–জবাবদিহি?
কথাটা মনে লাগলো নিখিলেশের। তাকেই তো বরাবর জবাবদিহি দিতে হয়েছে নয়নতারার কাছে। প্রতিটি পয়সা খরচের পর্যন্ত জবাবদিহি করতে হয়েছে নয়নতারার কাছে। অথচ এখন? এখন যে নিজে অন্য একজনের জন্যে অকারণে টাকা খরচ করে যাচ্ছে, তার বেলায়?
বললে–চল উঠি এবারে—
শীতেশ বললেই, আমার কথার জবাব দিচ্ছিস না যে?
নিখিলেশ বললে–জবাব আর কী দেব। তুই তো বিয়ে করলি না। বিয়ে করলে বুঝতে পারতিস।
–কেন, তোর বউ কি গয়না-টয়না চায় বুঝি খুব?
নিখিলেশ বললে–না না, গয়নাটয়না মোটেই চায় না, কলকাতায় শুধু একটা বাড়ি করতে চায়। কলকাতায় নিজস্ব একটা বাড়ি করার খুব শখ নয়নতারার–
বলে নিখিলেশ হঠাৎ উঠে পড়লো। বললে–না আর খাবে না, খেলে গাড়ির লোক সব জানতে পারবে–
–জানতে পারলে তো বয়ে গেল। আমার পাড়ার লোক তো সবাই জানে আমি মদ খাই। কে মদ খায় না শুনি? সবাই তো খায়? সবাই লুকিয়ে লুকিয়ে খায় আর আমি বুক ফুলিয়ে খাই, এই যা তফাত। তারা তো মদ খাওয়ার চেয়েও আরো বড় বড় পাপ করছে–
নিখিলেশ বললে–কী পাপ?
–তুই তো জনিস সব, আমাকে আর কেন জিজ্ঞেস করছিস? আমাদের অফিসে দেখছিস না কত টাকার ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে কোম্পানি? সেটা পাপ নয়? পলিটিক্যাল-পার্টির ফাণ্ডে চাঁদা দিচ্ছে বলে তাই গভর্ণমেন্টও কিছু বলছে না। আর আমরা তো শুধু নিজের গাঁটের পয়সায় মদ খাচ্ছি, এটা আর এমন কি অপরাধ?
তখন বিল চুকিয়ে দিয়েছে শীতেশ। নিখিলেশ বাইরের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালো। বললে– ও-সব বড় বড় কথা ভাই আমাদের আলোচনা করা শোভা পায় না। এরই মধ্যে বেঁচে থাকতে হবে, এরই মধ্যে আমাদের মরতে হবে। আমরা তো রামমোহন রায়ও নয়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও নয়, নেহাৎ হরিপদ কেরানী, কষ্টে-সৃষ্টে যদি কোনও দিন ধার-দেনা করে কলকাতায় একটা বাড়ি করতে পারি তাহলেই আমাদের চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার হয়ে যাবে–
–আয়, একটা পান খাই–
–পান কেন?
–তাহলে তোর নয়নতারা আর গন্ধ টের পাবে পাবে না–পান খেলে মুখের সব গন্ধ ঢেকে যায়–
নিখিলেশ নৈহাটির রাস্তায় চলতে চলতে ভাবছিল সত্যিই কেউ তার মুখের গন্ধ টের পাচ্ছে কিনা। না, তা পাচ্ছে না। পেলে গাড়িতেই সবাই টের পেত। গাড়িতেও অনেক চেনা শোনা লোকের সঙ্গে বাধ্য হয়ে কথাবার্তা বলতে হয়েছে।
কিন্তু হঠাৎ এই মনোহর দত্তের কথায় যেন তার নেশা কেটে যাবার উপক্রম হলো। কেন নয়নতারা কথাটা একবার বললে না তাকে! কেন তার শখের সোনার হারটা মনোহর দত্তর দোকানে বাঁধা রাখতে গেল! নিখিলেশ টের পাবে বলে?
বাড়ির সামনে গিয়ে সে দরজার কড়া নাড়বে কিনা ভাবতে লাগলো। কড়া নাড়লেই যদি নয়নতারা দরজা খুলতে আসে! দরজা খুলে যদি তার মুখের গন্ধটা টের পায়? তখন?
গলিরাস্তার ধারেই বাড়িটা। পাশের জানালাটা দিয়ে একবার উঁকি মেরে দেখলে হয়। ভেতরে টিম টিম করে আলো জ্বলছে। জানালার নিচেকার পাল্লা দুটো বন্ধ। ভেতরে যেখানে ভদ্রলোক শুয়ে আছে সেইখানটা দেখতে গেলে জানলার ওপর থেকে উঁকি মারতে হয়।
নিখিলেশ এক কাণ্ড করে বসলো। এককোণ থেকে জানালার পাল্লার ওপর উঠলো। তারপর আস্তে আস্তে নিঃশব্দে ভেতরে চেয়ে দেখলে তক্তোপোশটার ওপর ভদ্রলোক শুয়ে আছে। তার জ্ঞান আছে কি নেই বোঝা যাচ্ছে না। নিথর নিস্পন্দ মানুষটা। পাশ ফিরে শুয়ে আছে। আর তার মাথার কাছে জানালার দিকে পেছন ফিরে বসে নয়নতারা একমনে তার মাথায় আইসব্যাগ লাগিয়ে দিয়ে বসে আছে।
নিখিলেশ অনেক্ষণ ধরে একদৃষ্টে সেই দিকে চেয়ে দেখতে লাগলো।
আশ্চর্য! যে মানুষটা একদিন নয়নতারার ওপরে অত্যাচার-অপমানের শেষ রাখেনি, যে মানুষটা একদিন নয়নতারার জীবনটা বিষিয়ে দিয়েছিল, যার জন্যে একদিন নয়নতারা যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে সিঁথির সিঁদুর হাতের নোয়া সব কিছু মুছে আবার কুমারী হয়ে উঠেছিল, সেই তাকেই কিনা এই অমানুষিক সেবা! এও কি এক ভাগ্যের পরিহাস নয়! এ কেমন করে সম্ভব হলো! এই লোকটাই জন্যেই তার অত সাধের সোনার হারটা পর্যন্ত স্যাকরার দোকানে বাঁধা রেখে দিতে নয়নতারার বাধলো না! নারী-চরিত্র কি এমনিই বিচিত্র জিনিস!
সেখানে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা উঁকি মেরে দেখতে দেখতে নিখিলেশের নিজেরই লজ্জা করতে লাগলো। এ কী করছে সে! তার নিজের বাড়ি, তার নিজের স্ত্রী, তবু নিজের বাড়ির ভেতরে চেয়ে দেখবার সাহস নেই তার। এ কী কমপ্লেক্স তার, এ কী তার ব্যবহার!
নিখিলেশ তাড়াতাড়ি জানালা থেকে নেমে পড়লো। তারপর পাশের উঠোনের দিকের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নিজের মনকে শক্ত করে নিলে সে। না, সে কিছুই অপরাধ করেনি। এমন কিছু করেনি যে যার জন্যে নিজের বাড়িতে ঢুকতে তার লজ্জা করবে।
হাত বাড়িয়ে দরজায় কড়াটা নাড়তে যাবে এমন সময় ভেতর থেকেই দরজাটা হঠাৎ খুলে গেল। দেখা গেল গিরিবালা বেরোচ্ছে।
–গিরিবালা, তুমি কোথায় যাচ্ছো?
গিরিবালা বললে–ওষুধ ফুরিয়ে গেছে, তাই ওষুধ আনতে—
তারপর কী ভেবে নিয়ে বললে–আপনি এখন খাবেন? আপনাকে খাবার দিয়ে যাবো?
নিখিলেশ বললেন, আমি অফিস থেকে খেয়ে এসেছি, খাবো না–তুমি যাও আমি দরজা বন্ধ করে দিচ্ছি–
বলে ভেতরে ঢুকে দরজায় খিল লাগিয়ে দিলে। তারপর আস্তে আস্তে কলঘরে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। আর তারপর চুপি-চুপি বিছানায় শুয়ে পড়ে লেপটা টেনে নিয়ে গায়ে চাপা দিয়ে দিলে।
