যারা রায় মশাই-এর বৈঠকখানায় আসে তারা আখেরের ভরসায় আসে। প্রকাশ রায় তা জানে। জানে বলেই সকলকে আশা দেয়। এমন ভরসা দেয় যাতে তারা রোজই আসে। আর ঠিক পিসেমশাইকে যেমন ভয়-ভক্তি করতো রায় মশাইকেও তারা ঠিক তেমনি ভয় ভক্তি করে। নবাবগঞ্জে দিদির শ্বশুর কর্তাবাবুর খাতির দেখেছে, সুলতানপুরে পিসেমশাই এরও খাতির দেখেছে। এতকাল পর নিজে লোকের কাছে সেই খাতির পেয়ে প্রকাশের খুব ভালো লাগতো।
অশ্বিনী ভট্টাচার্য জিজ্ঞেস করতো–তা ভাগ্নে-বউ-এর শেষকালে কী হলো রায় মশাই?
প্রকাশ বলতে–কী আবার হবে, যে-গাইগরু বিয়োবেও না দুধও দেবে না তাকে ঘরে বসে খড়-ভূষি খাওয়াবে এমন আহাম্মক কেউ আছে?
কথাটা শুনে ভীম বিশ্বাসও অবাক হতো, অশ্বিনী ভট্টাচার্যিও অবাক হতো। বৈঠকখানা ঘরে যে-যে থাকতো, তারা সবাই-ই অবাক হয়ে যেত। জিজ্ঞেস করতো–তা সে বউ এখন কোথায়? খবরটবর কেউ রাখে না?
–কে আবার সেই অলক্ষুণে বউ-এর খবর রাখতে যাবে বলো তো? সেই বউ আসার পর থেকেই তো দিদি-জামাইবাবুর এই হাল হলো। নইলে নবাবগঞ্জের অত লাখ টাকার জমিদারি সাধ করে কেউ জলের দামে বেচে দেয়?
ভীম বিশ্বাস জিজ্ঞেস করতো তা কত দামে বিক্রি হলো সেই জমিদারি?
প্রকাশ বলতো–লাখ তিনেক টাকা।
তিন লাখ! তিন লাখ টাকা হলো জলের দর! টাকার অঙ্কটা শুনে উপস্থিত শ্রোতারা সবাই চমকে উঠতো। নবাবগঞ্জের জমিদারি যদি তিন লাখ টাকা হয়, তাহলে সুলতানপুরের জমি-জমা কম করেও পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে নিশ্চয়ই। উপস্থিত শ্রোতারা একসঙ্গে হাজার টাকাই কখনও চোখে দেখেনি, আর এ তো লাখ লাখ টাকা। তার ওপর আছে সুদ। মাসে মাসে সে-টাকার সুদও তো জমছে। সেই সুদও তো পাবে রায় মশাই।
ভীম বিশ্বাস আর থাকতে পারতো না। জিজ্ঞেস করে ফেলতো–অত টাকার সুদ কত হবে রায় মশাই?
প্রকাশ রায় তাচ্ছিল্যের সুরে বলতো–কত আর হবে, হাজার আষ্টেকের কম হবে।
–মাসে মাসে?
–হ্যাঁ, মাসে মাসে।
সর্বনাশ! সবাই সুদের অঙ্ক শুনে আবার আকাশ থেকে পড়তো। মাসে আট হাজার করে সুদ! আসলে হাত পড়বে না, সুদটাও সব খরচ হবে না। সুদের থেকেও আবার কিছু কিছু মোটা অংশ মাসে মাসে আসলে গিয়ে জমা পড়বে। তারপর সেই টাকা পাহাড় হয়ে হয়ে ব্যাঙ্কের সিন্দুক ছাপিয়ে শেষকালে উপচে পড়বে। এর নামই বলে কপাল! কার টাকা কে ভোগ করে দেখ! নরনারায়ণ চৌধুরী প্রজা ঠেঙিয়ে টাকা জমিয়ে গেল, সেই টাকার সঙ্গে আবার যোগ হলো বেয়াই-এর টাকা। আবার একটা ছেলে ছিল ছেলের বউও ছিল, তারাও কে কোথায় চলে গেল, সকলের সব টাকা কিনা এসে রায় মশাই-এর কপালে নাচলো!
–বুঝলেন রায় মশাই, আর জন্মে আপনি অনেক পুণ্যি করেছিলেন তাই এ-জন্মে এতগুলো টাকার মালিক হলেন। ধন্য আপনি রায় মশাই–আপনিই ধন্য—
বলে ভীম বিশ্বাস প্রকাশ রায়ের পায়ের ধুলো নিয়ে মাথায় ঠেকাতে।
প্রকাশ রায় পা দুটো বাড়িয়ে দিয়ে বলতো–পায়ের ধুলো নিচ্ছ নাও, কিন্তু আমার তো কোনও বাহাদুরি নেই হে এতে। তবে আমি শুধু চরিত্রটি ঠিক রেখেছি এই যা আমার কেরামতি। মদও খাইনি মেয়েমানুষও করিনি, আর কখনও মিছে কথাও বলিনি–মদ মেয়েমানুষ না করা আর মিছে না বলা, যদি ভালো কাজ হয় তো ভালো কাজ করেছি–
বলে আত্মতৃপ্তিতে মুখ দিয়ে গল্ গল্ করে তামাকের ধোঁয়া বার করতো।
কিন্তু সব মুশকিল করে দিলে ওই ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। সাকসেশন সার্টিফিকেট নিতে গেলেই তো কোর্টে যেতে হবে। তখন? তখন যদি বেরিয়ে পড়ে হরনারায়ণ চৌধুরীর এক ছেলে বেঁচে আছে! আর সে যদি মারা গিয়েও থাকে তো তার একটা বিয়ে হয়েছিল সে বউ নিশ্চয়ই বেঁচে আছে। নতুন আইনে ছেলে না থাকলে ছেলের বউই হবে শ্বশুরের সম্পত্তির ওয়ারিশন!
.
তা শেষকালে প্রকাশ উকিলের বাড়িতেও গেল। সব কিছু শুনলে উকিল। শুনে তারপর বললে–আপনার ভাগ্নে যদি বেঁচে থাকে তা হলে সব সম্পত্তি সেই ভাগ্নেই পাবে–
–ধরুন বেঁচে নেই। সন্নিসী হয়ে গেছে।
–ভাগ্নেকে যদি না পাওয়া যায় তা হলে সমস্ত ভাগ্নে বউ পাবে। এই রকম নতুন আইন হয়েছে এখন। তা তার কাছে গিয়ে একটা কাগজ লিখিয়ে নিয়ে আসুন না!
–কী লিখিয়ে আনবো?
–শুধু লিখিয়ে আনলে চলবে না। ভাগ্নেবউকে একটু ভুজুং-ভাজুং দিয়ে একবার ভাগলপুরের কোর্টে নিয়ে আসুন, তারপর যা করবার আমি করবো। আপনার ভাগ্নে বউ কোথায়?
প্রকাশ রায় বললে–তা তো জানি না–বোধ হয় তার বাপের বাড়িতেই আছে।
–তাদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন আপনাদের?
প্রকাশ বললে–সম্পর্ক খুব ভালো নয়। শেষের দিকে জামাইবাবুর সঙ্গে ছেলের বউ এর খুব ঝগড়া হয়ে যায়। সে এক কেলেঙ্কারি কাণ্ড হয়েছিল। ছেলের বউ রাগ করে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছিল, তারপর আর আসেনি
উকিল বললে–ডিভোর্স হয়ে গেছে কিনা কিছু খবর রাখেন? বিবাহ-বিচ্ছেদ? এখন আবার এই নতুন আইনটা হয়েছে কিনা। যদি ডিভোর্স হয়ে থাকে তাহলে আপনি বেঁচে গেলেন
প্রকাশ রায় বললে–আজ্ঞে তা তো কিছু খবর রাখিনি।
–তাহলে এবার খবরটা রাখুন। এতগুলো টাকার ব্যাপার, ইয়ার্কি নাকি! টাকার ওয়ারিশন হতে গেলে খোঁজখবর করতে হবে আপনাকেই। খুঁজে দেখুন আপনার ভাগ্নে বউ আবার বিয়ে-টিয়ে করেছে কি না। আর ভাগ্নেও তো এখনও বেঁচে থাকতে পারে, তাকে খুঁজে বার করুন আগে, তা হলে সবই সুরাহা হয়ে যাবে। যদি বিবাগী হয়ে গিয়ে থাকে তো তাকে ধরে নিয়ে আসুন, তখন যা করবার আমি করে দেব’খন–
