প্রকাশ বললে–প্রমাণ আর কী দেব বলুন, প্রমাণ গাঁয়ের লোক। তারাই প্রমাণ দেবে, তারাই বলবে চৌধুরী মশাই-এর কেউ নেই, তিনি আমার জামাইবাবু, আমি তার সমস্ত গচ্ছিত টাকাকড়ির আইনত ওয়ারিশন–
ব্যঙ্কের ম্যানেজার বললে–তা বললে তো ব্যাঙ্ক শুনবে না, আপনি কোর্ট থেকে সাকসেশান সার্টিফিকেট নিয়ে আসুন। তারা যদি আপনাকেই ওয়ারিশন বলে তো হরনারায়ণ চৌধুরীর সব টাকা কড়ি আপনিই পাবেন–
বড় মুশকিলে পড়লো প্রকাশ রায়। এত বছরের এত সাধ যখন শেষ পর্যন্ত মিটলোই তখন সব কি এমন করে বানচাল হয়ে যাবে নাকি? একেবারে ঘাটে এসে তরী ডুববে?
ততদিনে তোষামুদের দল জুটে গেছে প্রকাশ রায়ের। অশ্বিনী ভট্টাচার্যের আর সে রাগ নেই। এখন সে অন্য মানুষ। সকাল হতে-না-হতে তারা এসে প্রকাশ রায়ের বৈঠকখানায় জোটে। ঢুকেই প্রকাশ রায়কে প্রণাম করে। জিজ্ঞেস করে রাত্রে রায় মশাই-এর ঘুম হয়েছে কি না। সবাই-ই প্রকাশ রায়-এর শুভাকাঙ্ক্ষী তখন। সবাই-ই বলে–শরীরটার দিকে একটু নজর দেবেন রায় মশাই, আপনার শরীর ভালো থাকলে তবে আমরা ভালো থাকবো
প্রকাশ রায় বলে–কিছু ভেবো না হে তোমরা, আমি তোমাদের সকলের ভালো করবো–
তারপর কীর্তিপদ মুখোপাধ্যায়ের গড়গড়ার নলটা মুখে দিয়ে ধোঁয়া টানতে টানতে বলে–আরে জামাইবাবুই যে সব কেস খারাপ করে দিয়ে গেল। জামাইবাবু যদি সব জমি জমা বেচে না দিত তো দেখতে আমি তোমাদের সকলের খাজনা মকুব করে দিতুম।
ভীম বিশ্বাস জিজ্ঞেস করে–তা জমি-জমা সব বেচে দিতে গেলেন তিনি কার জন্যে? ছেলে নেই মেয়ে নেই বউ নেই, অত টাকা ব্যাঙ্কে রেখে গেলেন কার জন্যে? অত টাকার সুদ কে খাবে?
অশ্বিনী ভট্টাচার্য বলে–আপনার জন্যেই সব রেখে গেলেন রায় মশাই। আপনিই তো সারাজীবন ভগ্নিপতির সেবা করেছেন। এ সেই সেবার দাম–
–আরে রামঃ, আমি ওই টাকা ছোঁব? পরের টাকা ছুঁতে আমার বয়ে গেছে না। যার টাকা সে ফিরে এলেই তাকে ব্যাঙ্কের পাসবই ফেলে দেব। বলবো–তোর টাকা তুই নে বাবা, আমাকে এই ঝঞ্ঝাট থেকে মুক্তি দে–
ভীম বিশ্বাস বলে–তা এতদিন হয়ে গেল, আপনার ভাগ্নে কি আর ফিরবে রায় মশাই, ফিরলে এতদিন কবেই ফিরতো।
প্রকাশ বলে–না ফিরলে আর আমি কী করতে পারি বলো, আমি তো আর তাকে খুঁজতে কসুর করিনি। সারা দুনিয়া খুঁজে বেড়িয়েছি। আমি যথাসাধ্যি করেছি আমার ভাগ্নের ভালোর জন্যে। ছোটবেলা থেকে তাকে আগলে আগলে মানুষ করেছি যাতে বদ ছেলেদের সঙ্গে মিশে বিগড়ে না যায়–
ভীম বিশ্বাস বললে–তা হলে মনে করে নিন ও-টাকা ভগবান আপনাকেই দিয়েছেন। ভগবান তো আপনাকে চেনেন, ভগবানের চোখে তো আপনি কোনও পাপ করেননি–
–পাপ?
পাপের নাম শুনেই প্রকাশ রায় ভয়ে লাফিয়ে ওঠে। বলে–ওরে বাবা রে, পাপ আবার করিনি? কত পাপ জীবনে করেছি কে জানে? মানুষ হয়ে জন্মানোই তো পাপ গো! দেখ, রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে আজান্তে কত পিঁপড়ে মাড়িয়ে ফেলছি, পুকুরের মাছ খাচ্ছি, মাংস খাচ্ছি, কত মশা-মাছি মারছি, ওটা পাপ নয়?
–না না, ও পাপের কথা বলছিনে, ও-পাপ কে না করে রায় মশাই? যাঁরা মহাপুরুষ তারাও ওরকম কত পাপ করেছেন।
প্রকাশ বলে–তবে হ্যাঁ, তোমরা যদি মদ খাওয়াকে পাপ বলো তো মদ কখনও চোখেই দেখিনি, তো খাওয়া! মদের গন্ধ কখনও কখনও রাস্তায়-ঘাটে নাকে গেছে বটে, সে মিথ্যে কথা বলব না। আর মেয়েমানুষ? তা মেয়েমানুষ মাত্রকেই আমি মা বলে ডাকি, সে তো তোমরা নিজেরাই জানো
সবাই স্বীকার করে রায় মশাই-এর মত দেবতুল্য মানুষ ভাগলপুরে আর নেই।
প্রকাশ বললে–কিন্তু আমি একলা ভালো হলে হবে কি? সারা পৃথিবীর লোক যে সব খারাপ হয়ে গেল, সেইটেই যে আমার দুঃখ গো
অশ্বিনী ভট্টাচর্যি বলে–ও-নিয়ে আর আপনি ভাববেন না রায় মশাই, ও ভাবতে গেলে মাঝখান থেকে আপনারই শরীর খারাপ হয়ে যাবে। এই যে আপনি আপনার ভাগ্নের কথা ভাবছেন, এ কেউ ভাবে? অন্য লোক হলে এতদিনে ভগ্নিপতির সম্পত্তি খেয়ে ফেলতো। আপনি বলেই তাই এখনও ভাগ্নের আসার পথ চেয়ে বসে আছেন–
ভীম বিশ্বাস বলে–আপনার ভাগ্নের তো বিয়েও হয়েছিল?
–আর আমিই তো বিয়ে দিয়েছিলুম তার। বেশ সদ্বংশ থেকে রূপসী মেয়ে দেখে ভাগ্নেবউ করেছিলুম। কিন্তু এই যে বললুম, বেটা ছড় খেয়ে গেল
–ছড় খেয়ে গেল মানে?
–ছড় খেয়ে গেল মানে চরিত্র নষ্ট করে ফেললে। মানুষের আসল জিনিস হলো চরিত্র! সেইটেই যদি নষ্ট হলে তো থাকলোটা কী? নিজের বউকে ফেলে রেখে কি না কলকাতায় চলে গেল। আগে একবার পুলিসে ধরে নিয়ে গিয়ে ওই ভাগ্নেকেই জেলে পুরেছিল, তা জানো?
–কেন?
–আবার কেন? ওই চরিত্র। চরিত্রটি যার নষ্ট হয়েছে তার তো ইহকালও নেই পরকালও নেই। আমি তো তাই জামাইবাবুকে বলতুম যে আপনার সব ভালো জামাইবাবু, শুধু আপনার ছেলেটি হয়েছে বেয়াড়া–
–তা তারপর কী হলো?
–তারপর সেই আমি! আমিই কলকাতায় গিয়ে পুলিসের কর্তাকে হাতে-পায়ে ধরে তবে আবার তাকে ছাড়িয়ে আনি। ওই ভাগ্নের জন্যে কি আমি কম করেছি হে? তা অত যে করলুম, সব আমার দিদির জন্যে। আমি যে ভাগলপুরে এসে আমার পিসেমশাইকে দেখবো, কি বউ-ছেলে-মেয়ে দেখবো তার তো উপায় ছিল না তখন। এখানে আসতে চাইলেই দিদি কান্নাকটি করতো। বলতো–তুই চলে যাসনি প্রকাশ, তুই চলে গেলে আমার সদা গোল্লায় যাবে–তা যে গোল্লায় যাবে প্রতিজ্ঞা করে, তাকে কি ভগবানই বাঁচাতে পারে গো?
