সেদিন সেই হোটেলের ঘরের ভেতরে নিখিলেশের সঙ্গে খেতে খেতে মনে হতে লাগলো তার জীবনে যা ঘটেছে হয়ত তা ভালোর জন্যেই ঘটেছে। নইলে কি এই সব দেখতে পেত, এই সব খেতে পেত। অথচ নবাবগঞ্জের-শাশুড়িরও তো যথেষ্ট টাকা ছিল। বাবা তো তার শ্বশুরবাড়ির টাকা দেখেই ওখানে তার বিয়ে দিয়েছিল। অথচ সেখানে তো এ-সব ছিল না এই আলো এই জাঁক-জমক, এই ঐশ্বর্য।
নয়নতারা বললে–দেখ, এখানে খেয়ে আর কী-ই বা হলো, তার চেয়ে এর পরের মাস থেকে এই টাকাগুলো জমিয়ে শাড়ি কিনবে। আমরা বাড়ির ভেতরে কী খাচ্ছি সেটা তো কেউ আর দেখতে পায় না, কিন্তু শাড়ি-গয়না লোকে দেখতে পায়—
নিখিলেশ হঠাৎ বললে–দেখ, একদিন ছুটি নিয়ে ভাবছি আমি নবাবগঞ্জে যাবো–
–কেন? নবাবগঞ্জে যাবে কী করতে?
–তোমার গয়নাগুলো চেয়ে আনতে! এ কী আবদার নাকি? তখনকার দিনের আট হাজার টাকার গয়না, এখন তার দাম কম করেও অন্তত বারো হাজার টাকা! বারো হাজার টাকা যদি এখন হাতে থাকত তো তাহলে কী আমাদের ভাবনা? মাসে-মাসে কত টাকার বাড়ি ভাড়া দিচ্ছি, তার বদলে নিজেদের একটা বাড়ি হয়ে যেত–
আর একদিনের কথাও মনে পড়লো নয়নতারার। বিয়ে করার পর সেদিন আর নৈহাটিতে ফিরলো না তারা। একটা রাত্রের জন্যে নিখিলেশের এক বন্ধু তাদের বাড়িতেই নেমন্তন্ন করলে এমন একটা শুভঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখবার জন্যে। সে-ঘটনাটাকে বন্ধুর বদান্যতাও বলতে পারা যায়, আবার আনন্দপ্রকাশও বলা যায়। খাওয়া-দাওয়ার পর সেখানেই রাতটা কাটাতে হলো। তারপর ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে ভোরের ট্রেন ধরে নৈহাটিতে আসা। শেয়ালদ’ স্টেশনে যখন এসেছে তখন ট্রেনটা ছাড়ে-ছাড়ে। ট্রেনে উঠতে যাবার মুখেই মনে হলো পেছন থেকে ‘নয়নতারা’ বলে তাকে যেন কে ডাকলে–
তখন আর তাদের পেছন ফিরে দেখবার সময় নেই। ট্রেনে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনটা ছেড়ে দিল। নিখিলেশ বলেছিল–কে যেন তোমার নাম ধরে ডাকলে না?
–আমাকে?
নয়নতারা অবাক হয়ে গিয়েছিল। বলেছিল–আমাকে আবার কে ডাকবে? আর এখানে আমাকে চিনবেই বা কে?
তবু নয়নতারা চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ফেলে-আসা প্লাটফরমের দিকে একবার চেয়ে দেখলে। অসংখ্য লোকের ভিড় সেখানে। তাদের মধ্যে কে কোন্ লোকটা তাকে ডেকেছে, কেন ডেকেছে, কে জানতে পারবে? আর তা ছাড়া এ তো কেষ্টনগর নয়, নৈহাটিও নয়, এমন কি নবাবগঞ্জও নয়। আর সে তো ঘরের বাইরে বেরোনো মেয়েও নয় যে তাকে বাইরের লোকে চিনতে পারবে। তার ওপর সেটা কলকাতা শহর। কলকাতা শহরে কে কাকে চেনে!
ট্রেনটা প্লাটফরম ছাড়িয়ে তখন অনেক দূর চলে এসেছে। নিখিলেশ জিজ্ঞেস করলে–কাউকে দেখতে পেলে?
নয়নতারা বললে–না না, আমাকে আবার এখানে কে ডাকবে, ভুল শুনেছ তুমি–
হঠাৎ সদর-দরজায় কড়া নাড়তেই নয়নতারার যেন চমক ভাঙলো। এতগুলো ফেলে আসা বছরের স্মৃতি-রোমন্থনে যেন হঠাৎ ছেদ পড়লো।
ভেতর থেকে দরজা খুলেই বললে–কে?
হয়ত নিখিলেশ বাড়ি ফিরেছে। বাইরে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে এখন বাড়িতে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে।
বাইরে থেকে গিরিবালা বললে–আমি দিদিমণি–
দরজা খুলে দিতেই গিরিবালা ভেতরে ঢুকলো। নয়নতারা জিজ্ঞেস করলে–ওষুধগুলো পেয়েছো?
ওষুধের প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে গিরিবালা বললে–একুশ টাকা দাম নিলে দিদিমণি–
একুশ টাকা! একটা দিনের মধ্যেই এতগুলো টাকা বেরিয়ে গেল! একুশ টাকা থাকলে একটা নতুন শাড়ি হয়ে যেত তার। অথচ মানুষটার অসুখ যে খুব তাড়াতাড়ি সারবে তা তো নয়! কিন্তু যে-সব কথা ভাবলে এখন চলবে না। অসুখ তো নিখিলেশেরও হতে পারতো, অসুখ তো তার নিজেরও হতে পারতো। অসুখ হলে মানুষ কী করবে! অসুখের ওপর তো মানুষের হাত নেই।
ওষুধটা নিয়ে নয়নতারা সদানন্দর ঘরে ঢুকলো।
.
শুধু অসুখ নয়, হয়ত কোনও কিছুর ওপরেই মানুষের হাত নেই। হাত থাকলে কি চৌধুরী মশাইকেই নবাবগঞ্জের সমস্ত সম্পত্তি জলের দরে বিক্রি করে সুলতানপুরে চলে যেতে হয়! প্রত্যেকটা সম্পত্তি, বাড়ির প্রত্যেকটা ইট পর্যন্ত একদিন একজন মানুষের কাছে তাঁর শরীরের রক্তের মত প্রিয় ছিল। বলতে গেলে নিজের রক্ত দিয়েই সম্পত্তির পত্তন করে গিয়েছিলেন কর্তাবাবু। চৌধুরী মশাইও সে সব কিছু কিছু জানতেন। আর জানতেন বলেই নবাবগঞ্জ থেকে যখন শেষবারের মত চলে যাচ্ছিলেন তখন পা দুটো যেন কেমন কেঁপে উঠেছিল। তারপর বারোয়ারিতলার কাছে আসতেই চলতে গিয়ে হঠাৎ তিনি থেমে গেলেন। মনে হলো কপিল পায়রাপোড়ার ঝুলন্ত পা দুটো যেন তাঁর মাথায় ঠেকে যাবে। ওই গাছের ডালেতেই একদিন কপিল পায়রাপোড়া গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল।
–কী হলো জামাইবাবু? কিছু ফেলে এলেন নাকি?
প্রকাশ ভাবলে হয়ত জামাইবাবু বাড়িতে কিছু ফেলে এসেছেন!
চৌধুরী মশাই বললেন, না চলো, ঠিক আছে—
বলে আরো তাড়াতাড়ি পা ফেলে আগে আগে চলতে লাগলেন। নবাবগঞ্জ থেকে মবারকপুর, মবারকপুর থেকে সোজা হাঁটা রাস্তা। হাঁটা রাস্তাটা যেন হেঁটে হেঁটে অনন্ত কালে গিয়ে মিশেছে। এই রাস্তা দিয়েই একদিন মোগল-পাঠান-ইংরেজরা এসেছিল, আবার এই রাস্তা দিয়েই তারা চৌধুরী মশাই-এর মত সর্বস্ব খুইয়ে ইতিহাসের পাতায় ছাপার অক্ষরে ভিড়ে মুখ লুকিয়ে বেঁচেছে। চৌধুরী মশাইও যেন সেদিন নিজের মুখ লুকোতে পারলেই বাঁচেন। পাঠান-মোগল-ইংরেজদের মতই শেষবারের মত তিনি যেন সব কিছু লুটপাট করে পুঁটলি বেঁধে পালিয়ে বাঁচতে চাইলেন।
