তারপর শাবল এল, হাতুড়ি এল। তা-ই দরজার ওপর দুম-দুম্ করে মারা হতে লাগলো। কীর্তিপদ মুখোপাধ্যায়ের ঠাকুরদার তৈরি বাড়ি। কাঠ নয় তো যেন লোহা। শাবলের এক একটা ঘায়ে কাঠ যেন কথা বলতে লাগলো। এক-একবার হাতুড়ির ঘা পড়ে আর অষ্টাদশ শতাব্দী, উনবিংশ শতাব্দী আর বিংশ শতাব্দীর মধ্য-দশক পর্যন্ত সমস্ত শাসক-শোষকের আত্মা আত্মা যেন একসঙ্গে যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আর্তনাদ করে ওঠে। তাদের বুক থেকে ঘন-ঘন যন্ত্রণার অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে আসে-উঃ-উঃ।
যখন দরজাটা ভেঙে পড়ে গেল সবাই ভেতরে ঢুকে দেখল চৌধুরী মশাই তাঁর বিছানাটার ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে আছে। আর জানলার ফাঁক দিয়ে দলে-দলে কালো পিঁপড়ে এসে তাঁর সর্বাঙ্গ অক্রমণ করেছে।
.
প্রতিদিনের মত সেদিনও লোকাল ট্রেনটা স্টেশনে এসে থামলো। ট্রেনটাকে ভালো করে থামবার ফুরসৎও কেউ দেয় না। ভালো করে থামবার আগেই সবাই নেমে পড়ে। সেই সকাল বেলা সবাই অফিসকাছারিতে গেছে আর ছুটির পর দৌড়তে দৌড়তে শেয়ালদা স্টেশনে এসে ট্রেন ধরেছে। তখন কে আগে আগে বাড়ি ফিরতে পারে তারই যেন প্রতিযোগিতা চলে। ট্রাম রাস্তা থেকেই ছুটতে শুরু করে। এক-একবার মাথার ওপরের ঘড়িটা দেখে আর ছোটে।
নয়নতারা যখন অফিসে যেত তখন ফেরার সময় সঙ্গে থাকত নিখিলেশ। তখন এত তাড়া ছিল না দুজনেরই। দুজনেই তখন অফিস থেকে বেরিয়ে ধীরে সুস্থে স্টেশনে আসতো। একটা ট্রেন যদি চলেই যায় তো ক্ষতি নেই, আর একটা ট্রেন আছে।
কিন্তু এখন অন্যরকম। এখন অফিস থেকে বেরিয়ে নয়নতারাকে সঙ্গে নেবার আর কোনও দায় নেই। এখন একলা-একাই স্টেশনে এসে নিখিলেশকে ট্রেন ধরতে হয়, আবার একলাই ট্রেন থেকে নামতে হয়। তারপর রাস্তা দিয়ে একমনে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি। অথচ যেন বাড়িতে না পৌঁছোতে পারলেই নিখিলেশ বাঁচে। যেন দেরি করে বাড়িতে পৌঁছে খেয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি বিছানায় শুয়ে পড়তে পারলে সে নিষ্কৃতি পায়।
বাজারের কাছ দিয়ে যেতেই পেছনের দোকান থেকে কে যেন ডাকলে–ও নিখিলেশ বাবু– নিখিলেশবাবু–
নিখিলেশ পেছন ফিরে দেখল একজন অচেনা লোক একটা সোনারুপোর দোকানের ভেতর থেকে তাকে ডাকছে। ভদ্রলোককে চিনতে পারলে না আবার দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে।
ভদ্রলোক বললে–আমার নাম মনোহর দত্ত। আপনি চিনবেন না, কিন্তু আপনার স্ত্রী একটা সোনার হার বাঁধা রেখে দিয়ে গিয়েছিলেন আমার কাছে, তার বদলে চারশো টাকা দিয়েছিলুম–
নিখিলেশ আকাশ থেকে পড়লো। নয়নতারা সোনার হার বাঁধা রেখে চারশো টাকা নিয়ে গেছে!
ভদ্রলোক আবার বলতে লাগলো–তা তিনি বলেছিলেন একমাসের মধ্যেই হারটা ছাড়িয়ে নিয়ে যাবেন, কিন্তু এতদিন হয়ে গেল, প্রায় দুমাস হতে চললো, তবু তিনি এলেন না–তাই আপনাকে কথাটা বলছি
নিখিলেশ এ-কথার কী জবাব দেবে বুঝতে পারলে না। তারপর একটু ভেবে নিয়ে বললে–আচ্ছা, আপনি কিছু ভাববেন না–আমি নিজে একদিন এসে টাকা দিয়ে হারটা ছাড়িয়ে নিয়ে যাবো–
বলে আবার বাড়ির দিকে চলতে লাগলো।
রাস্তায় চলতে চলতে নিখিলেশের মনে হলো তার বাড়িটা যেন আরো দূরে হলে ভালো হতো। ভালো হতো যদি বাড়িতে গিয়ে আবার নয়নতারার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াতে না হতো। কিন্তু কেন নয়নতারা এমন কাজ করতে গেল। আর যদি ডাক্তার-ওষুধের জন্যে নিজের হার বাঁধা দেওয়ার দরকারই হয়েছিল তো তার কাছে জিনিসটা সে লুকোল কেন? কেন তাকে একবার বললে না পর্যন্ত? বললে কি সে বাধা দিত কিম্বা বারণ করতো?
অফিসের লোকরা বলে–তোমার কী হলো হে? এ রকম মনমরা হয়ে যাচ্ছ কেন দিন দিন?
নিখিলেশ হাসবার চেষ্টা করতো। একটা আড়ষ্ট হাসি হেসে বলতো–কেন, আমার তো কিছু হয়নি–
সত্যিই যে নিখিলেশের কী হয়েছে তা কাউকে বলবার নয়। বললে–লোকে মজা পাবে, বললে বরং লোকে হাসবে। মনে মনে বলবে, বেশ হয়েছে। অথচ বাইরে থেকে সবাই-ই তাকে হিংসে করে। হিংসে করে তার সৌভাগ্যের কথা ভেবে। সত্যিই তার সৌভাগ্য না তো কী? স্বামী-স্ত্রীতে উপায় করা ক’জনের ভাগ্যে জোটে! অফিসের বেশির ভাগ লোকই উদয়াস্ত পরিশ্রম করে সংসার চালাতে গিয়ে হাঁফিয়ে ওঠে। সকলের মুখেই এক কথা–নেই। বউ-ছেলে-মেয়ের খরচ যোগাতেই মাসের মাঝামাঝি সবাই ফতুর। তারপর আর বাড়িতে মাছ আসে না। জিনিসপত্তোরের দাম নিয়ে যখন সবাই আলোচনা করে তখন নিখিলেশও কথা বলতে যায়। কিন্তু সবাই তাকে থামিয়ে দেয়। বলে–তুমি থামো হে, তুমি আর কথা বোল না
নিখিলেশ বলে–কেন? আমি থামবো কেন? আমি কি সংসার করি না?
তারা বলে–তোমরা তো হাজব্যাণ্ড-ওয়াইফ দু’জনে মিলে রোজগার করছো, তোমাদের কী ভাবনা?
নিখিলেশ হাসে। বলে–দু’জনে রোজগার করলেই কি সব সমস্যা মিটে গেল? টাকা ছাড়া কি মানুষের আর কোন সমস্যা নেই?
সবাই নিখিলেশের কথায় অবাক হয়ে যায়। টাকা ছাড়া আবার সমস্যাটা কী মানুষের? টাকাই তো সংসারে আসল জিনিস! আঢেল টাকা রোজকার করে, তারপর সেই টাকা ব্যাঙ্কে পুরে রেখে দাও, তখন পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে আয়েস করে খাও দাও আর ফুর্তি করো।
নিখিলেশের অফিসের সকলের মুখে এই একই কথা। এতদিন নিখিলেশেরই কম-বেশি ওই সমস্যা ছিল। অফিস থেকে ফেরার পথে অনেকদিন নিখিলেশ নয়নতারাকে বলেছে চলো না, কোনও রেস্টুরেণ্টে ঢুকি–
