.
–দিদিমণি–দিদিমণি–
গিরিবালার গলার আওয়াজ পেয়ে নয়নতারা হাতের আইসব্যাগটা পাশে রেখে উঠলো। ঘরের দরজাটা খুলে দিয়ে বললে–কী গো, কী?
হাতের ওষুধটা বাড়িয়ে দিলে গিরিবালা।
–ও মা, তুমি কখন ওষুধ আনতে গেলে আমাকে তো বলে যাওনি কিছু—
গিরিবালা বললে–বাবু যে বাড়ি এল তাই আর তোমাকে ডাকিনি—
নয়নতারা অবাক হয়ে গেল। বললে–বাবু? বাবু কখন এল? আমি তো টের পেলুম না, কখন এল বাবু?
আশ্চর্য! কিছুই টের পায়নি সে। ওষুধটা রেখে নয়নতারা তাড়াতাড়ি তার শোবার ঘরে ঢুকে দেখলে নিখিলেশ অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
নয়নতারা অবাক হয়ে গেল নিখিলেশের কাণ্ড দেখে। আগে যখন দুজনে অফিসে যেত তখন তো এত দেরি করে অফিস থেকে আসতো না!
নয়নতারা বললে–শুনছো—ওগো—
তবু কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।
নয়নতারা আবার ডাকলে–ওগো শুনছো–
তারপরে বাইরে এসে গিরিবালার কাছে গেল। বললে–হ্যাঁ গো গিরিবালা, বাবু কি না খেয়েই শুয়ে পড়েছে নাকি?
গিরিবালা বললে–না দিদিমণি, আমি জিজ্ঞেস করেছিলুম, বাবু বললেন আজ কিছু খাবেন না, অফিস থেকেই খেয়ে এসেছেন–
–কী মুশকিল! ভাতগুলো নষ্ট হলো তো! বললে–ভাতগুলোতে জল ঢেলে রেখে দিও, কাল সকালে না হয় আমিই জল দেওয়া ভাত খাবো–
বলে আর দাঁড়ালো না সেখানে। তখন আর দাঁড়াবার সময়ও ছিল না তার। ওদিকে ওঘরে মানুষটা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছে। মাথায় আইসব্যাগ দিতে দিতে উঠে এসেছে, আবার রোগীর কাছে এসে বসলো সে। এ ক’দিন যে কী বিপদের মধ্যে দিয়ে কাটছে তার ঠিক নেই। মানুষটার সমস্ত শরীর এই দু’মাসের মধ্যেই হাড়-সার হয়ে গিয়েছে।
–দিদিমণি!
নয়নতারা দরজার দিকে চেয়ে দেখলে গিরিবালা দাঁড়িয়ে।
–খাবে না?
ঘড়ির দিকে চাইতেই খেয়াল হলো রাত দশটা বেজে গেছে। কখন যে রাত দশটা বেজে গেল বুঝতেও পারেনি সে। বললে–তুমি তাহলে এসে এঁর মাথায় আইসব্যাগটা একটু ধরো তো, আমি তাড়াতাড়ি যা-হোক কিছু মুখে দিয়ে আসি–
গিরিবালা এসে আইসব্যাগটা ধরতেই নয়নতারা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। কিন্তু খেতে বসেও নয়নতারা মনটাকে কিছুতেই ওই রোগীর ঘর থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারলে না। গিরিবালার হাতে মানুষটাকে ছেড়ে দিয়েও যেন শান্তি নেই তার। অর কতদিন এমন করে চলবে কে জানে! যে লোকটা এত অহঙ্কার করে তার ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিল সে যে আবার এমন করে সেই তারই আশ্রয়ে এসে তারই কাছ থেকে সেবা পাবে এও বুঝি তার কপালে লেখা ছিল! অনেক দিন রাত্রে মানুষটা তার দিকে চেয়ে চেয়ে কী যেন বলতে চাইতো। অথচ সে কল্পনাও করতে পারতো না যে যার দিকে সে চেয়ে আছে সে নয়নতারা। নয়নতারাকে চিনতে পারলে সে কী করত কে জানে! ডাক্তারবাবুকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল নয়নতারা–আপনি কী রকম বুঝছেন ডাক্তার বাবু? উনি সেরে উঠবেন?
ডাক্তারবাবু বলেছিল–আগের থেকে তো এখন ইমপ্রুভ করেছে। ওষুধগুলো ঠিক ঠিক খাইয়ে যাবেন, তাহলে নিশ্চয়ই ফল পাবেন–
নয়নতারা জিজ্ঞেস করেছিল কিন্তু এখনও লোক চিনতে পারেন না কেন?
ডাক্তারবাবু বলেছিল–লোক চিনতে একটু সময় লাগবে। অত হাই-ফিভার থাকলে ব্রেনের ওপরেও তো তার অ্যাকশান হয়। আজকাল এই রকম রোগী অনেকগুলো পাচ্ছি। এই নতুন ধরনের টাইফয়েড আজকাল খুব হচ্ছে–
নয়নতারা বলেছিল–অনেকে বলেছিল হাসপাতালে পাঠাতে। আমি কিন্তু আপনার ভরসাতেই রেখেছি। কিছু বিপদ হবে না তো?
ডাক্তারবাবু বলেছিল–এতদিন যখন হাসপাতালে পাঠাননি তখন আর পাঠাবার দরকার নেই, ক্রাইসিসটা কেটে গেছে।
–দেখবেন ডাক্তারবাবু, আমার যেন মুখরক্ষা হয়। নইলে বড় বিপদে পড়বো।
ডাক্তরবাবু জিজ্ঞেস করেছিল–ইনি আপানার কে?
নয়নতারা বলেছিল–আমার খুব বিশেষ আত্মীয়–শ্বশুরবাড়ির লোক–
এঁর স্ত্রী ছেলে-মেয়ে কেউ নেই? বিয়ে হয়েছে এঁর?
নয়নতারা বলেছিল–হ্যাঁ–
–তা এঁর স্ত্রীকে খবর পাঠিয়েছেন? তারা কেউ এলে তো তবু আপনার কষ্টটা একটু কমতো। আপনি কতদিন একলা রাত জাগবেন এমন করে? মাসের পর মাস এমন করে রাত জাগলে শেষকালে আপনিও তো ভেঙে পড়বেন। এর পর যদি আপনি নিজে ভেঙে পড়েন তো তখন সব কিছু যে অচল হয়ে যাবে। তা ছাড়া মিস্টার ব্যানার্জীকে একটু সাহায্য করতে বলেন না কেন? তিনিও তো মাঝে মাঝে এক একদিন রাত জাগলে পারেন–
–তিনি তো সারাদিন অফিস করেন। সেই ভোরবেলা বেরিয়ে যান আর রাত্তির হয় ফিরতে, তাকেই বা কী করে বলি!
–তা হলে আপনার একটা নার্সের ব্যবস্থা করা উচিত। অবশ্য তাতে খুবই খরচ পড়বে। আর একজন নার্সের দ্বারা তো হবেও না, দুজন নার্স দরকার। পালা করে ডিউটি করবে।
নয়নতারা বলেছিল–এতদিনই যখন নার্স না-রেখেই সব কিছু করতে পারলুম, তখন আর কটা দিনের জন্যে কেনই বা বাইরের লোক রাখা! আর তা ছাড়া আমি যেরকম করে দেখাশোনা করবো সেরকম করে কি আর মাইনে করা নার্সরা করবে–
–তা ঠিক। তবে আপনি যা করছেন তা নিজের স্ত্রী তো দূরের কথা, কারো নিজের মা-ও তেমন করে করতে পারতো না।
কথাটা শুনে নয়নতারার মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। বলেছিল–অমন করে বলবেন না। শুধু বলুন, ওঁর যে কষ্টটা হচ্ছে তা যেন তাড়াতাড়ি লাঘব হয়–আমি ওঁর কষ্ট আর দেখতে পারছি না–
ডাক্তারবাবু বলেছিল–ওঁর যা হবার তা তো হচ্ছেই, কিন্তু তার জন্যে আপনার কষ্টটা কি তার চেয়ে কিছু কম হচ্ছে?
