নয়নতারা বলেছে–কেন? তোমার ক্ষিধে পেয়েছে নাকি?
নিখিলেশ বলেছে–কেন, তোমার ক্ষিধে পায়নি! তুমিও তো সেই কোন্ সকালে বাড়ি থেকে খেয়ে বেরিয়েছ!
নয়নতারা বলেছে–মিছিমিছি পয়সা নষ্ট করে কী হবে? তার চেয়ে এইটুকু রাস্তা একটু কষ্ট করে চলো না, একেবারে বাড়িতে গিয়েই খাবো–
নিখিলেশ ভাবতো নয়নতারা সত্যিই বড় কৃপণ। দু’জনের মাইনের টাকা মিলিয়ে অনেকগুলো টাকাই তো হচ্ছে তাদের। নয়নতারা ততদিনে কিছু টাকাও জমিয়ে ফেলেছিল ব্যাঙ্কে। নয়নতারার ইচ্ছে ছিল একদিন কয়েক বছর পরে যখন আরো কিছু টাকা হবে তখন এই কলকাতা শহরে তারা একটা বাড়ি করবে। বেশ ছোট সাজানো-গোছানো একটা বাড়ি।
–বাড়ি!
বাড়ির নাম শুনেই চমকে উঠতো নিখিলেশ। বলতো কলকাতায় বাড়ি করবে? তুমি কি পাগল হয়েছ নাকি? কলকাতায় জমির দাম কত জানো? দশ হাজার বারো হাজার করে কাঠা–বাড়ি অমনি করলেই হলো?
নয়নতারা বলতো–তুমি একটু কম করে খরচ করো, দেখবে ছোট মতন একটা বাড়ি হয়ে যাবেই আমাদের।
অথচ প্রথমে একটা গয়না কিনতে চায়নি সে। গয়নার লোভ তার অনেকদিন আগেই মিটে গিয়েছিল। নয়নতারা বলতো–গয়না পরে হাতী-ঘোড়া কী এমন হবে! হোটেল রেস্টুরেন্টে খেয়েই বা কি হবে? অথচ কলকাতায় যদি একটা বাড়ি হয় তো কত আরাম বলো তো! তখন আর ছুটে ছুটে প্রাণ বের করে রোজ ডেলিপ্যাসেঞ্জারি করতে হবে না। বাড়ি থেকে সকাল দশটায় বেরোব আর বাসে উঠে টপ করে আধ ঘণ্টার মধ্যে অফিসে গিয়ে পৌঁছবো। আর মাসে মাসে এই এতগুলো টাকা ভাড়া গুনতে হবে না মিছিমিছি। সে টাকায় পেটে খেলে তবু বরং কাজ দেবে।
অথচ আশ্চর্য, সেই লোক হঠাৎ আজ নিজের হারটা পর্যন্ত বাঁধা রেখে দিল। একবার তাকে বললে না পর্যন্ত পাছে সে বারণ করে। নয়নতারার অত কষ্টে না খেয়ে জমানো টাকাগুলো সমস্ত খরচ করছে বাইরের আর একজনের চিকিৎসার জন্যে–
চলতে চলতে কী মনে হলো, নিখিলেশ আবার ফিরলো। অনেকখানি রাস্তা চলে গিয়েছিল নিখিলেশ। আবার ফিরে এসে সেই মনোহরবাবুর সোনা-রুপোর গয়নার দোকানের সামনে দাঁড়ালো।
মনোহর দত্ত নিখিলেশকে দেখে বললে–কি হলো? আবার ফিরলেন যে? কিছু বলবেন?
নিখিলেশ বললে–দেখুন হারটা কবে আমার স্ত্রী বাঁধা রেখে দিয়ে গিয়েছিলেন বলুন তো? কোন্ তারিখে? আপনার খাতাটা একবার বার করে দেখুন তো–
মনোহর দত্ত লোহার সিন্দুকের ভেতর থেকে একটা খেরো খাতা বার করলে। খাতার পাতা উল্টে উল্টে একটি জায়গায় এসে থামলো। বললে–এই যে, গেল মাসের চোদ্দ তারিখে। উনি বলেছিলেন মাইনেটা পেয়েই হারটা ছাড়িয়ে নেবেন–
নিখিলেশ বললে–ঠিক আছে, আপনি কিছু ভাববেন না মনোহরবাবু, আমি যত শিগগির পারি হারটা ছাড়িয়ে নিয়ে যাবো–বলে নিখিলেশ আবার বাড়ির দিকে চলতে লাগলো। গানের ফাটা রেকর্ডের মত ঘুরে ঘুরে ওই একটা কথাই তার মনের গ্রামোফোনে বার বার বাজতে লাগলো–গেল মাসের চোদ্দ তারিখে! গেল মাসের চোদ্দ তারিখ…
.
এই পৃথিবীর মানুষের ইতিহাস যেখান থেকে শুরু হয়েছিল সেখান থেকে মানুষ আজ অনেক দূরে সরে এসেছে। আগে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাত্রা শুরু হতো আর সন্ধ্যে হবার সঙ্গে সঙ্গে তা শেষ হতো। কিন্তু যন্ত্রযুগের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে সে-পৃথিবীর সব কিছু বদলে গেল। ভুগোল বদলে গেল, ইতিহাস বদলে গেল, আর যাকে নিয়ে ভুগোল ইতিহাস দর্শন বিজ্ঞান সব কিছু, সেই মানুষই আমূল বদলে গিয়ে একেবারে অন্য রকম হয়ে গেল। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সূত্ৰতে জট বাধলো, বিশ্বাসের জায়গায় সন্দেহ, প্রীতির জায়গায় শত্রুতা, উদারতার জায়গায় বিচ্ছিন্নতা এসে মানুষকে কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিলে। অন্যদিকে তেমনি বিরোধ ঘটলো দেশের সঙ্গে দেশের, সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্প্রদায়ের, কালোর সঙ্গে কালোর, সাদার সঙ্গে সাদার, ভাষার সঙ্গে ভাষার, ধর্মের সঙ্গে ধর্মের। তারপর সেই বিরোধ এসে ঢুকলো পরিবারের ভেতরে। বিরোধ বাধলো পরিবারে, ভাইয়ে ভাইয়ে। শেষ সংঘাত বাধলো স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর।
বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এসে বাঙলাদেশে এক ভূস্বামীর শেষ বংশধর বোধ হয় শেষ নিঃশ্বাস ফেলবার জন্যেই নৈহাটির এক মধ্যবিত্ত সংসারে এসে হাজির হয়েছিল। আর হাজির হবার সঙ্গে সঙ্গেই সে আর একজনদের সংসারে বিপর্যয় ডেকে আনলে।
এ কি কম বিপর্যয়! নইলে যে-নিখিলেশ একদিন ছোটবেলায় স্বদেশী করেছে, স্বদেশী ফ্ল্যাগ নিয়ে কেষ্টনগরে মিছিলের মওড়া নিয়েছে, পুলিসকে পর্যন্ত গ্রাহ্য করেনি, অবস্থার চক্রে পড়ে তাকেই আবার একদিন একটা সওদাগরি অফিসে চাকরি নিতে হয়েছে। তা হোক, চাকরি সকলকেই করতে হয়। চাকরি না করে সে করতই বা কী! নিখিলেশের অনেক বন্ধু বান্ধব দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বড় বড় পোস্ট পেয়েছে। কেউ রাষ্ট্রমন্ত্রী, কেউ এম এল-এ। আবার কেউ বা কিছুই হয়নি। বড় জোর ফুড-ডিপার্টমেন্টে একটা চাকরি পেয়েই খুশী থেকেছে। কিন্তু তার বেশি আর কী সে চেয়েছিল? সে কি চেয়েছিল সে একটা কেষ্ট-বিষ্ট কিছু হবে?
ঠিক এই সময়েই তার জীবনে এসে গেল নয়নতারা। তখন থেকে নয়নতারাকে ঘিরেই তার জীবন বৃত্তাকারে ঘুরতে লাগলো। একটা ছোট বাড়ি, একটা ছোট সংসার আর ব্যাঙ্কে কিছু সংস্থান। সব মানুষের যা যা কাম্য থাকে সেইটুকুর বেশি আর কিছু নিখিলেশ তখন চাইতো না। প্রথম প্রথম যদিও বা একটু এধারে ওধারে বাজে খরচ করতো তাও তারা বন্ধ করে দিলে।
