কিন্তু তিনি কোথায় গিয়ে পালাবেন? কোথায় গিয়ে মুখ লুকোবেন? কপিল পায়রাপোড়া, ফটিক প্রামাণিক, মাণিক ঘোষ আর কালীগঞ্জের বউদের আত্মাদের হাত থেকে কেমন করে তিনি আত্মরক্ষা করবেন? সুলতানপুর তো পৃথিবীর বাইরে নয়। আর পৃথিবীর বাইরে হলেও জলে স্থলে-অন্তরীক্ষেও যে তাদের গতিবিধি। তুমি যদি জীবনকে এড়াতে চাও তো মৃত্যু যে তোমার জন্যে হাত বাড়িয়ে প্রতীক্ষা করবে। আর মৃত্যু তোমাকে গ্রাস করলেও তোমার সন্তান-সন্ততি তো রইল, তোমার বংশধররা তো রইল, তাদের কে বাঁচাবে? কপিল পায়রাপোড়া, ফটিক প্রামাণিক, মাণিক ঘোষ আর কালীগঞ্জের বউদের তো মৃত্যু নেই। তারা যে জন্ম-মৃত্যুর ঊর্ধ্বে। তারা ইতিহাসের আদি যুগ থেকে রোম সাম্রাজ্যের পতন দেখেছে, মহেঞ্জোদারোর ধ্বংস দেখেছে, বংশানুক্রমে তারা পতন অভ্যুদয়ের কারণ খতিয়ে দেখে আসছে। তাদের ফাঁকি দিতে পারবে এমন নরনারায়ণ চৌধুরী বুঝি এখনও জন্মায়নি–
নইলে জীবনের শেষটায় কেন এক গণ্ডুষ জলও পেলেন না চৌধুরী মশাই? কেন সুলতানপুরের অত বড় বাড়ির মধ্যে একখানা ঘরে বন্দী হয়ে থেকে মৃত্যুকে ফাঁকি দেবার চেষ্টা করতেন? কেন ভাবতেন পৃথিবীর আর সবাই চিরকালের নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে, কেবল তিনিই যাবচ্চন্দ্রদিবাকরৌ বেঁচে থাকবেন?
নবাবগঞ্জের জমি-জমা বসতবাড়ি যেমন রেলবাজারের প্রাণকৃষ্ণ সা’ মশাইকে বেচে দিয়েছিলেন, সুলতানপুরের জমি-জমাও তেমনি একদিন সকলের চোখের আড়ালে আর একজনকে বেচে দিলেন। তারপর সব টাকাগুলো ভাগলপুরের ব্যাঙ্কে গচ্ছিত রেখে পাসবই আর চেকবইটা মাথার বালিশের তলায় রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে লাগলেন।
অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে থেকে যে বংশ ধনে-মানে পরিপূর্ণ হয়ে একদিন সারা বাংলা দেশে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছিল, তাদের কেউ-কেউ মোগলের সঙ্গে হাত মেলাবার দায়ে ইংরেজদের কোপানলে পড়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, আবার কেউ-কেউ অবস্থা-বৈগুণ্যে পড়ে। একেবারে ভিখিরি হয়ে টিমটিম করে তখনও কায়ক্লেশে কোনও রকমে কৌলিক মর্যাদা বজায় রেখে মাথা বাঁচিয়ে চলছিল। কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আমলে মাথা বাঁচানোও দায় হয়ে উঠলো অনেকের পক্ষে। তখন সব চারদিকে নতুন নতুন জমিদারির পত্তনি হচ্ছে। ইংরেজদের সূর্যাস্ত আইনের সুযোগ নিয়ে কীর্তিপদ মুখোপাধ্যায়ের পূর্বপুরুষ যেমন হাতে বেনিয়ানগিরির টাকা পেয়ে সুলতানপুরে জমিদারি কিনেছিলেন, তেমনি হর্ষনাথ চক্রবর্তীর পূর্বপুরুষও জমিদারি করেছিলেন কালীগঞ্জে। সেই সময়ই শুরু হয় সদানন্দর পূর্বপুরুষ নরনারায়ণ চৌধুরীর উত্থানের ইতিহাস। মুর্শিদাবাদ কিংবা জাহাঙ্গীরাবাদ কিংবা গৌড়বঙ্গের অন্য কোনও উৎখাত জমিদারের বংশধর ভাগ্যের স্রোতে ভাসতে ভাসতে বংশের পূর্বগৌরব উদ্ধার করার জন্যেই বোধ হয় নায়েবের চাকরি নিয়ে জীবন আরম্ভ করেছিলেন। তারপর সুলতানপুরের আর এক ভূস্বামীর সঙ্গে আত্মীয়তা পাতিয়ে নিজের মর্যাদা দ্বিগুণ করতে মতলব করেছিলেন। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর মধ্যপাদে এসেই ইতিহাস উল্টে গেল। কালীগঞ্জ আগেই গিয়েছিল, তারপর নবাবগঞ্জও গেল। এবার সুলতানপুরও বুঝি শেষ হয়ে যায়। সুলতানপুরের শেষ উত্তরাধিকারী হরনারায়ণ রায়চৌধুরীকে তখন আর কেউ চোখেই দেখতে পায় না। গঞ্জের একজন গোয়ালা প্রতিদিন এসে আধ সের দুধ দিয়ে যায়। আর মুদিখানার মালিকের লোক দিয়ে যায় একখানা এক পাউণ্ডের পাঁউরুটি।
চৌধুরী মশাই নিজেই সেই দুধটা একটা অ্যালুনিনিয়ামের কড়ায় জ্বাল দেন। তারপর আধখানা পাঁউরুটি সেই দুধে ডুবিয়ে সকালের আহারটা সারেন। আর আধখানা থাকে রাত্রের জন্যে। রাত্রেও ওই একই খাদ্য। তারপর ঘুম থেকে উঠে সাবান দিয়ে আবার কড়াটা মেজে ফেলেন। চৌধুরী মশাই কাউকেই বিশ্বাস করেন না পৃথিবীতে। সবাই তার টাকার জন্যে ওঁৎ পেতে বসে আছে।
প্রকাশ প্রথম প্রথম আসতো। চৌধুরী মশাই দরজায় খিল দিতেন। বলতেন–তুমি বেরোও দিকি, তুমি বেরোও এখান থেকে বেরিয়ে যাও–
প্রকাশ তবু নড়তো না। বলতো–আজ্ঞে, আপনি কেন হাত পুড়িয়ে রান্না করছেন জামাইবাবু, আপনি বুড়ো মানুষ, আমি বাড়ি থেকে আপনার খাবার রান্না করে আনতে পারি–
চৌধুরী মশাই বলতেন–তুমি থামো দিকিনি, তুমি আর কথা বলো না–
প্রকাশ বলতো–আজ্ঞে, আমি তো ভালো কথাই বলছি, আমার স্ত্রী থাকতে আমি নিজে থাকতে আপনার নিজের হাতে রান্না করা কি ভালো দেখায়?
–ভালো দেখায় কি না দেখায় তা তোমাকে ভাবতে হবে না, তুমি আর আমার সামনে এসো না বলে প্রকাশের মুখের ওপরেই চৌধুর মশাই দরজা বন্ধ করে দিতেন।
বন্ধ দরজার সামনে প্রকাশ খানিকক্ষণ চুপ করে নির্বোধের মত দাঁড়িতে থাকতো। তারপর আস্তে আস্তে বাড়ির রাস্তার দিকে পা বাড়াতো। তার হাতে তখন একটা পয়সাও নেই। ছেলে-মেয়ে-বউ ভালো করে পেট ভরে খেতে পায় না। দিদি মারা যাওয়ার পর থেকেই তার অবস্থা কাহিল হয়ে গিয়েছিল। তার চোখের সামনেই নবাবগঞ্জে জমি-জমা বিক্রি হয়ে গেল, তার চোখের সামনেই সুলতানপুরের জমি-জমাও বিক্রি হয়ে গেল। সেই টাকাকড়ি সমস্ত কিছু ভাগলপুরের ব্যাঙ্কে গিয়ে জামাইবাবু জমা দিয়ে এলেন। সেখান থেকে সুদের টাকা আনতে জামাইবাবু রিকশায় উঠে একলা চলো যান আর পেট চালানোর মত খরচার টাকাটা তুলে নিয়ে আসেন। প্রকাশ দূরে দাঁড়িয়ে শুধু হাঁ করে দেখে।
