল। আসতেই অবাক হয়ে গেল। দেখলে মানুষটা চোখ মেলে জেগে রয়েছে। নয়নতারা ঘরে ঢুকতেই তার দিকে চেয়ে দেখলে।
আস্তে আস্তে তার কাছে এসে দাঁড়ালো নয়নতারা। মানুষটার দৃষ্টিও তাকে অনুসরণ করে তার মুখের ওপর পড়ে সেটা স্থির হয়ে রইল।
নয়নতারা মুখ নিচু করে জিজ্ঞেস করলে–কী দেখছো?
বোঝা গেল, কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে মানুষটার। নয়নতারা আবার জিজ্ঞেস করলে–কী দেখছো তুমি অমন করে?
মানুষটা তবু তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।
–বলো কী দেখছো? আমার কথার জবাব দাও—
তবু কিছু কথা বলে না লোকটা। আশ্চর্য, অসুখ বুঝি এমনই জিনিস! সেই এতখানি দশাসই মানুষটা, যে তাকে দেখলেই অদৃশ্য হয়ে যেতে চাইতো, যে-লোকটা একদিন পরের অপরাধের দায়ে নিজের ওপর আঘাত করে মাথাটা রক্তাক্ত করে তুলেছিল, আজ অসুখে পড়ে সেই লোকটাই কেমন নির্জীব হয়ে শুয়ে পড়ে আছে। আর নয়নতারার সেবা তাকে মাসের পর মাস নিঃশব্দে মুখ বুঁজে গ্রহণ করতে হচ্ছে। সে জানতেও পারেনি যে তার দায় নয়নতারার ওপর ছেড়ে দিয়ে এতদিন নিশ্চিন্ত হয়ে শুয়ে কাটিয়ে দিয়েছে সে। এরই নাম বুঝি অসুখ। এই জন্যেই বুঝি অসুখকে মানুষ এত ভয় করে। এই অসুখের কথা ভেবেই বুঝি মানুষ সংসার করে, ঘর বাঁধে, সন্তান কামনা করে।
