নয়নতারা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। বললে–কিন্তু আমি চাকরি করতে পারবো?
নিখিলেশ বললে–আরে চাকরির আবার হাতী ঘোড়া কি আছে, গভর্ণমেন্টের চাকরিতে তো কোনও কাজই হয় না। শুধু অফিসে গিয়ে হাজরে দিলেই হলো। তার ওপরে তুমি তো মেয়েমানুষ। বেটাছেলেরাই কোনও কাজ করে না, আর তুমি মেয়েমানুষ হয়ে কি কাজ করবে? রেকড সেকশানের কাজ, শুধু সারা দিনে দু-চারটে চিঠি নম্বর মিলিয়ে ফাইলে অ্যাটাচ্ করলেই সারা দিনের মত ছুটি–
–কিন্তু রোজ ট্রেনে যাতায়াত? ডেলি-প্যাসেঞ্জারি?
–সে সঙ্গে আমার দু’চারদিন যাতায়াত করতে করতেই তোমার অভ্যেস হয়ে যাবে। তোমার একটা মান্থলি টিকিট করে দেব, রোজ টিকিট কাটতেও হবে না তোমায়। আর নৈহাটি থেকে অসংখ্য ট্রেন, যখন-তখন যেতে পারবে, যখন-তখন আসতে পারবে, এক একদিন তোমাকে অফিস থেকে নিয়ে বেরিয়ে সিনেমা-থিয়েটার দেখে ফিরবো–
তখন কলকাতা সম্বন্ধে নয়নতারার কোনও ধারণাই ছিল না। সেই নবাবগঞ্জে একরকম, এই নৈহাটিতে আর এক রকম। অথচ সেটাও শ্বশুরবাড়ি, এটাও বলতে গেলে শ্বশুরবাড়ি। তবু দুটোর মধ্যে কী তফাৎ!
তারপর একদিন শুরু হলে চাকরি করা। প্রথম-প্রথম নিখিলেশই সঙ্গে করে রোজ নিয়ে যেত তাকে। মানুষের ভিড় দেখে তখন ভয় করতো তার। গিরিবালা তখন একলা সারাদিন বাড়ি পাহারা দিত আর তারা তার হাতে বাড়ি পাহারা দেবার ভার ছেড়ে দিয়ে অফিসে চলে যেত–
তখন থেকেই নয়নতারা অন্য মানুষ হয়ে গিয়েছিল। একেবারে অন্য মানুষ। নইলে যে লোক নবাবগঞ্জে একদিন শ্বশুর-শাশুড়ীর ভয়ে একটা কথা পর্যন্ত বলতে পারতো না, দুঃখের কথাগুলো বলবার জন্যে লুকিয়ে লুকিয়ে পাশের দিদিমার বাড়িতে যেত সেই মানুষই আবার মানুষের ভিড় ঠেলে কিনা অফিস করছে–এটা সে প্রথম প্রথম বিশ্বাসও করতে পারতো না।
প্রথম মাইনে পাওয়ার দিন নিখিলেশ বললে–চলো, আজ আর বাড়িতে খাবো না আমরা–
নয়নতারা বললে–বাড়িতে খাবে না মানে? কোথায় খাবে তাহলে?
নিখিলেশ বললে–সে তুমি জানো না, তোমার নৈহাটির বাজারের নোংরা হোটেল নয়, সে-সব দামী হোটেল। খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চারিদিক, সেখানে খেতে তোমার ভক্তি হবে–
নয়নতারা বললে–কিন্তু হোটেলেই বা খাবো কেন? আমি যে গিরিবালাকে রান্না করতে বলে এসেছি, সে যে ভাত কোলে করে বসে থাকবে, তাকে তো কিছু বলে আসিনি–
নিখিলেশ বোঝালে প্রথম মাইনের টাকাটা দিয়ে একটু উৎসব করা ভাল। এরপর থেকে আর খাবো না। কিন্তু আজকে তুমি মাইনে পেয়েছ, এ-টাকাটা সদ্ব্যয় করা ভালো। নয়নতারার নিজের ইচ্ছেয় কিছুই হয়নি জীবনে। নিখিলেশর চেষ্টাতেই যখন তার চাকরি হয়েছে, নিখিলেশের চেষ্টাতেই যখন সে লেখা-পড়া শিখে পাস করেছে, তখন তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে যাওয়া উচিত নয়। তা প্রথমে একটা সিনেমা দেখতে গেল দু’জনে। সিনেমা ভাঙবার পর ট্যাক্সি চড়ে কোথায় কোন পাড়ায় তাকে নিয়ে গেল নিখিলেশ। বিরাট একটা বাড়ির সদর দিয়ে ভেতের ঢুকলো দুজনে। চারিদিকে কীরকম একটা ভুরভুরে সুগন্ধ নাকে এসে লাগলো।
নয়নতারা চুপি চুপি নিখিলেশকে জিজ্ঞেস করলে–এ কীসের গন্ধ গো?
নিখিলেশ বললে–রান্নার, চপ্ কাটলেট পোলাও কালিয়া রান্নার গন্ধ, চলো না ভেতরে গিয়ে খেলে সব বুঝতে পারবে
সত্যিই ভেতরে সে এক স্বপ্নের রাজত্ব। নয়নতারার মনে হলো সে যেন এক স্বপ্ন পুরীতে ঢুকেছে। সার সার টেবিলে কত মেয়ে কত পুরুষ বসে বসে খাচ্ছে। মাথায় পাগড়ি পরা সব লোক সবাইকে পরিবেশন করতে ব্যস্ত! একটা কোণে গিয়ে ফাঁকা টেবিলে বসলে দুজনে।
নয়নতারা বললে–তুমি আগে বললে না কেন এখানে আসবে, তাহলে একটু সেজে গুজে ভদ্র হয়ে আসতুম, আমার লজ্জা করছে বড়
নিখিলেশ বললে–তোমার ভালো শাড়ি ব্লাউজই বা কই যে সেজেগুজে আসবে–
নয়নতারারও মনে হলো সত্যিই তার কোনও ভালো শাড়িই নেই। অন্তত এই সব জায়গায় আসবার মত কাপড়-জামা তো তার নেই-ই।
নিখিলেশ বললে–শুধু কি শাড়ি, তোমার গয়না-টয়নাও তো কিছু নেই–সব তো তোমার সেই আগেকার শ্বশুরবাড়িতে। আসবার সময় তুমি তো সেগুলো নিয়ে এলেই পারতে
নয়নতারা বললে–তাদের উপর যে আমার ঘেন্না হয়ে গিয়েছিল বড্ড। যাদের সঙ্গে ঝগড়া করে চলে এলুম তাদের দেওয়া জিনিস ছুঁতেও আমার ঘেন্না করলো যে—
–কিন্তু তোমার বাবার দেওয়া গয়নাগুলো? মাস্টারমশাইও তো তোমাকে কম গয়না দেননি। সেগুলো তো নিয়ে এলে পারতে, তাহলে এখন কত কাজ দিত! এখন সোনার দাম কত বলো তো? একশো ছত্রিশ টাকা ভরি, তা জানো? হয়ত দাম আরও বাড়বে–
নয়নতারার সব মনে পড়তে লাগলো। বললে–তখন কী আমার মাথার ঠিক ছিল? আমি যে আত্মহত্যা করিনি, সেইটেই তো আশ্চর্য! তুমি কল্পনা করতে পারবে না আমার সে কী কষ্ট! শ্বশুর হয়ে রাত্তিরে কখনও কেউ ছেলের বউ এর ঘরে ঢুকেছে? এ কথা কখনও কেউ কল্পনা করতে পারে? শুনলে ভাববে আমি বুঝি মিথ্যে কথা বলছি–
নিখিলেশ বললে—যাক্কে ও-সব কথা, ও সব ভুলে থাকাই ভালো–এখন খেয়ে নাও—
ততক্ষণে খাবার দিয়ে গিয়েছিল টেবিলে। কত রকমের কী-সব খাবার। নয়নতারা বললে–আমি চামচে দিয়ে খেতে পারবো না–হাত দিয়ে খাই–
–তা খাও, পরে তোমাকে বাড়িতে কাঁটা-চামচে দিয়ে খেতে শিখিয়ে দেব। এখন হাত দিয়ে খাও–
