মুদিখানার সামনে আসতেই অখিল ডাকে।
–কী রায় মশাই, কিছু হলো? জামাইবাবু কী বলেন?
প্রকাশ বললে–জামাইবাবুর আর নাম কোর না অখিল, একেবারে চশমখোর, খাঁটি চশমখোর
–কেন? অত গালাগালি দিচ্ছ কেন?
প্রকাশ রায় বললে–গালাগালি দেব না, চশমখোর লোক না হলে নিজের হাতে দুধ জ্বাল দিয়ে খায়, তবু আমার বউ-এর হাতের রান্না খাবে না। তা তোমার পাঁউরুটির দাম পাচ্ছো তো ঠিক ঠিক?
অখিল বললে–একেবারে নগদ। এক হাতে পাঁউরুটি দিয়ে আসি, আর এক হাতে নগদ পয়সা। চৌধুরী মশাই বলেন বাকিতে খাবো না কারো কাছে–
শুধু অখিল নয়। যে দুধ দিয়ে আসে সেই গয়লানী বউও নগদনগদ পয়সা পেয়ে যায়। দুধের এমন কি খুচরো পয়সা পর্যন্ত ভাঙিয়ে রাখেন চৌধুরী মশাই। যেন দাম বাকি না পড়ে।
অখিল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে–তা এত কষ্ট করে নিজের হাতে রান্না করেন কেন বলো তো রায় মশাই?
প্রকাশ বলে–ওই যে, যদি টাকার লোভে আমরা বিষ খাইয়ে দিই!
বিষ? টাকার এত লোভ! যে শোনে সে অবাক হয়ে যায়। তারা কীর্তিপদ মুখুজ্জে মশাইকেও দেখেছে। তিনি তো এমন ছিলেন না। ওই প্রকাশের বউই তার খাবার বরাবর রান্না করে দিয়েছে। একবারও তো বিষ খাইয়ে দেবার ভয় হয়নি তাঁর। তা ছাড়া তিনি কত লোককে কত দান-ধ্যান করেছেন। কত লোক মাসোহারা পেয়েছে তার কাছে। তার জামাই হয়ে এ কেমন ব্যবহার! টাকা কি তোমার সঙ্গে যাবে বাপু? টাকা কি কখনও কারো সঙ্গে গেছে? চিরদিন তো কেউ সংসারে বাঁচতে আসেনি। তাহলে? একদিন তো এই এত টাকা সবই ফেলে যেতে হবে! কে খাবে তোমার টাকা? টাকার এত মায়া?
কিন্তু এ কথাগুলো যাঁর উদ্দেশ্যে বলা তার কানে তোলবার সুযোগও হয় না কারো, তাই তাঁর কানে যায়ও না। সুলতানপুরের মানুষ বহুদিন ধরে আশা করেছিল কীর্তিপদ মুখুজ্জে মশাই-এর মত একদিন চৌধুরী মশাইও তাদের সঙ্গে মেলামেশা করবেন, দরকারে অদরকারে তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু তা হলো না। কোথা থেকে কোন অঞ্চলের এক মানুষ এসে সুলতানপুরের সব জমিজমা কিনে নিয়ে সব কিছুর মালিক হয়ে বসলো। আর তাদের যে-দশা চলছিল সেই দশাই চলতে লাগলো।
কিন্তু সেদিন হঠাৎ এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটলো। অখিল প্রতিদিন যেমন পাঁউরুটি নিয়ে গিয়ে দিয়ে আসে সেদিনও তেমনি গিয়েছে।
গিয়ে দেখলে দরজা বন্ধ। অবশ্য এমনিতে ঘরের দরজা সাধারণত বন্ধই থাকে। সদরের গেট দিয়ে ঢুকে উঠোন পেরিয়ে একতলার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যায় সে। চৌধুরী মশাই যদি তখন জেগে থাকেন তো অখিলকে দেখে হাত বাড়িয়ে পাঁউরুটিটা নিয়ে পয়সাটা দিয়ে দেন। কিন্তু ক্বচিৎ কদাচিৎ ঘরের দরজা বন্ধ থাকে। অখিল গিয়ে ডাকে–চৌধুরী মশাই–
একবার ডাকতে-না-ডাকতেই চৌধুরী মশাই দরজা খুলে দিয়ে পাঁউরুটিটা নিয়ে নেন। তারপর গয়লানী বউ-এর বেলাতেও তাই। দুজনের পয়সা যেন আগের রাত্রে হিসেব করে গুনে বালিশের তলায় রেখে দেন।
এমনিই বরাবর চলে আসছে।
কিন্তু সেদিন অখিলের ডাকে ভেতর থেকে আর কেউ সাড়া দিলে না।
অখিল কেমন যেন অবাক হয়ে গেল। এমন তো হয় না।
অখিল আবার ডাকলে–চৌধুরী মশাই, আমি অখিল, দরজা খুলুন—
তবু কারো সাড়া নেই। তবু দরজা খুললে না কেউ–
অখিল অন্য কোনও উপায় না পেয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলো–চৌধুরী মশাই, ও চৌধুরী মশাই–
তবু কেউ সাড়া দিলে না। ততক্ষণে দুধ নিয়ে গয়লানী বউও এসে গেছে। তাকে কোনও দিন তেমন অপেক্ষা করতে হয় না। দুধের কড়াতে দুধ মেপে দিয়ে দাম নিয়ে তার চলে যাবার কথা।
সেও একবার ডাকলে–চৌধুরী মশাই–চৌধুরী মশাই, আমি দুধ এনেছি–
তবু কারো সাড়া না পেয়ে দুজনেই কেমন ভয় পেয়ে গেল। এমন তো হয় না। চৌধুরী মশাই তো তেমন ঘুমকাতুরে মানুষ নন।
ততক্ষণে খবরটা এক কান থেকে আর এক কানে চলে গেছে। অশ্বিনী ভট্টাচার্যি ছুটে এসেছে। প্রকাশ খবরটা পেয়েই দৌড়ে এসে হাজির। সেও বার-দুই ডাকলে–জামাইবাবু, জামাইবাবু–
তবু ভেতর থেকে কোনও সাড়া-শব্দ নেই।
তখন সকলেরই কেমন ভয় হয়ে গেল। জ্যান্ত মানুষ হলে কি কেউ এত ডাকাডাকিতে ঘুমিয়ে থাকতে পারে!
প্রকাশ বললে–তোমরা সরো, আমি আলসে দিয়ে একবার ওধারের জানলার কাছে যাই, গিয়ে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে আসি—
সরু কার্নিশের ওপর পা ফেলে-ফেলে প্রকাশ জানলার দিকে যাবার আগেই দেখলে সার-সার ডেয়ো-পিঁপড়ে ভেতরের দিকে লক্ষ্য করে চলেছে। একেবারে অশেষ। কোত্থেকে বুঝি ওরা টের পায়। ওরা বুঝি মানুষের আগেই টের পেয়ে যায় কোথায় কোন্ মানুষের শরীর থেকে প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে।
অখিল বললে–খুব সাবধানে যাবেন রায় মশাই–পড়ে গেলে হাত-পা একেবারে গুঁড়িয়ে যাবে।
কিন্তু না, প্রকাশ বেশি দূর যেতে পারলে না। কালো কালো পিঁপড়েগুলো দেখে প্রকাশের ভয় করতে লাগলো। সে আবার ফিরে এল।
বললে–না গো, হলো না–পিঁপড়ে কামড়ে দেবে–
অশ্বিনী ভট্টাচার্য বলে উঠলো–তা হলে কী চৌধুরী মশাই-এর অসুখ হলো নাকি?
অখিল বললে–এই কালকেও তো পাউরুটি দিয়ে গেছি আমি, আমাকে পাঁউরুটির দাম দিয়েছেন উনি
গয়লানী বউও বললে–আমিও তো দুধ দিয়ে গেছি, দাম নিয়ে গেছি—
প্রকাশ বললে–এক কাজ করো, দরজা ভাঙো—
অনেক কথার পর শেষ পর্যন্ত তাই-ই সাব্যস্ত হলো। ভাঙো, দরজাই ভাঙো–
