–বাবা, সব ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি। সিঁথির সিঁদুরও মুছে ফেলেছি, হাতের শাঁখাও ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলেছি।
কালীকান্ত ভট্টাচার্য তখন উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে উঠেছে। বললেন–তা আমার জামাই? জামাইবাবাজী কোথায়?
নয়নতারা বলে উঠলো– তোমার জামাই নেই বাবা, তোমার জামাই কোনও দিন ছিল না, কোনও দিন থাকবেও না।
–সে কী রে? কী বলছিস তুই? আমার জামাই নেই?
–না, তোমার জামাই বেয়াই বেয়ান কেউই নেই। মনে করে নাও তোমার মেয়ের কোনও দিন বিয়েই হয়নি। আমি ওবাড়ির সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে চলে এসেছি। আর কখনও ও-বাড়িতে যাবোও না–
কালীকান্ত ভট্টাচার্য কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। কৈলাস গোমস্তা বউমাকে নিয়ে এসেছিল সঙ্গে করে। কিন্তু বেগতিক দেখে সে আর সেখানে দাঁড়ায়নি। নিঃশব্দে কখন সেখান থেকে সরে পড়েছে কেউই তা জানতে পারেনি।
কালীকান্ত ভট্টাচার্য কী করবেন তখন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। বললেন–তা সদানন্দ কোথায়? সে তোর সঙ্গে এল না কেন?
নয়নতারা বললে–তুমি তার কথা আর বোল না, তার নামও উচ্চারণ কোন না আমার সামনে, সে নেই–
নেই মানে? নেই মানে কী? অসুখ হয়েছে তার? আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না রে। কবে তার অসুখ হলো, তাও তো জানতে পারলাম না। তার যে অসুখ হয়েছে, সে কথাও তো আমাকে বেয়াই মশাই জানান নি। আমি এখন কী করি। তোর মা নেই, আমিই তোর বাবা-মা সব কিছু, আমাকে সব খুলে বলবি তো! আমি বুড়ো বলে কি আমি কিছুই বুঝি না?
নয়নতারা বললে– সে তোমার বুঝে দরকার নেই বাবা, আমার ব্যাপার আমিই বুঝবো, এবার থেকে আমি আর কোথাও যাবো না, তোমার কাছেই বরাবর থাকবো, তোমার কাছে থাকতেই আমি এসেছি–
–কিন্তু—কিন্তু–
এর বেশি আর কিছু বলতে পারলেন না কালীকান্ত ভট্টাচার্য। সঙ্গে সঙ্গে নিখিলেশের ডাক পড়লো। বিপিনকে বললেন–একবার নিখিলেশকে খবর দাও তো বাবা, একবার তাকে ডাকো তো বাবা এখানে–
তারপর থেকেই পণ্ডিত মশাই যেন কেমন হয়ে গেলেন। নিখিলেশ তখনও চাকরিতে ঢোকেনি। বিএ পাস করেছিল আগেই। তখন আর কিছু না পেয়ে আইন পড়ছিল। ছোটবেলা থেকেই স্বাধীন স্বভাবের ছেলে। বিধবা মা থাকতো কেষ্ট-নগরের বাড়িতে আর নিখিলেশ কেষ্টনগর থেকে পাস করে কলকাতায় ডেলি প্যাসেঞ্জারি করতো। ছোটবেলায় স্বদেশী করেছে। মদের দোকানে পিকেটিং করে একবার কয়েকমাসের জন্যে অন্য সকলের সঙ্গে জেলও খেটেছে। কলকাতা থেকে যে লীডার কেষ্টনগরে এসেছে, নিখিলেশ তার পেছন পেছন ঘুরেছে। যখন খদ্দর পরা পুলিসের চোখে অপরাধ ছিল, তখন সকলের সামনে বুক ফুলিয়ে খদ্দরও পরেছে। মীটিং-এ ডায়াসের ওপর দাঁড়িয়ে গরম গরম স্বদেশী বক্তৃতাও দিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টাকার চিন্তাতে আর ওদিকে বেশিদিন থাকতে পারেনি। মাঝে মাঝে লেখা পড়ায় বাধা পেয়েছে। শেষে যখন থেকে মা মারা গেছে, তখন থেকে আর ওদিক মাড়ায়নি। দিনের বেলা চাকরি খোঁজা আর বিকেলের দিকে এক ঘণ্টার জন্যে আইন কলেজে গিয়ে বসেছে। আর বাকি সময়টা এখানে-ওখানে ছাত্র পড়িয়ে পেট চালিয়েছে।
যেদিন কালীকান্ত ভট্টাচার্য মারা গেলেন, সেদিন শ্মশান থেকে ফিরে এসেই নিখিলেশ বললে–তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে নয়নতারা–
নয়নতারা তখন শোকে মুহ্যমান হয়ে আছে। একমাত্র অবলম্বন বাবাকে হারিয়ে ভবিষ্যৎ তখন তার কাছে অন্ধকার হয়ে গেছে।
–কথাটা দুদিন পরে বললেও হতো। কিন্তু আমি মনস্থির করে ফেলেছি। আমার টাকা নেই জানি, বিয়ে করে স্ত্রীকে ভরণপোষণ করবার মত সংস্থানও নেই আমার, তা-ও জানি। কিন্তু তুমি অমত কোরো না–
মনে আছে নয়নতারার সমস্ত মন সেদিন নিখিলেশের প্রস্তাবে বিষিয়ে উঠেছিল। মনে হয়েছিল নিখিলেশ যেন তার বাবার মৃত্যুর জন্যেই এতদিন প্রতীক্ষা করছিল। যেন নয়নতারার অসহায়তার সুযোগ খুঁজছিল সে। যেন নয়নতারার শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে আসাটাই তার কাছে কাম্য ছিল।
তারপর একদিন শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়ে গেল। নিখিলেশ এল একদিন। জিজ্ঞেস করলে–তুমি কিছু ভেবেছ নয়নতারা?
নয়নতারার মন থেকে তখনও শোকের ছাপ মোছেনি।
জিজ্ঞেস করলে–কী ভাববো?
–আমি যে প্রস্তাব দিয়েছিলুম, সেই সম্বন্ধে?
–কী প্রস্তাব?
–আমি বলছি তুমি আমার বাড়িতে আমার স্ত্রী হয়ে এসো—
কথাটা শুনে নয়নতারার প্রথমে মনে হয়েছিল সেই মুহূর্তেই সে নিখিলেশকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু অনেক কষ্টে সে তখন নিজেকে সামলে নিয়েছিল। তারপরই মনে পড়ল তার আশ্রয়ের কথা, তার জীবিকা নির্বাহের কথা, তার নিজের ভরণপোষণের কথা। পরের মাস থেকে তো তাকে তার বাড়ি ভাড়া দিতে হবে, তার নিজের জন্যে চাল-ডাল-নুন-মশলা সবই কিনতে হবে–
নয়নতারার মুখ তুলে বললে–কিন্তু কী করে তা সম্ভব?
নিখিলেশ বললে–কেন তা সম্ভব নয়? তোমার একবার বিয়ে হয়ে গেছে বলে? আইনের কথা যদি বলো তো তাতে তো আর এখন আটকাবে না, এখন তো আইন পাস হয়ে গেছে। আর সংস্কার? সংস্কারের কথা তুমি বলতে পারো অবশ্য, কিন্তু সেদিক থেকেও তো আর আটকাবার কারণ নেই, কারণ সদানন্দবাবুর সঙ্গে তুমি একদিন রাত্রিবাসও তো করোনি–সে তো তুমি নিজের মুখেই আমাকে বলেছো–
সেদিন নিখিলেশের যুক্তির কাছে নয়নতারা হার মেনে গিয়েছিল বটে, কিন্তু তবু হার মানাটা তার কাছে অত সহজ হয়নি। তখন তার চোখের সামনে ভবিষ্যৎ বলে কিছু ছিল না, বোধ হয় বর্তমান বলেও কিছু ছিল না। শুধু ছিল একটা অতীত। তা সে-অতীতটাও ছিল এত ভয়ানক যে তা স্মরণ করতেও তার ভয় লাগতো। আসলে ভবিষ্যৎ তারই থাকে যার আশা থাকে। সেদিন নয়নতারার আশা বলতেও তো কিছু ছিল না।
