ততক্ষণে গিরিবালা রান্নাঘরে গিয়ে চা করে ফেলেছে। দুকাপ চা নিয়ে এসে নয়নতারার হাতে দিলে। নয়নতারা কাপ দুটো নিয়ে বললে–তোমাকে একবার দোকানে যেতে হবে গিরি, ওষুধের দোকানে–
বলে শোবার ঘরে গিয়ে দেখলে ফাঁকা, নিখিলেশ নেই। কোথায় গেল নিখিলেশ? চা না খেলেই চলে গেল! নয়নতারা চায়ের কাপ দুটো নিয়ে সেখানেই খানিকক্ষণ হতভম্বের মতন দাঁড়িয়ে রইল। এমন না কখনও তো চলে যায় না।
বাইরে গিয়ে গিরিবালাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে–গিরি, দাদাবাবু কখন বেরিয়ে গেল?
গিরিবালা বললে–দাদাবাবু ঘরে নেই?
নিখিলেশ কখন নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে কেউই জানতে পারেনি। নয়নতারাও জানতে পারেনি, গিরিবালাও জানতে পারেনি। অথচ নয়নতারাকে বাদ দিয়ে নিখিলেশ এতদিনের মধ্যে একদিনও কোথাও বেরিয়েছে কি না সন্দেহ। অফিস যাবার সময় নিখিলেশ এক ঘণ্টা আগে বেরিয়েছে। কারণ তার অফিস বসে আধ ঘণ্টা আগে, আর নয়নতারা বেরিয়েছে নটা চল্লিশের ট্রেনে। ফেরবার সময় প্রতিদিন নিখিলেশ নয়নতারার অফিসে গিয়ে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে নৈহাটিতে ফিরেছে। এতদিন ধরে এই নিয়মই চলে এসেছে। এই প্রথম আজকেই এর ব্যতিক্রম হলো, আজকেই এই প্রথম নিয়মভঙ্গ!
নয়নতারা চা’টা খেয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি আবার বাইরের ঘরে এসে হাজির হলো। সে ঘরের বিছানার ওপর সদানন্দ তখন আঘোরে ঘুমোচ্ছে। সদানন্দ তখন জানতেও পারলে না যে কোথায় সে এসেছে। কোথায় কার বাড়িতে এসে সে কার সংসারের সব নিয়ম শৃঙ্খলা একেবারে ছত্রভঙ্গ করে দিলে।
.
এমনি করেই হয়ত একটা সংসারের একটা বংশের ইতিহাস-ভুগোল সব কিছু একদিন ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। একটা সামান্য তুচ্ছ কারণে মানুষের সঙ্গে মানুষের কিংবা একটা দেশের সঙ্গে আর একটা দেশের সম্পর্কে কনক্রীটে চিড় ধরে ফাটল গজায়। আর সেই ফাটলের ফাঁকে একটা অশ্বত্থের সর্বনাশা অঙ্কুর মাথা তুলে দাঁড়ায়। প্রথমে যখন সে অঙ্কুর অবস্থায় থাকে তখন কেউই টের পায় না। কেউই দেখতে পায় না। অতি নিঃশব্দে পাপের সেই বীজটি লোকচক্ষুর অন্তরালে তার আপন ক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকে। কালীগঞ্জের বউ এই রকমই একটা তুচ্ছ বীজ। কিন্তু সেই তুচ্ছ একটা বীজই যে এমন করে একটা মহীরুহে পরিণত হবে, নবাবগঞ্জের চৌধুরী বংশকে এমন করে ছিন্ন-ভিন্ন করবে তা সেদিন কেউ কল্পনা করতে পারেনি। না কল্পনা করতে পেরেছেন কর্তাবাবু নিজে, না চৌধুরী মশাই। চৌধুরী মশাই এর শ্বশুর কীর্তিপদ মুখোপাধ্যায়ও কল্পনা করতে পারেননি। পারলে তাঁর একমাত্র প্রীতিলতাকে হয়ত এবংশে বিয়েই দিতেন না। আর কৃষ্ণনগরের কালীকান্ত ভট্টাচার্যও কল্পনা করতে পারেননি, নইলে তিনিই কি তাঁর একমাত্র সন্তান নয়নতারাকে এই বংশের দুর্ভাগ্যের সঙ্গে জড়িয়ে দিতেন।
নয়নতারা যেদিন নবাবগঞ্জের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে সিঁথির সিঁদুর মুছে হাতের শাঁখা ভেঙে কালীকান্ত ভট্টাচার্যের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো তার খানিক আগেই বিপিনরা পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু তারা ভয়ে-সঙ্কোচে পণ্ডিত মশাই-এর কাছে কিছুই ভাঙেনি।
পণ্ডিত মশাই জিজ্ঞেস করলেন–নয়নতারা কেমন আছেন বিপিন?
বিপিন প্রামাণিক বললে–আজ্ঞে ভালো–
–আমার কথা কিছু জিজ্ঞেস করলে?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি বললাম–আপনি ভালো আছেন–
–আর বেয়াই-বেয়ান?
–আজ্ঞে তাঁরাও আপনার কথা জিজ্ঞেস করলেন।
–আর জামাইবাবাজী? জামাইবাবাজী কেমন আছেন?
সব শুনে কালীকান্ত ভট্টাচার্য মশাই-এর মনটা প্রসন্ন হলো। যাক, নয়নতারা ভালো ঘরে ভালো ঘরে পড়েছে, এর চেয়ে সুখের খবর আর কী থাকতে পারে!
বললেন–আচ্ছা বিপিন, এবার তোমরা তাহলে বিশ্রাম করো গে যাও, তোমাদের খুব পরিশ্রম হয়েছে যাও–আমার দেওয়া জিনিসগুলো সব পছন্দ হয়েছে তো?
–হ্যাঁ পণ্ডিত মশাই, খুব পছন্দ হয়েছে। সবাই ধন্য ধন্য করতে লাগলো জিনিস দেখে। দই মিষ্টি খুব পছন্দ হয়েছে তাদের। গাঁয়ের লোক সব একেবারে পাড়া ঝেঁটিয়ে তত্ত্ব দেখতে এসেছিল–
–তা তোমাদের পেট ভরে খাইয়েছে দাইয়েছে তো?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, খুব খাইয়েছেন। বেয়াই মশাই নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব খাওয়ালেন–
–কী কী খাওয়ালেন?
–পোনা মাছ সরু বাসমতী চালের ভাত, পায়েস, আম, কাঁঠাল, কাঁচাগোল্লা—
কিন্তু কথা তাদের শেষ হলো না। কথা শেষ হবার আগেই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকলো নয়নতারা। কালীকান্ত ভট্টাচার্য মশাই চোখের সামনে যেন ভূত দেখলেন।
–বাবা!
নয়নতারার গলা শুনে আর তার সেই চেহারা দেখে তিনি আকাশ থেকে পড়লেন।
–এ কী মা, তুই? এ কী চেহারা হয়েছে তোর? তুই হঠাৎ চলে এলি যে? একবার বিপিনদের দিকে চেয়ে দেখেন, আর একবার নয়নতারার দিকে।
–এই যে এই বিপিন এক্ষুনি বলছিল তুই ভালো আছিস, বেয়াই-বেয়ান সবাই ভালো আছে, তোরা খুব পেট ভরে খাইয়েছিস ওদের…
নয়নতারা চিৎকার করে উঠলো–সব মিথ্যে কথা বাবা, সব ওদের মিথ্যে কথা। আমি তোমার পাঠানো তত্ত্ব সব ছুঁড়ে টেনে মাটিতে ফেলে দিয়েছি–
–সে কী মা, কেন? কী হয়েছিল?
উত্তেজনায় বৃদ্ধ কালীকান্ত ভট্টাচার্যের হৃৎপিণ্ডটা ধড়াস ধড়াস শব্দ করতে লাগলো। মেয়ের চেহারা দেখে তিনি ভয়ে কাঁপতে লাগলেন। বললেন–তোর এয়োতির চিহ্ন কোথায় গেল? তোর সিঁথির সিঁদুর, তোর হাতের শাঁখা? তোর হাতের চুড়ি? গলার হার?
