কিন্তু একদিন কেন যে তার আশা হলো! হয়তো নিখিলেশ তাকে আশা দিলে বলেই তার আশা হলো। নইলে যার পায়ের তলা থেকে মাটিটা পর্যন্ত সরে গেছে, তার তো হতাশায় আত্মঘাতী হবারই কথা। শেষ পর্যন্ত একদিন নিখিলেশ তাকে কলকাতায় নিয়ে গেল। এখন মনে নেই কোন্ ঠিকানায় নিয়ে গিয়ে তুললো তাকে। কোন্ একটা অফিস। আগে থেকে সব ব্যবস্থাই করে রেখেছিল নিখিলেশ। কথা থেকে নিখিলেশের তিনজন বন্ধু এল। কী সব করলে একজন অফিসের লোক। সে কী উত্তর দিয়েছিল তাও ভালো করে তার কানে ঢোকেনি। কী একটা কাগজে সই করতে বললে তারা। তারা যেমন বললে–তেমনি সই করলে সে। তারপর সবাই তাকে নিয়ে চলে গেল কালীঘাটের মন্দিরে।
মনে আছে একটু আড়ালে পেয়েই নিখিলেশ বলেছিল–তুমি কাঁদছো কেন? ওরা তোমার কান্না দেখে কী ভাবছে বলো তো?
নয়নতারা নিজেই তখন জানতো না যে কেন সে কাঁদছে। শাড়ির আঁচলটা দিয়ে মুখটা মুছতেই সিঁদুরে-জলে আঁচলটা লাল হয়ে উঠলো। প্রথম প্রথম খুব খারাপ লাগতো। এ কী করলে সে! এ কেন সে করতে গেল! বিশ্বসংসারে কারো সামনে তার মুখ দেখাতে লজ্জা করতো। যখন নৈহাটিতে এই পাড়াতে নিখিলেশ বাড়ি ভাড়া করলে, তখন সারা দিন ঘরের ভেতরে কেবল বন্দী হয়ে থাকতো। কিন্তু যে সিঁথির সিঁদুর একদিন সে রাগে ঘেন্নায় নিজের হাতেই সকলের সামনে মুছে ফেলেছিল আবার নৈহাটির বাড়ির ভেতরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হাত দিয়েই সেই সিঁদুর নিজের সিঁথিতে লাগিয়ে দিলে। এও তার জীবনের এক মর্মান্তিক পরিহাস। নিজের সিঁদুর পরা চেহারাটা দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হলো যেন আর একটা মুখ পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা নজরে পড়তেই লজ্জায় ঘেন্নায় শাড়ির আঁচল দিয়ে সে নিজের মুখটা ঢেকে ফেললে! তখন আর নিজের মুখ দেখতেও তার লজ্জা হলো। সে সেই অবস্থাতেই বিছানায় মুখ গুঁজে শুয়ে পড়লো।
সে-সব প্রথম দিককার কথা। তারপর আস্তে আস্তে কেমন যেন সব কিছু সহজ হয়ে এল। নিখিলেশই বলতে গেলে সব কিছু সহজ করে নিলে। মাঝে মাঝে নয়নতারাকে নিয়ে কলকাতায় গিয়ে বেড়িয়ে আনতে। আগে কখনও সে কলকাতা দেখেনি। কৃষ্ণনগরে মানুষ হয়ে একেবারে সোজা চলে গিয়েছিল নবাবগঞ্জে। সে আরও এক নিরিবিলি পাড়াগাঁ। কিন্তু সেদিন কে ভেবেছিল এমনি করে একদিন সে আবার কলকাতা দেখতে পাবে। কে ভাবতে পেরেছিল যে যে-পুরুষমানুষের সঙ্গে তার বাবা তার ভাগ্যকে জড়িয়ে দিয়েছিল, তার বদলে ঠিক সেই জায়গায় আর একজন পুরুষমানুষ এসে তাকে এমনি করে আর এক নতুন জীবনের আস্বাদ দেবে।
রাত্রে নিখিলেশের পাশে শুয়ে থাকতে থাকতে এক-একদিন হঠাৎ একটা পুরোন মুখের ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠতো। সঙ্গে সঙ্গে সে বিছানা থেকে উঠে মুখে চোখে জল দিয়ে এসে আবার শুয়ে পড়ে ঘুমোবার চেষ্টা করতো।
নিখিলেশ টের পেলে জিজ্ঞেস করতো কী হলো, তোমার ঘুম আসছে না বুঝি?
নয়নতারা বলতো—না-–
নিখিলেশ বলতো–কেন ঘুম আসছে না? দুপুরবেলা ঘুমিয়েছিলে বুঝি?
নয়নতারা বলতো–হ্যাঁ–
তা ছাড়া আর কি বলবে সে! সারা দিন অফিস করে নিখিলেশ, তার ওপর আছে ডেলি প্যাসেঞ্জারি। সকাল সাড়ে আটটার ট্রেনে যায় সে আর সন্ধ্যে সাতটার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসে। সমস্ত দিনটাই তখন একলা কাটতে নয়নতারার। বোসপাড়ার ছোট ভাড়াটে বাড়ির ভেতরে একলা বন্দী হয়ে থেকে কেবল আকাশ পাতাল করতো। তারপর যখন নিখিলেশ বাড়ি ফিরতো তখন বসতো নয়নতারাকে নিয়ে। কেস্টনগরে থাকতে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েই তার পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নবাবগঞ্জে বিয়ে হবার আগেও নিখিলেশ পড়াতো। এবার নিখিলেশের স্ত্রী হয়ে এ বাড়িতে আসার পরও আবার পড়ানো শুরু হলো। অঙ্ক আর ইংরিজি, ইতিহাস আর বাংলা, কোনও বিষয়ই বাদ গেল না। নতুন করে আবার নয়নতারা নিখিলেশের ছাত্রী হয়ে উঠলো। সে এমন এক ছাত্রী যে যাকে দরকার হলে শাস্তি দেওয়াও যায় না আবার প্রশয় দেওয়াও যায় না। প্রশ্রয় দিলে ছাত্রীর লেখাপড়া মাথায় উঠবে। আবার শাস্তি দিলেও স্ত্রীর অহমিকাকে আঘাত দেওয়া হবে।
আর তার পরেই একদিন কলকাতায় গেল প্রাইভেট পরীক্ষা দিতে। নিখিলেশের সে কী পরিশ্রম, সে কী শান্তি। যেন যে-কোনও রকমে সে নয়নতারাকে মানুষ করে তুলবেই। নিখিলেশ কথায় কথায় নয়নতারাকে বললো–পুরোন কথা সব ভুলে যাও, মনে করে নাও নতুন করে তোমার জীবনের আরম্ভ হলো–
এ-সব কথার উত্তরে নয়নতারা কিছু বলতো না। এ-সব কথার জবাবও দিত না সে। নিখিলেশ যা বলতো তা-ই করতে চেষ্টা করতো। যেন কলের পুতুল সে। নিখিলেশ দম দিয়ে তাকে ছেড়ে দিত আর সে কলের পুতুলের মত শুতো, ঘুমোতো, ভাবতো, হাসতো, নড়তো সবকিছু করতো। কিন্তু তার মধ্যেও কোনও প্রাণ ছিল না। মানুষ বলে যে এক ধরণের জীব সংসারের প্রাণী হয়ে সকলের সঙ্গে সম্পর্ক পাতিয়ে সকলের সুখ-দুঃখের ভাগী হয়ে বেঁচে থাকে, নয়নতারা যেন তা নয়। তার কাছে তার সব কিছু কাজই যেন করতে হয় তাই করা, না করলে একজন অখুশী হবে তাই হুকুম পালন করা।
সত্যিই নিখিলেশ তার জন্য কী-ই না করেছে। একদিন হঠাৎ এসে বললে–জানো, তোমার একটা চাকরি হয়ে গেছে–
নয়নতারা অবাক হয়ে গেল। বললে–চাকরি? আমি চাকরি করবো?
নিখিলেশ বললে–হ্যাঁ, তোমাকে দিয়ে সেই যে একটা দরখাস্ত লিখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলুম, সেই চাকরিটা। গোড়াতেই দেড়শো টাকা দেবে, পাকা হয়ে গেলে আড়াই-শোর কাছাকাছি–
