বলতেন–আহা, ছোটো ছেলে, আবদার ধরেছে, দাও না ওকে কিনে—
বাবা বলতো–আদর দিয়ে দিয়ে কর্তাবাবুই খোকার সর্বনাশ করবেন দেখছি–
তা কান্নাকাটির কারণ শুনে কর্তাবাবু তখনই লোক পাঠালেন রেলবাজারে। দীনু গেল সেখানে। নাতির আবদার রাখবার জন্যে একটা লোক পাঁচ ক্রোশ হেঁটে দু-পয়সার একটা বেলুন কিনে নিয়ে এল। তখন নাতি ঠাণ্ডা। তখন আবার তার মুখ দিয়ে হাসি বেরোল। তখন আবার সেই বেলুন নিয়ে সারা বাড়িময় মাতামাতি চললো।
কর্তাবাবুর কাছে দীনু আসতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন–এনেছিস, বেলুন এনেছিস?
দীনু বললে–আজ্ঞে হ্যাঁ–
–খোকাকে দিয়েছিস?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, দিইছি–
–কত দাম নিলে?
–আজ্ঞে দু’পয়সা।
দু’পয়সা! দু’পয়সা দাম শুনেই চমকে উঠলেন কর্তাবাবু। বললেন–সেদিন কপিল পায়রাপোড়া যে কৈলাসের কাছে চার পয়সা নিয়েছিল!
তবু সন্দেহ হলো। হিসেবের খাতাটা বার করে দেখে নিলেন। হাটে যা কিছু কেনা কাটা হতো তার হিসেব দিতে হতো কর্তাবাবুর কাছে। তিনি সেগুলো নিজের হাতে লিখে সিন্দুকের মধ্যে খাতাটা রেখে দিতেন। হিসেবের খাতায় স্পষ্ট লেখা হয়েছে কপিল পায়রাপোড়ার কাছে চার পয়সা দিয়ে খোকার জন্যে বেলুন কেনা হয়েছে। ডাকলেন– কৈলাস? কৈলাস কোথায় গেল?
কৈলাস গোমস্তা এল। কর্তাবাবু তাকে জিজ্ঞেস করলেন–কৈলাস সেদিন কপিল পায়রাপোড়ার কাছে তুমি বেলুন কিনেছিলে ক’পয়সা দিয়ে?
–আজ্ঞে, আপনাকে তো আমি খরচের হিসেব দিয়েছি।
কর্তাবাবু বললেন–তুমি বলেছ চার পয়সা। আমার খাতাতেও তাই-ই লেখা রয়েছে। কিন্তু আজ দীনু রেলবাজার থেকে খোকার জন্যে আর একটা বেলুন কিনে এনেছে–সেটা দু’পয়সা নিয়েছে। কপিল পায়রাপোড়া লোকটা তো দেখছি চোর। আমাকে দু’পয়সা ঠকিয়ে নিয়েছে। এ কি মগের মুলুক পেয়েছে। আমার পয়সা কি সস্তা ভেবেছে সে!
কৈলাস গোমস্তা সবিনয়ে বললে–আজ্ঞে হুজুর, কী আর বলবো, আজকাল পৃথিবীতে কাউকে বিশ্বাস নেই, সব বেটা চোর।
কর্তাবাবু বললেন–তা চোর বললে তো আমি শুনবো না, চুরি করতে হয় অন্য কারো বাড়িতে সিঁধ কাটো, তা বলে আমার বাড়িতে? সে পেয়েছে কী? ভেবেছে আমি ধরতে পারবো না? আমি বোকা? আর আমার পয়সা বুঝি পয়সা নয়? আমাকে বুঝি মুখে রক্ত উঠিয়ে টাকা উপায় করতে হয় নি?
তারপর একটু থেমে বললেন–ওর কাছে জমি-জমা কী আছে আমার?
কৈলাসের হিসেব সবই মুখস্থ থাকে। বললে–বিলের ধারে এক লপ্তে তিন বিঘে ওর ভাগে আছে, আর ওর কাকার ভাগে বাকি সাত বিঘে–
–ওর আর কী কী সম্পত্তি আছে?
–সম্পত্তি বলতে ওই আমাদের তিন বিঘে জমিই ওর ভরসা। ওতে ওর সারা বছর চলে না। মা-ষষ্ঠীর কৃপায় আবার ওর সংসারও অনেক বড়। একটা বউ মরে যাবার পর আবার নতুন করে একটা বিয়েও করেছে। ও-পক্ষের তেরটা আণ্ডা-গ্যাণ্ডা, তার ওপর এ পক্ষেরও একটা মেয়ে হয়েছে সম্প্রতি–
কর্তাবাবু বললেন– তাহলে তো খুব কষ্টেসৃষ্টে চালায়। খাজনা ঠিক সনসন দিয়ে যাচ্ছে তো?
–আজ্ঞে, দিতে পারবে কী করে? দু’এক সন মাঝে-মাঝে বাকি পড়েও যায়। খুব ধমক টমক দিলে তখন গরু বাছুর বেচে জমিদারের পাওনা-শোধ করে কোনও রকমে। সেইজন্যেই তো হাটবারে কখনও বেলুন কখনও বিস্কুট-ল্যাবেনচুষ নিয়ে বসে, তাতে যা দু’পয়সা হয়–
কর্তাবাবু বললেন–তা বলে আমাকে ঠকাবে? আমারই খাবে পরবে আবার আমাকেই ঠকাবে? এ তো ভালো কথা নয়। তুমি ওর জমি খাস করে নাও–
–খাস করে নেব?
–হ্যাঁ হ্যাঁ, খাস করে নেবে! আমি অত দয়ার অবতার হতে পারবো না। আমার অত পয়সা নেই। আজই খাস করে নেবে–বুঝলে?
তা সেইদিনই খবর গেল কপিল পায়রাপোড়ার কাছে। সে তখন সারা দিনের খাটুনির পর তার বাড়ির চাতরায় ভাত খেতে বসেছে। খবরটা শুনেই খাওয়া তার মাথায় উঠলো। খাওয়া ফেলে তখনই ছুটলো কাছারিতে। কৈলাস গোমস্তা তাকে বললে–তা আমি কী করবো বাপু, আমার কি জমি? যাঁর জমি তিনি যদি হুকুম করেন তো আমি কী করতে পারি? তুই কর্তাবাবুর কাছে গিয়ে তোর আর্জি পেশ কর গে–
কপিলের তখন মাথায় বজ্রাঘাত। বললে–আপনিই সব গোমস্তা মশাই, আপনি বললে–কর্তাবাবু জমি ফিরিয়ে দেবেন। ওই জমিটুকু চলে গেলে আমি কাচ্চা বাচ্চা নিয়ে খাবো কী? আমার সংসার চলবে কী করে?
একটা পাঁচ ফুট লম্বা পুরুষ-মানুষ যে অত গলা ফাটিয়ে হাউ হাউ করে কান্নাকাটি করতে পারে না দেখলে সদানন্দ কল্পনাও করতে পারতো না। বাড়িসুদ্ধ লোক সবাই জানতে পারলো কপিল পায়রাপোড়ার জমি কর্তাবাবু খাস করে নিচ্ছেন। কিন্তু কেন খাস করে নিচ্ছেন তা কেউ জিজ্ঞেস করলে না। সবার কাছেই যেন জিনিসটা স্বাভাবিক। এ তো হবারই কথা। জমিদারের হক আছে জমি খাস করে নেবার। তা সে অন্যায় করুক আর না করুক। খাজনা দিক আর না দিক। আমার মর্জি হয়েছিল তাই তোমায় জমি চাষ করতে দিয়েছিলুম। আবার এখন মর্জি হয়েছে, এখন তোমার কাছ থেকে জমি কেড়ে নেব। জমির মালিক তুমি, না আমি?
সদানন্দ দীনুমামার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে–দীনুমামা, কপিলকে মারছে কেন দাদু?
দীনুমামা বললে–মারবে না? কপিল যে কর্তাবাবুকে ঠকিয়েছে!
–ঠকিয়েছে? কী করে ঠকালো?
–দু’পয়সার বেলুন কেন চার পয়সায় সে বিক্রি করেছে? সেই একই বেলুন আমি রেলবাজার থেকে যে দু’পয়সায় কিনে এনেছি–
সদানন্দ অবাক হয়ে গেল। বললে–কই, বেলুন তো কপিল বেচে নি। আমি বেলুন নেব বলে আবদার ধরেছিলুম বলে ও তো মাগনা দিয়ে দিলে। পয়সা তো নেয় নি ও। আমি নিজের চোখে যে দেখেছি, আমি তো তখন হাটে ছিলুম–
