কিন্তু সমস্ত কিছু প্ল্যান গোলমাল করে দিলে সদানন্দ এসে। বিনামেঘে বজ্রাঘাতের মত নিখিলেশের সমস্ত জীবন যেন ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে ছত্রখান হয়ে গেল।
অফিসের ভেতরে সেদিন কতক্ষণ কাজ করেছে নিখিলেশ তার খেয়াল ছিল না। যখন ঘড়ির দিকে নজর পড়েছে দেখলে সন্ধ্যে সাতটা বেজে গেছে। খুব শীত পড়েছে।
হঠাৎ শীতেশ নিখিলেশকে দেখতে পেয়েছে। শীতেশ ভৌমিক! আপার ডিভিশন ক্লার্ক। বিয়ে-থা করেনি। যা মাইনে পায় তার সবটাই দু’হাতে ফেলে ছড়িয়ে খরচ করে। সে নিখিলেশের কাছে এসে দাঁড়ালো।
–কী রে, তুই এখনও কাজ করছিস যে?
নিখিলেশ বললে–এই ভাই কিছু এরিয়ার পড়ে ছিল তাই…
শীতেশ বললে–তা তোর স্ত্রী? তোর জন্যে ওয়েট করবে না?
নিখিলেশ বললে–না, আমার স্ত্রী আজকে অফিসে আসেনি–
–অফিসে আসেনি? তাহলে শরীর খারাপ বুঝি? তা ক’টার ট্রেনে তুই বাড়ি যাবি?
নিখিলেশ বললে–-ট্রেনের কি অভাব আছে? অনেক ট্রেন যে-কোনও একটাতে গেলেই হলো। অন্য দিন তো সময় পাই না তাই বাকি কাজগুলো আজকে তুলে ফেলছি
শীতেশের কী হলো কে জানে। বললে–বড় শীত পড়েছে রে, চল্ না কোথাও গিয়ে একটু বসি, গা’টা গরম করি গিয়ে, যাবি?
গা-গরম করা মানেটা যে কী তা নিখিলেশ জানতো। শীতেশের যে সে-অভ্যেস আছে তা কম-বেশি অফিসের সবাই-ই জানে।
শীতেশ বললে–আরে অত ভাবছিস কেন? কাজ তো আছেই, কাজ তো লক্ষ্মী, লক্ষ্মীকে কখনও বাড়ি-ছাড়া করতে নেই, ওঠ ওঠ, আজকে তো আর তোর বউ নেই যে টের পাবে–
নিখিলেশের হঠাৎ মনে পড়লো বাড়িতে গেলেই সেই এক দৃশ্যঃ ডাক্তার আর রোগ! নয়নতারার দেখাই হয়ত পাওয়া যাবে না। গিরিবালাকে ডেকে চুপি চুপি ভাত খেয়ে নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়া। তারপর যদি নয়নতারা দেখতে পায় তো অবাক হয়ে যাবে। বলবে–ওমা, তুমি কখন এলে?
এই ঘটনাই প্রায় প্রতিদিন। প্রতিদিনই বলবে–জানো, ওর জ্বরটা এখনও ছাড়ছে না—
নিখিলেশ এ-কথার কোনও উত্তর দেবে না প্রথমে। এক-একদিন বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে–তা ওর জন্যে এত ভাবনা তোমাকে কে করতে বলেছিল? ওকে হাসপাতালে পাঠালেই পারতে, ওর জ্বরও সেরে যেত–
কিন্তু না, কথাটা বলতে গিয়েও নিখিলেশের মুখে আটকে যেত। বলতে ইচ্ছে হতো– ওর ভাবনাই যদি ভাববে তাহলে আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলে কেন? কেন আমার জীবন এমন নষ্ট করে দিলে তুমি? আমাকে বিয়ে করবার জন্যে কে তোমার পায়ে ধরে সাধাসাধি করেছিল?
না, এসব কথা বলাও শোভা পায় না নিখিলেশের। তাই নিখিলেশ কিছুই বলতো না। আগেও যেমন মাইনের টাকাটা নয়নতারার হাতে দিত, সেবারও তাই দিলে।
নয়নতারা বললে–আমার আমার মাইনেটা?
নিখিলেশ বললে–তা তুমি তো আমাকে পে-অথরিটি দাওনি।
নয়নতারা বললে–আমার কি ছাই মনে ছিল? তুমি তো দেখছো আমার অফিসের কথা ভাববার সময় নেই, দিনরাত কেবল রোগী নিয়ে ব্যস্ত, আমাকে তো মনে করিয়ে দেবে—
.
হঠাৎ শীতেশের কথায় নিখিলেশের যেন চমক ভাঙলো–কী হলো রে, অমন গুম্ মেরে বসে আছিস যে? নেশা হলো নাকি?
নিখিলেশ বললে–না–
–তাহলে–খা!
একটুখানি খেয়েই নিখিলিশের মাথাটা কেমন করছিল। যে-যন্ত্রণাটা এতদিন মনের মধ্যে তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল, সেটা যেন তখন খানিকটা কমলো।
শীতেশ বললে–আমি তো ভাই রোজ খাই। শীতকালে একটু খাওয়া ভালো। ডাক্তার খেতে বলেছে আমাকে–তুইও আর একটু খা–
বলে একজন ওয়েটারকে আর একটু আনতে বললে।
নিখিলেশ বললে–না ভাই, আর খাবো না।
–কেন, খেতে দোষ কী? এ খাওয়া তো পাপ নয় রে—
নিখিলেশ শীতেশের একটা হাত চেপে ধরলে। বললে–না ভাই, প্লিজ, আমি আর খেতে পারবো না, আমাকে বাড়ি যেতে হবে, সাড়ে ন’টায় একটা ট্রেন আছে সেটা ধরতে হবে
শীতেশ বললে–তা যাবি! আমি কি তোকে যেতে বারণ করছি? আমিও তো বাড়ি যাবো। সবাই-ই বাড়ি যাবে। এখানে কেউ কি সারারাত থাকতে এসেছে?
নিখিলেশ বললে–তা নয়, ভাবছি এককালে এই আমিই ভাই মদের দোকানে কতবার পিকেটিং করেছি, আর আমিই আজ সেই মদ খাচ্ছি–
শীতেশ হো হো করে হেসে উঠলো-আরে দূর, তুই কী বলছিস, আমি নিজেও তো একদিন মদের দোকানে পিকেটিং করে জেলে গিয়েছি। তখন মহাত্মা গান্ধী যা বলেছে তাই-ই করেছি। তুই জানিস, আমি নিজের হাতে চরকায় সুতো কেটেছি, সেই সুতোয় ধুতি জামা তৈরি করে পরেছি। কিন্তু এখন তো ইণ্ডিয়া স্বাধীন হয়ে গিয়েছে, এখন কী আর চরকা কাটি না খদ্দর পরি? এখন তো এই দ্যাখ না টেরিলিন ধরেছি, ট্রাউজার বুশ শার্ট পরি–
নিখিলেশ বললে–আমিও তো তাই–
শীতেশ বললে–শুধু তুই আমি কেন রে? এখন তো কেউই আর সে-সব কথা মানে না। যারা তখন মদ ছুঁতো না, তারা সবাই এখন খায়–
নিখিলেশ হঠাৎ বলে উঠলো–তুই আছিস বেশ, বিয়ে-টিয়ে করিসনি, বেশ ফ্রি। কাউকে কোনও জবাবদিহি করতে হয় না তোকে–
শীতেশ অবাক হয়ে গেল। বললে–কেন, কার কাছে তোকে জবাবদিহি করতে হয়? কীসের জন্যে জবাবদিহি করতে হয়?
নিখিলেশ এতদিন হলো বিয়ে করেছে। নিজের সম্বন্ধে কখনও কারো কাছে কোনও গল্প করেনি। গল্প করা প্রয়োজনও মনে করেনি। প্রতিদিন ছুটি হবার সঙ্গে সঙ্গে সে দৌড়তে দৌড়তে নয়নতারার অফিসে গেছে। নয়নতারাও তার অফিসের গেটের সামনে প্রতিদিন নিখিলেশের জন্যে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থেকেছে। কিন্তু এখন অন্য রকম। এখন বাড়ি যাবার তাড়া বিশেষ নেই আর। যখন হোক গেলেই হলো। ততক্ষণ অফিসের ফাইল কটা ক্লিয়ার করার তাগিদ যেন তার কাছে হঠাৎ বড় জরুরী হয়ে উঠেছে।
