–কী করবেন তাকে দিয়ে?
–সে কোর্টে দাঁড়িয়ে বলবে যে সে টাকা চায় না। সেটা বলাতে পারবেন তাকে দিয়ে?
প্রকাশ বললে–খুব বলাতে পারবো। টাকার ওপরে তার কোনও লোভ-টোভ নেই কোনও কালে। ছোটবেলা থেকেই সে টাকা চায় না। অদ্ভুত ছেলে সে মশাই। বিয়ে করতেই চাইতো না তার আবার টাকা! আমরা তো তাকে জোর করে ধরে-করে সুন্দরী মেয়ে দেখে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলুম–
উকিল বললে–তা হলে তা ল্যাঠা চুকেই গেল। কিন্তু তাকে যদি না পান তো আপনার ভাগ্নেবউকে তা হলে ভুজুং দিয়ে রাজি করাতে হবে–
প্রকাশ বললে–ওই একটা মুশকিল! ভাগ্নেবউ একলা হলে আমি কিছু ভয় পেতুম, যেমন করে লোক তাকে পটিয়ে ফেলতে পারতুম। কিন্তু তার পেছনে যে আবার একটা লোক আছে–
–লোক মানে?
–লোক মানে সে একটা বকাটে ছোকরা। তার নাম নিখিলেশ না কি।
–সে তার কে–
–কে আবার? কেউই না। বাবার ছাত্র। মেয়ের বিয়ের সময় কেনাকাটা-টাটা করা। সে-ই সব করতো আর কি। সেই তো একদিন জামাইবাবুর কাছে এসেছিল বউ-এর গয়না গাঁটি ফেরত চেয়ে নিতে। বুঝুন মশাই, বউ রাগ করে শ্বশুর-শাশুড়ীকে গালাগালি দিয়ে তেজ করে বাপের বাড়ি চলে গেল, এমন কি সিঁথির সিঁদুর মুছে হাতের শাঁখা পর্যন্ত ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়ে চলে গেল, তারপর আবার কোন্ লজ্জায় গয়না চেয়ে পাঠায়?
–কত টাকার গয়না?
প্রকাশ বললে–তা বাপের বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ির গয়না মিলিয়ে প্রায় একশো ভরি হবে।
উকিল সব শুনে বললে–যাক গে ও-সব কথা। তার ব্যাপার শুনে মনে হচ্ছে সে বউ কি আর সম্পত্তির লোভ ছাড়বে! আপনি বরং ভাগ্নের খোঁজ করুন, টাকা-পয়সা সম্পত্তির ওপর যখন তার লোভ নেই বলছেন, তখন মনে হচ্ছে আপনাকে বিশেষ বেগ পেতে হবে না–আমি আপনাকে সব ব্যবস্থা করে দেব–
–তা হলে তাই যাই—
বলে উকিলের কাছ থেকে বাড়ি এসে সেইদিনই প্রকাশ রায় নবাবগঞ্জের পথে রওনা দিলে। কোথায় ভাগলপুর, আর কোথায় নবাবগঞ্জ। যদি নবাবগঞ্জে না পাওয়া যায় তখন আবার যেতে হবে কলকাতায়। আর কলকাতা ছাড়া গতি কী? বাঙালীর তো ওই একটাই জায়গা। যাবে আর সে কোথায়? পাপ করতে গেলেও সেই কলকাতা, পুণ্য করতে গেলেও তাই। ১৯৪৭ সালের পর থেকে যেন কলকাতার আকর্ষণ আরো বেড়েছে। একবার যদি জামাইবাবুর টাকাগুলো হাতাতে পারা যায় তো শেষ পর্যন্ত সুলতানপুরের বাড়িটা বেচে দিয়ে একবারে কলকাতায় চলে যাবে সে। এতদিন সে কালীঘাটের মানদা মাসির বাড়িতে গিয়ে উঠেছে, এবার থেকে উঠবে গিয়ে নিজের বাড়িতে। নিজে একটা মস্ত বাড়ি করবে কলকাতায়। একেবারে বড়-লোকদের পাড়ায়। আর কিনবে একখানা গাড়ি। সুদ থেকেই তো মাসে আট হাজার টাকা করে পকেটে আসবে। তখন কত খরচ করবে করো না, কত পরোটা আর ডিমের ডালনা খাবে খাও না। তবে এবার আর ধেনো নয় বাবা। ধেনো খেয়ে খেয়ে পেটের নাড়ি-ভুড়িতে মরচে ধরে গেছে। এবার বিলিতি। একেবারে খাস বিলিতি মাল ছাড়া আর কিছু ছোঁবে না সে।
ভাবতে ভাবতে প্রকাশ রায় ভাগলপুর স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠলো।
.
১৯৪৭ সালের পর সেই দশ বছর কেটে গেছে আর সঙ্গে সঙ্গে যেন পৃথিবীর মানচিত্র বদলেছে, পৃথিবীর মানুষের মনের মানচিত্রও যেন আগাগোড়া বদলে গেছে। অনেক নীল রঙ লাল হয়ে গেছে, অনেক লাল রং আবার নীল। লালের সঙ্গে নীলের বিরোধে মানুষে মানুষে ব্যবধানের পাঁচিল আরো উঁচু হয়ে একজনের সঙ্গে আর একজনের সম্পর্কের মধ্যে আড়াল সৃষ্টি করেছে। বন্ধুত্বের চেয়ে শত্রুতার শক্তিতে মানুষ মানুষের কাছেই আরো ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। তাই বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শেষাশেষি এসে প্রকাশ রায় একদিন টাকার লোভে পৃথিবী পরিক্রমা করতে শুরু করলো। যে-টাকাকে সদানন্দ অত সহজে প্রত্যাখ্যান করতে পারলো, যে-টাকাকে প্রত্যাখান করে সে দাতব্য-ধর্মশালায় নিজের আশ্রয় খুঁজে নিলে সেই টাকার জন্যেই প্রকাশ রায় একদিন এক জেলা থেকে আর এক জেলায় হন্যে হয়ে ঘুরতে লাগলো। কোথায় সদানন্দ, সদানন্দ কোথায়? সদানন্দকে খুঁজে বার করতে না পারলে যেন সব সাধ, সব বাসনা, সব ভবিষ্যৎ রসাতলে চলে যাবে।
বেহারি পালমশাই বললে–কই না তো, সদানন্দ তো আর আসেনি এখানে–
সদানন্দকে খুঁজে বেড়াবার পেছনে প্রকাশ রায়ের এই আগ্রহের কারণটা কিন্তু কারো কাছে আর চাপা থাকলো না। বরোয়ারিতলার দোকানের মাচায় বসে যারা আড্ডা দেয় তারাও বললে–এখন কেন তাকে খুঁজছেন শালাবাবু? যখন সদা নিজে থেকেই ছোটমশাই এর কাছে গিয়েছিল তখন তো আপনারা কেউই কিছু বলেননি? এখন বুঝি টাকার জন্যে সদাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন?
প্রকাশ বললে–আরে না ভাই তা নয়। তার নিজের বাপের মৃত্যুর খবরটা তাকে দিতে হবে না? তার টাকার ওপর আমার কোনও লোভ নেই।
–এদিকে প্রাণকেষ্ট সা’ মশাই-এর খবর শুনেছ শালাবাবু?
–কী খবর?
বেহারি পাল মশাই বললে–সা’ মশাই হার্ট-ফেল করে মারা গেছেন হে। তোমার ভগ্নিপতির বাড়ি কেনার পরদিনই এই কাণ্ড হলো। ওবাড়ি যে-ই কিনতো তারই ওই কাণ্ড হতো। আমি তখন কিনতে চেয়েছিলুম তা ছোটমশাই আমাকে বেচেননি, পাছে আমার ভালো হয়। এখন ভাবি ভালোই হয়েছে–আমি ও বাড়ি কিনলে আমারও তো ওই হতো–
অনেকদিন পরে আবার নবাবগঞ্জে আসা। এককালে কত বছর প্রকাশ রায় এই নবাবগঞ্জে কাটিয়ে গেছে। এই নবাবগঞ্জের ধুলোর সঙ্গে তার জীবন জড়িয়ে গিয়েছিল। কখনও কেউ ভাবতেও পারেনি তখন যে একদিন সেই নবাবগঞ্জেরই এই দশা হবে। কল্পনাও করতে পারেনি যে এমন করে চৌধুরী বংশ এত তাড়াতাড়ি ধুলোয় মিশিয়ে যাবে। প্রকাশ রায় সেই পুরোনো বাড়িটার দিকে চেয়ে দেখলে ভালো করে। সমস্ত বাড়িটাতে কালের দাগ যেন দাগী হয়ে গেছে যেন দাগী হয়ে গেছে সেটা।
