এর উত্তরে নয়নতারা কিছুই বলেনি। আর বলবার ছিলও না কিছু। মানুষটা রোগ থেকে সেরে উঠে যত তাড়াতাড়ি চলে যায় সেই প্রার্থনাই সে কেবল করতো ভগবানের কাছে। মানুষটা চলে গেলেই সে আবার আগেকার মত নিয়ম করে অফিসে যেতে পারবে, আবার নিখিলেশেরও দেখাশোনা করতে পারবে নিয়ম করে। অফিসে যাবার আগে যখন নিখিলেশ খেতে বসতো তখন মাঝে-মাঝে নয়নতারা কাছে এসে দাঁড়াতো। বলতো–এ কি, তুমি কিছু খেলে না যে?
নিখিলেশ বলতো–আমার কথা তোমায় ভাবতে হবে না–
নয়নতারা বলতো–বা রে, ভাবতে হবে না মানে? আমি ভাববো না তো কে ভাববে? তোমার তো ট্রেনের দেরি আছে এখনও–আর দুটো ভাত নাও–
কিন্তু নিখিলেশ তার আগেই জায়গা ছেড়ে উঠে পড়তো। নয়নতারা বলতো–এ রকম করে খেলে তোমার শরীর কী করে টিকবে বলো তো?
–না, আমার আর ক্ষিদে নেই—
বলে কারো কথা না শুনে সোজা অফিসে চলে যেত। এরকম প্রায়ই হতো। তখন অন্তত আর এরকম হবে না। সংসারের কত কাজ পড়ে আছে, কোনও দিকে দেখতে পারছে না নয়নতারা। বিছানার চাদর ছিঁড়ে গেছে, ঘরের দেয়ালে সিলিং এ ঝুল জমেছে, কোনও দিকে দেখবার সময় পাচ্ছে না সে। এবার মানুষটা ভালো হয়ে গেলে সে আবার সমস্ত দেখতে পারবে। আবার নিখিলেশের অফিস যাবার পর সে নিজেও অফিসে যাবে, আবার ফেরার সময় একসঙ্গে এক গাড়িতে অফিস থেকে ফিরবে।
–দিদিমণি, নতুন বাবু কেমন করছে–
গিরিবালার কথায় খেতে খেতে নয়নতারা খাবার ফেলে দিয়ে উঠলো। বললে–কী রকম করছেন?
গিরিবালা বললে–খুব কষ্ট হচ্ছে বোধ হলো, কেমন যেন ছটফট করছেন—
নয়নতারা বললে–তুমি খেয়ে নাও, আমি যাচ্ছি–
বলে তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে সোজা রোগীর ঘরে গিয়ে নয়নতারা দেখলে সদানন্দ মাথাটা বালিশের ওপর একবার এদিক একবার ওদিক করছে। এমন তো হয় না। নয়নতারার মনে হলো যেন খুব যন্ত্রণা হচ্ছে তার। যেন যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছে না। সমস্ত শরীরটা যেন যন্ত্রণায় ফুলে ফুলে উঠছে–
নয়নতারা সদানন্দর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলতে লাগলো–কষ্ট হচ্ছে তোমার? কী কষ্ট হচ্ছে তোমার বল আমাকে। ডাক্তারবাবুকে একবার ডাকবো?
রাত বোধ হয় তখন দুটো। নিখিলেশ অঘোরে ঘুমোচ্ছিল। হঠাৎ একটা ডাকাডাকিতে তার ঘুম ভেঙে গেছে। নিখিলেশ চোখ মেলে দেখলে সামনে নয়নতারা।
নয়নতারা তাকে ঠেলতে ঠেলতে বললে–ওগো, আমার খুব ভয় করছে, তোমাকে একটা কাজ করতে হবে–
নিখিলেশের ঘুমের জড়তা তখনও কাটেনি। লেপটা সরিয়ে কোনও রকমে উঠে বসলো। কিন্তু তার চোখে-মুখে তখনও তার ঘোর। নয়নতারা বললে–ওগো, একটু ওঠো না–
নিখিলেশ উঠলো। বললে–কি করতে হবে?
নয়নতারা বললে–ও-ঘরে ও কেমন করছে–
নিখিলেশের চোখে যেটুকু জড়তা ছিল তাও কেটে গেল। বললে–তা আমি কী করবো?
নয়নতারা বললে–ডাক্তারবাবুকে একবার ডেকে নিয়ে আসতে হবে। ও যন্ত্রণায় ছটফট করছে, ডাক্তারবাবুকে একবার না ডেকে পাঠালে আমি স্থির থাকতে পারছি না, আমার বড় ভয় করছে–
নিখিলেশ বললে–তা ঠাণ্ডার মধ্যে কি ডাক্তারবাবু আসবেন? আর এই এত রাত্তিরে? কাল সকালে গেলে হয় না?
নয়নতারা বললে–কিন্তু আমি যে ভালো বুঝছি না গো। রাতটা যদি না কাটে? ডাক্তারবাবু আমাকে বলে গেছেন যত রাত্তিরই হোক তাঁকে ডাকলে তিনি আসবেন–
নিখিলেশ বললে–কিন্তু আমি কী করে যাই?
–তা তুমি না গেলে কে যাবে? বাড়ীতে তুমি ছাড়া আর কে আছে? গিরিবালা মেয়েমানুষ, এই রাত্তিরে কী তাকে বাইরে পাঠানো ভালো? আর একা আমি আছি, তা তুমি যদি বলো তো আমিই যাই–
নিখিলেশ বিরক্ত হয়ে গেল। একে সন্ধ্যেবেলা শীতেশের সঙ্গে হোটেলে গিয়ে ওইটে খেয়েছে, তার ওপর শীতের ঠাণ্ডা, আর তারই ওপর অসময়ে ঘুম ভাঙানো। বললে–এই জন্যেই তো তোমাকে বলেছিলুম ওকে পাসপাতালে পাঠাতে–
নয়নতারা রাগ করলে না নিখিলেশের কথা শুনে। বললে–দেখ, এখন সেকথা তুলে লাভ নেই, আমি হয়ত ভুলই করেছি, কিন্তু তুমি কী চাও আমার ভুলের জন্যে একটা মানুষ মারা যাক?
কথাটা বলতে গিয়ে নয়নতারা নিখিলেশের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ যেন ধাক্কা খেয়ে পেছনে সরে এল। কী যেন একটা সন্দেহ হলো তার। বললে–তুমি মদ খেয়েছ?
নিখিলেশ কী বলবে বুঝতে পারলে না।
নয়নতারার সন্দেহ তখন কেটে গেছে। বললে–সে কী, তুমি মদ খেলে কী বলে? তুমি তো আগে মদ খেতে না? সত্যি বলো না, তুমি মদ খেয়েছ? সত্যি?
নিখিলেশের মুখে তখন আর কোনও জবাব নেই। তার অপরাধ ধরা পড়ে গেছে জেনে সে নতুন কিছু কৈফিয়ৎ খোঁজবার চেষ্টা করেও হতাশ হয়ে যেন হতবাক হয়ে গেছে।
নয়নতারা বললে–এদিকে আমি ভাবছি বুঝি অফিসের কাজের চাপে দেরি করে বাড়ি ফিরছ। তা আমি সঙ্গে থাকি না বলে তুমি এই রকম করে মদ খাবে? তুমি কি রোজই মদ খেয়ে বাড়ি ফেরো নাকি? আমি তো কিছুই জানতে পারিনি–রোজই মদ খাও তুমি?
নিখিলেশের বিবেক যেন কোথায় বাধলো। বললে–না, আজকেই শুধু খেয়েছি–
–কখনো হতে পারে না, নিশ্চয়ই তুমি আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে রোজ যাও, নইলে বাড়ি আসতে তোমার এত দেরি হয় কেন রোজ?
নিখিলেশ বললে–না, সত্যিই রোজ খাই না–
–তো হলে আজই বা খেলে কেন? যে-জিনিস খাও না তা হঠাৎ আজই বা খেতে গেলে কেন?
নিখিলেশ বললে–শীতেশ খুব করে ধরলে তাই–ও-ই পয়সা খরচ করে খাওয়ালে।
