কিন্তু দীনুর কাছ থেকে কোনও প্রতিকার পাবে না জেনে আর সেখানে অপেক্ষা করলে না। একেবারে সোজা দাদুর ঘরে গিয়ে পৌঁছোল। সেখানে তখন বীভৎস কাণ্ড চলছে। ঘরের মধ্যে দাদু নিজের লোহার সিন্দুকটার পাশে বসে আছে, আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে কৈলাস কাকা। আর তাদের সামনে বংশী ঢালী কপিল পায়রাপোড়ার মাথার চুলের ঝুঁটি ধরে আছে আর বলছে–বল, কর্তাবাবুকে কেন ঠকালি বল–
কিন্তু কপিল বলবে কী? তাকে কথা বলবার ফুরসৎই দিচ্ছে না বংশী ঢালী। এক হাতে চুলের ঝুঁটি ধরে অন্য হাতে পটাপট মুখে ঘুষি মেরে চলেছে। আর দাদু বংশীকে উৎসাহ দিয়ে চলেছে–মার মার বেটাকে, মেরে ফেল, আমার সঙ্গে শয়তানি, আরো মার–
সদানন্দ আর থাকতে পারলে না। একেবারে ঝাঁপিয়ে গিয়ে পড়লো দাদুর সামনে। বললে–দাদু, ওকে মারছো কেন? ও তো বেলুনের দাম নেয় নি, অমনি দিয়েছে। ওই তো কৈলাস কাকা জানে, কৈলাস কাকাকে জিজ্ঞেস করো না–ও কৈলাস কাকা, তুমি বলছো না কেন, ও কৈলাস কাকা–
কিন্তু কর্তাবাবু বিরক্ত হয়ে উঠলেন নাতির কথায়। প্রথমটায় তিনি যেন একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বলে উঠলেন–আরে, এখানে তুই এলি কেন? ও দীনু, দীনু কোথায় গেলি? ও দীনু, খোকাকে এখানে আসতে দিলি কেন, ওরে দীনু ওকে নিয়ে যা এখেন থেকে–
সদানন্দ নাছোড়বান্দা। বললে–আমি যাবো না এখান থেকে, আগে তুমি আমার কথার জবাব দাও
সদানন্দও যাবে না, কর্তাবাবুও ছাড়বে না। ততক্ষণে দীনু এসে গেছে। এসে জোর করে হাত ধরে টানতে টানতে চ্যাংদোলা করে সদানন্দকে ঘরের বাইরে নিয়ে গেল। কিন্তু তখনও ঘরের ভেতর থেকে কপিলের কান্নার আওয়াজ তার কানে আসছিল।
.
এ-সব কতকালকার আগেকার কথা। তবু সদানন্দর যেমন মনে আছে, নবাবগঞ্জের সেকালের যারা আজো বেঁচে আছে তাদেরও মনে আছে। মনে আছে শেষকালে ছেলে মেয়ে-বউকে খেতে না দিতে পেরে সেই কপিল পায়রাপোড়া একদিন নবাবগঞ্জ থেকে কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেল কেউ টের পেলে না। কপিল পায়রাপোড়ার কাকা প্রথমে কিছুদিন তার ছেলে-মেয়েদের দেখেছিল। তারপর দেখা গেল একদিন ওই বারোয়ারি-তলার বটগাছের ডালে কপিলের ধড়টা ঝুলছে। একটা গরু বাঁধা দড়ি দিয়ে গলাটা বেঁধে কখন হয়ত ঝুলে পড়েছিল কেউ দেখতে পায় নি।
তারপর পুলিস-থানা-দারোগা-কোর্ট-কাছারি অনেক কিছু হলো তাই নিয়ে। আবার সে ঘটনার ঢেউ একদিন থেমেও গেল। কিন্তু সদানন্দর মন থেকে তা আর মুছলো না।
এ-সব ছোটখাটো ঘটনা। কিন্তু ছোটখাটো ঘটনাগুলোই সদানন্দর মনের ভেতরে জমে জমে পাহাড় হয়ে উঠতে লাগলো। প্রকাশ মামা জিজ্ঞেস করতো–হা রে, তুই কী ভাবিস রে এত?
তখন সদানন্দ একটু বড় হয়েছে। বলতো–আচ্ছা মামা, তোমার এই সব ভালো লাগে?
প্রকাশ মামা তো অবাক। সে শুধু জানে ফুর্তি করা আর খাওয়া-দাওয়া হই-হুল্লোড় করে কাটিয়ে দেওয়া। ভালো খাও, ভালো পরো, দু’হাতে টাকা উপায় করো আবার দুই হাতে সেই টাকা খরচ করো। ভাগ্নের কথা শুনে বললে–কী ভালো লাগে?
সদানন্দ বললে–এই তুমি যা করো সারাদিন?
–আমি সারাদিন কী করি?
–এই আরাম করে খাও, বারোয়ারিতলায় গিয়ে আড্ডা দাও, তাস খেলো, তারপর গাণ্ডে-পিণ্ডে খাও। খেয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোও, তারপরে ঘুম থেকে উঠে সন্ধ্যেবেলা এ-গাঁ ও-গাঁ করে বেড়াও; আর তারপর রাত্তিরে এসে আবার ঘুমিয়ে পড়ো।
প্রকাশ মামা বললে–আমি যা করি এ তো সবাই করে রে। কেন, এতে দোষটা কী? আমি চুরিও করছি না কারো, বাটপাড়িও করছি না। আমার বাপ-কাকা-জ্যাঠা চোদ্দ পুরুষ চিরকাল এই জিনিসই করে এসেছে, আবার আমিও তাই করবো। আবার তুইও যখন বড় হবি তখন তুইও তাই করবি। এই-ই তো নিয়ম রে–
সদানন্দ বললে–কিন্তু আমার যে ও-সব করতে ভালো লাগে না মামা। জানো, কপিল পায়রাপোড়াকে তুমি চিনতে?
–কপিলকে? সেই শয়তানটাকে? চিনবো না? ব্যাটা এক নম্বরের আহাম্মক ছিল একটা। শেষকালে তাই অপঘাতে মরতে হলো। যেমন কম্ম তেমনি ফল!
সদানন্দ বললে–-দেখ প্রকাশ মামা, আজকাল সবাই তার কথা ভুলে গেছে। আমার বাবা-মা কারোরই হয়ত মনে নেই। আমার দাদুরও হয়ত মনে নেই তার কথা। ওই বারোয়ারীতলায় যখন সে আত্মঘাতী হলো সবাই-ই তা দেখেছে। দেখে সবাই-ই শিউরে উঠেছে। কিন্তু আজকে আর কারো সে-কথা মনে নেই, জানো–
প্রকাশ মামা হো হো করে হেসে উঠলো। বললে–তুই তো দেখছি একটা আস্ত পাগল রে, অত কথা মনে রাখতে গেলে মানুষের চলে! সংসারে একদিন তো সবাই মরবে। সকলেরই বাবা মরবে, ঠাকুর্দাদা মরবে, মা মরবে। প্রথম প্রথম লোকে সেজন্যে একদিন কাঁদবে। কিন্তু তারপর? তারপর বেশি কান্নাকাটি চালিয়ে গেলে সংসার চলে? আমার তো বাবা-মা যাবার পর খুব কেঁদেছিলাম, তা এখন কি আর কাঁদছি? আমায় কাঁদতে দেখেছিস কখনও সেজন্যে? তুই যে আমাকে অবাক করলি সদা!
সদানন্দ বললে–কিন্তু মামা, আমি কেন কিছুই ভুলতে পারি না। আমার কেন সব মনে থাকে? কপিল পায়রাপোড়ার কথা আমার সব সময়ে যে মনে পড়ে। রাত্তিরে শুয়ে-শুয়ে ভাবি, দিনের বেলা ইস্কুলে পড়তে পড়তে ভাবি, ভাত খেতে খেতে ভাবি…
প্রকাশ মামা ভাগ্নের কথা শুনে ভয় পেয়ে গেল। বললে–এই রে খেয়েছে…
সদানন্দ বললে––কেন? কী করলুম আমি?
–তোর তো দেখছি মাথা খারাপের লক্ষণ! এ তো ভালো কথা নয়! ডাক্তার দেখাতে হয়–
