–তা শীতেশবাবু ধরলে আর তুমিও তাই খেলে? পয়সা খরচ না-ই বা হলো, কিন্তু তুমি কোন আক্কেলে ওই ছাই-পাঁশ খেলে তাই আমি জিজ্ঞেস করছি? তুমি ছেলেমানুষ নাকি যে তোমাকে ধরলে আর তুমিও খেলে? তোমার নিশ্চয়ই খেতে ইচ্ছে করেছিল?
নিখিলেশ আমতা-আমতা করতে লাগলো। বললে–আজ খেয়েছি বলে কি আমি রোজই খাবো? একদিন খেলে কী এমন দোষ হয়?
–মানুষ যখন নেশা করে তখন প্রথম প্রথম ওই একদিনই খায়! ওই একদিন একদিন করতে করতেই শেষকালে তার নেশা হয়ে যায়। তা জানো না?
তারপর যেন কথা বলতে বলতে হঠাৎ পাশের ঘরের রোগীর কথাটা মনে পড়লো। বললে–আমি অফিসে যাচ্ছি না বলে তুমি মনে করেছ তোমার যা-ইচ্ছে-তাই করবে? এদিকে বাড়িতে এই বিপদ, আর ওদিকে তুমিও হয়েছ তেমনি। আমি একলা কোন্ দিক সামলাই বলো তো?
নিখিলেশ বললে–আমি তো তখনই বলেছিলুম ওকে হাসপাতালে পাঠাতে–
নয়নতারা বললে–তুমি আর কথা বোল না, কথা বলতে লজ্জা করে না তোমার! বিপদের সময় কোথায় তুমি আমাকে একটু সাহায্য করবে তা নয় কোত্থেকে কার কথায় মদ গিলে এলে! অফিস থেকে সোজা বন্ধুদের সঙ্গে গল্প না করে বাড়িতে আসতে পারো না? দেখ তো আমি এই দিনরাত রোগী নিয়ে পড়ে আছি, কত কাল ঘুমোতে পর্যন্ত পাইনি, ডাক্তারবাবু তো সেই কথাই বলছিলেন, বলছিলেন এরকম করে মাসের পর মাস না-ঘুমিয়ে কাটালে আমারও কোন দিন সিরিয়াস অসুখ হয়ে যাবে।
নিখিলেশ বললে–তা আমি কী করতে পারি বলো?
নয়নতারা বললে–তুমি? তুমি তো আমাকে একটু সাহায্য করলেও পারো।
–আমি তোমাকে সাহায্য করবো?
–তা করলে ক্ষতিটা কী? গিরিবালা বুড়ো মানুষ, একলা ও কি এত দিক সামলাতে পারে? আমারও শরীরে আর বইছে না। কোন্ দিন আমিও হয়ত বিছানায় শুয়ে পড়বো, তখন যে কী হবে ভগবান জানে! তুমি তো বেশ নেশা করে আরামে ঘুমোচ্ছ, আর আমার কথাটা একবার ভাবো দিকিন
নিখিলেশ বললে–আমি ও-সব কথার জবাব দিতে চাই না, এখন কী করতে হবে তাই বলো–
–ডাক্তারবাবুকে গিয়ে এখুনি একবার ডেকে নিয়ে আসতে হবে। বলবে রোগীর অবস্থা খুব খারাপ–
–এখন ক’টা বেজেছে?
–দু’টো।
–নিখিলেশ বললে–কাল ভোরবেলা গেলে হয় না?
–ভোরবেলা হলে তো আর তোমাকে বলতে আসতুম না, তখন তো গিরিবালাও যেতে পারতো, পারলে আমিও যেতুম। কিন্তু এই মাঝ রাত্তিরে কী করে যাই বলো? তোমার এতটুকু আক্কেল নেই? ডাক্তারবাবুই বা কী ভাববেন বলো তো? ভাববেন বাড়িতে পুরুষমানুষ থাকতে মিস্টার ব্যানার্জি কি না তার বউকে এত রাত্তিরে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে–
নিখিলেশ রেগে গেল। বললে–কিন্তু কে তোমাকে সাধ করে এই ঝঞ্ঝাট মাথায় তুলে নিতে বলেছিল বলো তো? আমরা তো বেশ সুখে-শান্তিতে ছিলুম। কোনও অশান্তি ছিল না আমাদের। তুমিও তো এই ঝঞ্ঝাট বাধালে–
নয়নতারা বললে–এখন আর সেই পুরোন কাসুন্দি ঘাঁটবার সময় নেই তুমি তাড়াতাড়ি একটা সোয়েটার গায়ে দিয়ে নাও, শেষকালে আবার ঠাণ্ডা লাগিয়ে সর্দি বাধিয়ে বসবে—যাও–
নিখিলেশের তখন আর আপত্তি করবার সময় ছিল না। আলনা থেকে সোয়েটারটা নিয়ে গায়ে গলিয়ে নিলে। তারপর আলোয়ানটা জড়িয়ে বাইয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো। পেছনে নয়নতারা দরজায় খিল লাগিয়ে দিয়ে আবার রোগীর মাথায় আইসব্যাগ দিতে বসলো।
৩.৬ মানুষ সম্পত্তি যখন করে
মানুষ সম্পত্তি যখন করে তখন পুরুষানুক্রেমে ভোগ-দখল করবে, এই আশা নিয়েই করে। কবেকার কোন্ আলীবর্দী খাঁ বা মীরজাফর খাঁর আমলের বংশ কোথা দিয়ে কেমন করে কত যুগ-পরিক্রমা করে হাজার শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছিল। তাদের মধ্যে কে কোথায় ছিটকে ছড়িয়ে পড়েছিল কেউ তা জানতো না। ঘটনাচক্রে হঠাৎ দেখলেও হয়ত তারা পরস্পরকে চিনতে পারতো না। কিন্তু সেই বৃহৎ মহীরুহের একটা ছোট শাখা একদিন নদীয়া জেলার একটা অখ্যাত গ্রামে কেমন করে আবার ইতিহাসের সমুদ্রে বুদ্বুদের সৃষ্টি করতে পেরেছিল, তাও চৌধুরী মশাই-এর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কোথায় তা নিঃশব্দে মিলিয়ে গেল।
কিন্তু প্রশ্ন তা নয়। প্রশ্নটা হলো সরকারী সেরেস্তার খাতায় এ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে কার নাম লেখা হবে? কে সেই আইনসঙ্গত উত্তরাধিকারী? কীর্তিপদ মুখোপাধ্যায়েরও কোনও পুত্র-সন্তান নেই। কন্যা-সন্তান ছিল একটা, তাও মারা গেছে। এবার জামাই হরনারায়ণ চৌধুরীও গেল। রইল শুধু সদানন্দ। সদানন্দ চৌধুরী। কিন্তু কোথায় সে? কে বলে দেবে তার সন্ধান? সে তো কবে থেকেই নিরুদ্দেশ! কিন্তু যদি বেঁচে থাকে সে? তাহলে তো সে একলাই এই দুই জমিদারের সম্পত্তির অধিকারী। সে যদি এখন হঠাৎ এসে তার পৈতৃক সম্পত্তির মালিকানা দাবি করে বসে তখন কোথায় থাকবে প্রকাশ? প্রকাশ রায়?
প্রকাশ রায় আর দেরি করলে না। শুভস্য শীঘ্রং, কিন্তু অশুভস্য শুধু কালহরণং!
বউ ছেলে-মেয়েকে সে আগেই জামাইবাবুর বাড়িতে উঠিয়ে এনেছিল।
অশ্বিনী ভট্টাচার্যির চোখের সামনেই সে সমস্ত কিছুর মালিক সেজে বসলো। সুলতানপুরের লোক সবাই রাতারাতি ভক্ত হয়ে পড়লো প্রকাশ রায়ের। কীর্তিপদ মুখোপাধ্যায় ঠিক যেমন করে বৈঠকখানা ঘরে পায়ের ওপর পা তুলে আরাম-দরবার বসানে, প্রকাশ রায়ও ঠিক তেমনি পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে আরাম-দরবার বসাতে লাগলো। ব্যাঙ্কের টাকা কড়ি যা কিছু তাতে হাত দেওয়া গেল না। ব্যাঙ্কের ম্যানেজার বললে–টাকা তো আপনাকে দিতে পারবো না, আপনিই যে হরনারায়ণ চৌধুরীর আইনসম্মত উত্তরাধিকারী তার প্রমাণ চাই
